ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তাদের দলীয় প্রতীক হিসেবে শাপলা অন্তর্ভুক্ত করার দাবি তুলেছে। এ বিষয়ে ইতিমধ্যে একটি চিঠি নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে এসেছে। নির্বাচন কমিশনের সর্বোচ্চ দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছেন, এনসিপির শাপলা প্রতীক অন্তর্ভুক্ত করতে বিধিমালা সংশোধনের চিঠি পেয়েছি। তবে এটি নিয়ে কমিশনের ভেতরে আলোচনা-পর্যালোচনা করে শিগগিরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বৃহস্পতিবার (২৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে নির্বাচন ভবনের নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সিইসি এসব মন্তব্য করেন। সংবাদ সম্মেলনসদৃশ এই আলাপচারিতায় তিনি শুধু প্রতীক বিতর্ক নয়, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন, কমিশনের প্রস্তুতি, রাজনৈতিক দলের ভূমিকা এবং কমিশনের নিরপেক্ষতার প্রতিশ্রুতিও তুলে ধরেন।
শাপলা প্রতীকটি শুধু এনসিপি নয়, এর আগে অন্য দলও দাবি করেছে বলে জানান সিইসি। তিনি বলেন, “শাপলা প্রতীক প্রথম দাবি করেছিল মাহমুদুর রহমান মান্নার দল নাগরিক ঐক্য। তারা তখন কেটলি প্রতীক পরিবর্তন করে শাপলা চাইতে থাকে। আমার সঙ্গে তাদের বৈঠকও হয়েছিল। কিন্তু কমিশন নানা বিবেচনায় তাদের সে প্রতীক দেয়নি। পরে এনসিপি শাপলা দাবি করে। তখনও কমিশন একই সিদ্ধান্তে অটল ছিল—শাপলা কাউকে দেওয়া হবে না।”
তিনি প্রশ্ন তোলেন, “যখন নাগরিক ঐক্য শাপলা চেয়েছিল, তখন তো আলোচনা হয়নি। এখন কেন হচ্ছে? তাদের তো দিইনি, তাহলে এনসিপিকে দেওয়ার বিষয়েও কমিশনের সতর্ক থাকা উচিত।”
সিইসি আরও বলেন, “চিঠি দেওয়ার মাঝে উনাদের আইনের ব্যত্যয় হতে পারে। কারণ বিধিমালা হওয়ার পর কোনো দলের নতুন প্রতীক দাবি করা বা পুরোনো প্রতীক পরিবর্তনের যৌক্তিকতা কতটুকু, সেটি কমিশন গভীরভাবে পর্যালোচনা করবে।”
সম্প্রতি এনসিপির কিছু নেতার বক্তব্যে ইঙ্গিত করা হয়েছিল, তারা শাপলা প্রতীক আদায় করতে জানে। এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে সিইসি বলেন, “রাজনৈতিক নেতারা অনেক কিছু বলেন। তাদের বলার অধিকার আছে। আমরা শুনব, তবে আমাদের সিদ্ধান্ত কমিশনের নিজস্ব নিয়মনীতি ও বিবেচনার ভিত্তিতেই হবে। কারো বক্তব্যের ভিত্তিতে নয়।”
তিনি জোর দিয়ে বলেন, “আমাদের কাজ আমরা করব। কে কী বলল, সেটি শুনে প্রভাবিত হওয়ার প্রশ্নই আসে না।”
প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন—নির্বাচন আদৌ হবে কি না, এ নিয়ে অনেক সংশয় রয়েছে। এর জবাবে সিইসি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, “আমরা ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য জোরেশোরে প্রস্তুতি নিচ্ছি। প্রধান উপদেষ্টা ইতিমধ্যে বলেছেন তিনি একটি ঐতিহাসিক নির্বাচন উপহার দিতে চান। আমরা তার সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের জন্যই কাজ করছি। কারো কথায় নয়, বিবেকের তাড়নায় কাজ করতে চাই। কাউকে খুশি করার জন্য নয়, সোজা পথে কাজ করাই আমাদের নীতি।”
তিনি বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলো আমাদের মূল স্টেকহোল্ডার। তারা ছাড়া নির্বাচন সম্ভব নয়। তাই তাদের সবার সহযোগিতা আমরা প্রত্যাশা করি।”
সিইসি তার বক্তব্যে নির্বাচনী মাঠের পরিবেশ নিয়েও কথা বলেন। তিনি বলেন, “নির্বাচনী লড়াই হবে, তবে খেলোয়াড়দের ফাউল করার মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। ফাউল যেন কেউ করতে না পারে, সেজন্য কমিশন সব ধরনের ব্যবস্থা নেবে। আমি ধরে নিচ্ছি সব রাজনৈতিক দল দায়িত্বশীল আচরণ করবে এবং নির্বাচনী মাঠকে শান্তিপূর্ণ রাখবে।”
তিনি আরও বলেন, “যারা নির্বাচনী মাঠে নামবেন, তারা ফাউল করার নিয়তে যেন নামতে না পারেন—এটাই আমাদের দায়িত্ব। আমরা ভোটারদের আস্থা ফেরাতে চাই। ভোটাররা যেন নির্ভয়ে ভোট দিতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।”
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দলীয় প্রতীকের গুরুত্ব অপরিসীম। নির্বাচনে প্রার্থীর পরিচয়, ভোটারদের আনুগত্য এবং দলীয় শক্তির প্রতীক হিসেবে এটি বড় ভূমিকা পালন করে। এ কারণেই রাজনৈতিক দলগুলো আকর্ষণীয় ও জনপ্রিয় প্রতীক পাওয়ার জন্য প্রায়ই জোরালো দাবি তোলে।
শাপলা প্রতীক বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতিতে গভীরভাবে প্রোথিত। জাতীয় ফুল হিসেবে শাপলা শুধু একটি প্রতীক নয়, বরং এটি বাংলাদেশের জনগণের পরিচয় বহন করে। তাই এটিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলে দলে প্রতিযোগিতা দেখা যাওয়া স্বাভাবিক। তবে নির্বাচন কমিশন এতদিন এটিকে বিতর্ক এড়াতে কোনো দলকে দেয়নি। এখন এনসিপির নতুন করে দাবি তুলায় বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কমিশন কি তাদের পুরোনো অবস্থানেই অটল থাকবে, নাকি এনসিপিকে প্রতীক দিয়ে ভিন্ন কোনো দৃষ্টান্ত তৈরি করবে? সিইসির বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কমিশন ভেতরে গভীর আলোচনা করবে। তবে আগের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় কমিশন হয়তো কোনো দলকেই শাপলা প্রতীক দিতে চাইবে না।
অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোও প্রতীক নিয়ে নিজেদের অবস্থান থেকে সরবে না। ফলে নির্বাচনের আগে প্রতীক-সংক্রান্ত এই বিতর্ক আরও উত্তপ্ত হতে পারে বলে অনেকেই মনে করছেন।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



