ছবি: সংগৃহীত
ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় রাষ্ট্রপতি পদে পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে বলে একাধিক সূত্রের দাবি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, আগামী সপ্তাহের মধ্যেই রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করতে পারেন। যদিও সরকারিভাবে এ বিষয়ে এখনো কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি এবং সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি নিশ্চিত করেননি।
বঙ্গভবনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগকে সামনে রেখে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে বঙ্গভবনে একটি বার্তা পৌঁছেছে বলেও দাবি করা হচ্ছে। তবে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় কিংবা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়া হয়নি।
বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর। মোঃ সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সে হিসেবে তাঁর বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের ২৪ এপ্রিল। কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে তিনি পদত্যাগ করতে পারেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
সংবিধান ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে। রাষ্ট্রপতিকে নিজের স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্র জাতীয় সংসদের স্পিকারের উদ্দেশে জমা দিতে হবে। পদত্যাগপত্র গ্রহণের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। এরপর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শুরু হবে।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনার মধ্যেই রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন রাষ্ট্রপতি কে হতে পারেন, তা নিয়েও নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে। ক্ষমতাসীন বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে অন্তত দুই থেকে তিনজন জ্যেষ্ঠ নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে বলে দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে। তবে এ বিষয়ে দলটির কোনো দায়িত্বশীল নেতা প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বুধবার গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে বিএনপি সরকারের একাধিক মন্ত্রী রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের বিষয়ে সরাসরি কিছু বলতে চাননি। তাঁদের বক্তব্য, এই মুহূর্তে রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের বিষয়ে তাঁদের কাছে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই। তবে তাঁরা বিষয়টি পুরোপুরি নাকচও করেননি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এমন গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত সাধারণত চূড়ান্ত হওয়ার আগে সীমিত পরিসরের বাইরে খুব বেশি প্রকাশ করা হয় না।
বঙ্গভবনের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, রাষ্ট্রপতির শারীরিক অবস্থা আগের তুলনায় দুর্বল হয়ে পড়েছে। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী তাঁর পূর্ণ বিশ্রামের প্রয়োজন রয়েছে। এ কারণেই স্বাস্থ্যগত বিষয়কে সামনে রেখে তিনি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে পারেন। বঙ্গভবনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি দুই দফায় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ) গিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়েছেন। চিকিৎসকরা তাঁকে নিয়মিত বিশ্রাম নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
এর আগে গত মে মাসে উন্নত চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যের লন্ডনে যান রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন। সফরকালে তাঁর সঙ্গে পরিবারের সদস্য, ব্যক্তিগত চিকিৎসক, স্টাফ নার্স এবং বঙ্গভবনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ছিলেন। দেশে ফিরে তিনি নিয়মিত দায়িত্ব পালন করলেও চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী বিশ্রামের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানা গেছে।
রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগের আলোচনার মধ্যে আরেকটি বিষয়ও গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ২১ থেকে ২৬ জুন মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই ছিল তাঁর প্রথম বিদেশ সফর। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী বিদেশ সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সফরের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে তাঁকে অবহিত করেন। কিন্তু এবার গতকাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন—এমন কোনো তথ্য বঙ্গভবন কিংবা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় প্রকাশ করেনি। এ বিষয়টিও রাজনৈতিক মহলে নানা ধরনের আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বর্তমান রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তিনি ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সংঘটিত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই ছাত্র-জনতার একটি অংশ তাঁর পদত্যাগের দাবি জানিয়ে আসছিল। তাঁদের অভিযোগ ছিল, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নির্বাচিত হওয়ায় নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাঁর রাষ্ট্রপতি পদে থাকা উচিত নয়।
তবে সে সময় বিএনপি ভিন্ন অবস্থান নেয়। দলটি শুরু থেকেই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবির বিরোধিতা করে। বিএনপির নেতাদের যুক্তি ছিল, রাষ্ট্রপতির পদে কোনো ধরনের সাংবিধানিক শূন্যতা বা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা উচিত হবে না। পরবর্তীতে জাতীয় নির্বাচনের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারও বর্তমান রাষ্ট্রপতির কাছেই শপথ গ্রহণ করে।
যদিও রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন নিজেই অতীতে দায়িত্ব ছাড়ার ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেছিলেন। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে হোয়াটসঅ্যাপে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, তিনি নির্বাচনের পর দায়িত্ব ছাড়তে চান। কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তিনি নিজেকে অপমানিত বোধ করেছেন। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি সরে যেতে চাই; আমি সরে যেতে আগ্রহী। নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত আমার দায়িত্ব পালন করে যাওয়া উচিত। সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতির পদে থাকায় আমি আমার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি।’
সাম্প্রতিক সময়েও রাষ্ট্রপতি নিয়মিত সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করেছেন। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার বঙ্গভবনে নৌবাহিনীর বিদায়ী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এর আগে ১৫ জুলাই ‘জুলাই শহীদ দিবস’ উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে বাণী দেন রাষ্ট্রপতি। এছাড়া ২৫ জুন ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী এবং ৯ জুন মরক্কোর নতুন রাষ্ট্রদূত লালা বুতাইনা এল কেরদুদি এল কুলালির পরিচয়পত্র গ্রহণ করেন তিনি।
সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নির্বাচনী কর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করেন এবং পুরো নির্বাচন পরিচালনা করেন।
রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার জন্যও সংবিধানে কয়েকটি যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রার্থীকে অবশ্যই বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে এবং তাঁর বয়স কমপক্ষে ৩৫ বছর হতে হবে। সংসদ সদস্যরাই গোপন ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন।
তবে বাস্তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একক প্রার্থী থাকলে ভোট গ্রহণের প্রয়োজন হয় না। সে ক্ষেত্রে বৈধ একমাত্র প্রার্থীকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। অতীতেও বাংলাদেশে অধিকাংশ রাষ্ট্রপতি এভাবেই নির্বাচিত হয়েছেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে সংবিধানে সময়সীমাও নির্ধারণ করা আছে। যদি মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হয়, তাহলে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ৯০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। আর যদি পদত্যাগ, মৃত্যু বা অপসারণের কারণে পদ শূন্য হয়, তাহলে শূন্য হওয়ার তারিখ থেকে সর্বোচ্চ ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে।
নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণের আগ পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি প্রধান বিচারপতির কাছে শপথ গ্রহণ করবেন। এরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার পর সংসদ অধিবেশন চলমান থাকলে সেই অধিবেশনেই ভোট অনুষ্ঠিত হয়। আর যদি অধিবেশন না থাকে, তাহলে নির্বাচন কমিশন স্পিকারের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রজ্ঞাপন জারি করবে এবং ভোট গ্রহণের অন্তত সাত দিন আগে সংসদের অধিবেশন আহ্বান করা হবে।
সব মিলিয়ে রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিনের সম্ভাব্য পদত্যাগের গুঞ্জন এখন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে। যদিও সরকার কিংবা বঙ্গভবনের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি, তবুও রাজনৈতিক মহল, প্রশাসন এবং সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই এ বিষয়ে স্পষ্ট চিত্র সামনে আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো মনে করছে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



