ছবি: সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহ্যবাহী জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা—ইউনেস্কো। মানবসভ্যতার ইতিহাস, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, জ্ঞান ও শিক্ষার সংরক্ষণে এই সংস্থার অবদান বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। কিন্তু সেই ইউনেস্কো থেকেই আবারও সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিল যুক্তরাষ্ট্র।
মঙ্গলবার (২৩ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (স্টেট ডিপার্টমেন্ট) এক বিবৃতিতে জানায়, তারা ইউনেস্কোর সদস্যপদ থেকে ফের প্রত্যাহার করছে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূল কারণ হিসেবে সংস্থাটির ‘ইসরাইলবিরোধী পক্ষপাত’, ‘বিভাজনমূলক নীতিমালা’ এবং ‘বিশ্বায়নবাদী এজেন্ডা’ অনুসরণকে দায়ী করা হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ট্যামি ব্রুস স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “বর্তমানে ইউনেস্কোতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ আমাদের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে আর সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সংস্থাটি এমন এক মতাদর্শিক পথে হাঁটছে, যা বৈশ্বিক রাজনীতিতে বিভাজন তৈরি করছে এবং জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যগুলোর (SDGs) ওপর অতিরিক্তভাবে নির্ভর করছে।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, “ইউনেস্কো এখন একটি আদর্শিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের কণ্ঠস্বর অবদমিত এবং ইসরাইলবিরোধী বার্তা প্রকাশ্যভাবে উৎসাহিত করা হচ্ছে। সংস্থাটির সিদ্ধান্তসমূহ আমাদের দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক নীতির পরিপন্থী হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
ট্যামি ব্রুস আরও বলেন, “ইউনেস্কো যখন ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং তাদের পূর্ণ সদস্যপদ প্রদান করে, সেটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নীতির বিরোধিতা। ইউনেস্কোর সেই সিদ্ধান্ত কেবল সংস্থার নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ করেনি, বরং তা রাজনৈতিক পক্ষপাতের নিদর্শনও বটে।”
ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইউনেস্কোর অবস্থান নিয়ে বহুদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল আপত্তি জানিয়ে আসছিল। ট্রাম্প প্রশাসন সেই আপত্তিকে আরো এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে ২০১৭ সালেই যুক্তরাষ্ট্রকে ইউনেস্কো থেকে প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়।
বর্তমান সিদ্ধান্তটি নতুন কিছু নয়। অতীতেও বিভিন্ন সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইউনেস্কো থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছে।
১৯৮৩ সালে, প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগান ইউনেস্কোকে ‘সোভিয়েতপন্থী ও দুর্নীতিগ্রস্ত’ উল্লেখ করে সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন।
পরে ২০০৩ সালে, প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসন ইউনেস্কোতে যুক্তরাষ্ট্রকে পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করে।
২০১৭ সালে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও সংস্থাটি থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন, যদিও তা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।
২০২৩ সালে, জো বাইডেন প্রশাসন আবারও ইউনেস্কোতে যুক্তরাষ্ট্রের সদস্যপদ ফিরিয়ে আনে, কিন্তু ২০২৫ সালে এসে ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে তা প্রত্যাহারের পথে হেঁটেছেন।
ইউনেস্কো বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক নিদর্শন সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ, আফ্রিকার সেরেঙ্গেটি, এথেন্সের অ্যাক্রোপলিস, মিসরের পিরামিড,এমনকি বাংলাদেশের সুন্দরবন ও ষাট গম্বুজ মসজিদ—সবই ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় রয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইউনেস্কোর এই কার্যক্রমের আড়ালে অনেক সময় রাজনৈতিক পক্ষপাত লুকিয়ে থাকে। বিশেষত, ইসরাইল ও ফিলিস্তিন ইস্যুতে সংস্থার নীতিমালা ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে একতরফা।
বিশ্বজুড়ে ইউনেস্কোর প্রতি ভরসা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ নিয়ে এখন আন্তর্জাতিক মহলে নানামুখী প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অনুপস্থিতি ইউনেস্কোর রাজনৈতিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলবে এবং অনেক ক্ষেত্রেই আর্থিক সহায়তার ঘাটতি তৈরি হতে পারে, যেহেতু দেশটি অতীতে সংস্থাটির অন্যতম বড় অনুদানদাতা ছিল।
তবে যুক্তরাষ্ট্রে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই সিদ্ধান্তকে ট্রাম্প প্রশাসনের “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতির বাস্তবায়ন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অনেকে বলছেন, এই পদক্ষেপ জাতিসংঘ ও তার অঙ্গসংগঠনগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অনাস্থার প্রতিফলন।
অন্যদিকে, মানবাধিকার ও বিশ্ব ঐতিহ্য সংরক্ষণে কাজ করা সংগঠনগুলো বলছে, এই ধরনের সিদ্ধান্ত শুধু বৈশ্বিক সহযোগিতাকে দুর্বল করে না, বরং বিভিন্ন সংকটে প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক একত্রীকরণের পথও রুদ্ধ করে দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত কেবল একটি সংস্থা ছাড়ার ঘোষণা নয়, বরং তা বহুমাত্রিক কূটনৈতিক সংকেত বহন করে। বিশ্ব রাজনীতিতে জাতিসংঘ ও তার অঙ্গসংগঠনগুলোর প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আস্থাহীনতা এবং মতাদর্শিক বিভাজন এই সিদ্ধান্তের পেছনে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে।
বিশ্ব এখন দেখছে—বিশ্বায়নের যুগে, সবচেয়ে শক্তিধর রাষ্ট্রটি কীভাবে একের পর এক আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে, আর তাতে কেবল সংস্থাগুলোর নয়, পুরো মানবজাতির বৃহৎ লক্ষ্যগুলোও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



