ছবি: সংগৃহীত
বিদেশগমনেচ্ছু বাংলাদেশিদের জন্য দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে ভিসা পাওয়া। কখনো রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, কখনো ভুয়া কাগজপত্রের ব্যবহার, আবার কখনো প্রবাসে অবস্থানকালে অনিয়মের কারণে ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার ক্রমেই বাড়ছে। একসময় যে দেশগুলো বাংলাদেশিদের জন্য তুলনামূলক সহজ ভিসা প্রদান করত, আজ সেই দেশগুলোও কঠোর নিয়মকানুন আরোপ করেছে। এর ফলে বিপাকে পড়ছেন পর্যটক, শিক্ষার্থী, প্রবাসী কর্মী এবং ট্রাভেল এজেন্সির ব্যবসায়ীরা।
নারায়ণগঞ্জ সদরের বাসিন্দা নাদির হোসেন তাজিকিস্তানের ভিসার জন্য টানা দুইবার আবেদন করেছিলেন। একসময় এই ভিসা সহজেই মিললেও এবার তাঁর ভাগ্যে জোটেনি অনুমতি। শেষবার তিন সপ্তাহ অপেক্ষার পরও আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়। হতাশ নাদির ফেসবুকে লিখেছেন, “আজ আমি তাজিকিস্তানের ই-ভিসার জন্য রিজেক্ট হয়েছি। অথচ একসময় এই ভিসাটিকে বাংলাদেশের পাসপোর্টধারীদের জন্য সবচেয়ে সহজ হিসেবে ধরা হতো।”
তাঁর এই অভিজ্ঞতা একক নয়। অসংখ্য ভ্রমণপিপাসু ও বিদেশগমনেচ্ছু তরুণ-তরুণী একই ভোগান্তির শিকার হয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হতাশার গল্প শেয়ার করছেন।
গত দুই-আড়াই বছর ধরে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক, মধ্যপ্রাচ্যসহ এশিয়া ও ইউরোপের বহু দেশে ভিসা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ভ্রমণ ভিসা এবং কর্মী ভিসা—দুই ক্ষেত্রেই জটিলতা স্পষ্ট। ভ্রমণ ভিসায় অতিরিক্ত যাচাই-বাছাইয়ের কারণে আবেদনকারীরা দীর্ঘদিন অপেক্ষার পরও প্রত্যাখ্যাত হচ্ছেন। অপরদিকে কর্মী ভিসায় নানা দেশ প্রায়ই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে।
ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর দাবি, ভিসা রেশিও কমিয়ে দেওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে—ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার, ভিসা নিয়ে অতিরিক্ত অবস্থান করা কিংবা গন্তব্য দেশ থেকে অন্য দেশে চলে যাওয়া। এসব অনিয়মের কারণে অনেক দেশ এখন বাংলাদেশিদের আবেদন গ্রহণে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে।
সিগনেচার ওভারসিজের ম্যানেজার পরশ আহমেদ বলেন, “বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশে অনানুষ্ঠানিকভাবে ভিসা বন্ধ। মালয়েশিয়াসহ যেসব দেশে সহজে কর্মী পাঠানো যেত, এখন সেখানেও ভিসা পাওয়া কঠিন। অনেকে ভিসা পেয়েও গন্তব্যে পৌঁছে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। এভাবে আমাদের এজেন্সি ব্যবসায় ধস নেমেছে।”
অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশের (আটাব) সভাপতি আব্দুস সালাম আরেফের মতে, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিই মূলত ভিসা সংকট তৈরি করছে। তিনি বলেন, “রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বিদেশে পালিয়ে যাওয়া, ভ্রমণ ভিসায় গিয়ে দীর্ঘদিন অবস্থান করে কাজ করা—এসব কারণে ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার বেড়েছে। ইউরোপের ভিসা আগেও সীমিত দেওয়া হতো, কিন্তু এখন আবেদন নেওয়াই কমিয়ে দিয়েছে। আবেদন নিলেও অন্তত ৮০ শতাংশ বাদ পড়ে যাচ্ছে।”
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ভারত বাংলাদেশের জন্য সব ধরনের ভিসা ইস্যু বন্ধ করে দেয়। পরে কেবল চিকিৎসা ভিসা চালু হলেও সংখ্যা সীমিত। এর বড় প্রভাব পড়েছে ইউরোপ গমনেচ্ছুদের ওপর, কারণ বাংলাদেশের বেশিরভাগ ইউরোপীয় দেশের দূতাবাস দিল্লিতে অবস্থিত। ফলে দিল্লিতে যেতে না পারায় তারা ভিসা আবেদনও করতে পারছেন না।
ভিসা সংকট নিরসনে অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে বৈঠক হয়। সেখানে প্রস্তাব দেওয়া হয় দিল্লির ভিসা সেন্টার ঢাকায় অথবা অন্য কোনো দেশে স্থানান্তরের। বুলগেরিয়া তাদের ভিসা সেন্টার ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামে স্থানান্তর করলেও বাংলাদেশিদের জন্য তা কার্যকর হয়নি, কারণ ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনাম বাংলাদেশিদের অন-অ্যারাইভাল ভিসা বন্ধ করে দিয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, “আমরা দেশগুলোকে বিকল্প চিন্তা করতে বলেছি। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া তাদের এখতিয়ার।”
শ্রমবাজারে ভিসা সংকট সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ভ্রমণ ভিসায় গিয়ে কাজের প্রবণতা বাড়ায় দেশটি ভিসা সীমিত করে। আবার ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সমর্থনে প্রবাসীদের অংশগ্রহণের পর সব ধরনের ভিসা বন্ধ করে দেয় তারা।
এছাড়া বাহরাইন, মালয়েশিয়া, ইতালি, ওমান, লিবিয়া, সুদান, ব্রুনাই, মরিশাস ও ইরাক বাংলাদেশিদের জন্য শ্রমবাজার বন্ধ রেখেছে। মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগে শ্রমবাজার স্থগিত থাকায় প্রায় ১৭ হাজার কর্মী যেতে পারেননি। ইতালি জাল নথিপত্রের কারণে ওয়ার্ক পারমিট স্থগিত করেছে।
কিছু দেশে ভিসা পুরোপুরি বন্ধ না হলেও কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়েছে। যেমন মিসরে এখন অন-অ্যারাইভাল ভিসা পেতে হলে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, শেনজেনভুক্ত দেশ, জাপান, অস্ট্রেলিয়া বা কানাডার বৈধ ভিসা থাকতে হবে।
ভিসা প্রত্যাখ্যান ও জটিলতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেকে। কামরুল ইসলাম লিখেছেন, “আমার দেখা সবচেয়ে সহজ ভিসা ছিল তাজিকিস্তানের। এখন সেটাও পাচ্ছি না। এর মূল কারণ আমরা নিজেরাই।”
ভ্রমণপিপাসু জুয়েল খান লিখেছেন, “১০-২০টা রিজেকশন পেলেও ভ্রমণকারীরা থেমে যায় না। আমিও বিভিন্ন দেশে বহুবার রিজেক্ট হয়েছি।” শিক্ষার্থী আশরাফুল গনি জানিয়েছেন, তাঁর দুবার মালয়েশিয়ার স্টুডেন্ট ভিসা রিজেক্ট হয়েছে।
একদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক সংকট, অন্যদিকে বিদেশে বাংলাদেশিদের অনিয়ম—সব মিলিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভিসা জটিলতা তীব্র আকার ধারণ করেছে। এর ফলে বিদেশগমনেচ্ছু শিক্ষার্থী, প্রবাসী কর্মী ও পর্যটকরা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন। একই সঙ্গে ধস নেমেছে ট্রাভেল এজেন্সির ব্যবসায়।
.png)
.png)
.png)



