ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা, নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস আবারও বিশ্ব সম্প্রদায়ের উদ্দেশে এক তাৎপর্যপূর্ণ আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বিশ্বকে এখনই এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে, যা মর্যাদা, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে থাকবে এবং যেখানে কেউ পিছিয়ে থাকবে না। জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আয়োজিত বৈশ্বিক এক উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বিশ্ব নেতাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জনের পথে আজ সবচেয়ে বড় বাধা পর্যাপ্ত অর্থায়নের ঘাটতি, যা পূরণ করা ছাড়া সামনে এগোনো সম্ভব নয়।
মঙ্গলবার (২৩ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত হলো “টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্থিতিশীল বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রথম দ্বিবার্ষিক শীর্ষ সম্মেলন: টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যে অর্থায়নের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন” শীর্ষক অনুষ্ঠান। বিশ্বের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, অর্থনীতিবিদ, নীতি নির্ধারক, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এ সম্মেলনে বিশেষ আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস। তিনি বলেন,
“এই আসরে কথা বলতে পারা আমার জন্য যেমন গর্বের, তেমনি এক বিশাল দায়িত্বও। আমাদের সিদ্ধান্ত, আমাদের পদক্ষেপ, আমাদের আন্তরিকতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভাগ্য নির্ধারণ করবে।”
তিনি আরও বলেন, “চলুন আমরা এমন এক বৈশ্বিক অর্থনীতি গড়ে তুলি, যা শুধু কাগজে-কলমে উন্নয়ন নয়; বাস্তবে মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও অন্তর্ভুক্তির প্রতীক হবে।”
অধ্যাপক ইউনূস জানান, এসডিজি বাস্তবায়নের জন্য প্রতিবছর চার ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ ঘাটতি রয়েছে। এটি পূরণ করা কঠিন হলেও একেবারেই অপরিহার্য। তিনি বলেন, যদি বিশ্বের ধনী ও উন্নত দেশগুলো সঠিক পদক্ষেপ নেয় এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সহযোগিতা করে, তবে দারিদ্র্য, বৈষম্য ও আর্থিক অস্থিরতার মতো সমস্যাগুলো অচিরেই সমাধান করা সম্ভব।
“আমাদের ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর শোনার জন্য প্রস্তুত হতে হবে। বাংলাদেশে আমরা বিশ্বাস করি, দারিদ্র্য কখনোই একজনের স্বপ্নের পথে বাধা হতে পারে না।” — বলেন ইউনূস।
নিজের বক্তব্যে তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, যখন একজন নারী উদ্যোক্তা ব্যবসা শুরু করে, কোনো তরুণ সৌরশক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তির সুযোগ পায়, বস্তির শিশু শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার পায়— তখনই প্রকৃত পরিবর্তন ঘটে। আর এ ধরনের পরিবর্তনই দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন ও শান্তির ভিত্তি গড়ে তোলে।
তিনি বলেন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও সম্পদের ন্যায্য প্রবেশাধিকার শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এটি ন্যায়বিচারের মূল শর্ত।
ড. ইউনূস ‘সেভিলে অঙ্গীকার’-এর কথা উল্লেখ করে বলেন, এই প্রতিশ্রুতি বিশ্বকে দিয়েছে একটি নতুন কাঠামো। যেখানে দেশীয় সম্পদ উত্তোলনকে জোরদার করা, অবৈধ অর্থপ্রবাহ ঠেকানো, উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর ক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, “চতুর্থ আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সম্মেলনে নেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোকে বাস্তবায়ন করতে হবে। অঙ্গীকার শুধু ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, কার্যকর পদক্ষেপে সেটি প্রতিফলিত করতে হবে।”
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যে অর্থায়ন নিশ্চিত করার জন্য ড. ইউনূস পাঁচটি অগ্রাধিকার বিশ্ব নেতাদের সামনে তুলে ধরেন—
১. ন্যায্যভাবে দেশীয় সম্পদ উত্তোলন: কর ব্যবস্থা হতে হবে স্বচ্ছ ও প্রগতিশীল, যাতে ধনী দেশ ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের ন্যায্য অংশ পরিশোধ করে। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক কর সহযোগিতা কাঠামোর আলোচনায় বৈষম্য দূর করার আহ্বান জানান তিনি।
২. নবীন অর্থায়ন ও সামাজিক ব্যবসা: লাভের বদলে সমাধানকেন্দ্রিক বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে এমন উদ্যোগ নিতে হবে যা মুনাফা পুনরায় সমস্যার সমাধানে বিনিয়োগ করে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করে।
৩. বিশ্ব আর্থিক কাঠামো ও ঋণ শাসন সংস্কার: উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামোতে শক্তিশালী কণ্ঠস্বর দিতে হবে। ঋণকে যেন বোঝা নয়, বরং স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
৪. স্বচ্ছতা ও নাগরিক অংশগ্রহণ: অবৈধ অর্থপ্রবাহ প্রতিরোধ, স্বচ্ছ সম্পদ ব্যবহার এবং জনগণ বিশেষ করে তরুণদের সম্পৃক্ত করা অপরিহার্য। জনগণকে জানতে হবে তাদের কর ও সম্পদ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে।
৫. সবচেয়ে দুর্বলদের জন্য বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করা: দুর্বল জনগোষ্ঠীর জন্য জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, স্থিতিশীল বাসস্থান এবং প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধানে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
অধ্যাপক ইউনূস শেষ বক্তব্যে বলেন, “সেভিলে অঙ্গীকার আমাদের পথপ্রদর্শক। কিন্তু মানবতা আমাদের আরও গভীর এক আহ্বান জানায়—এই পথেই হাঁটতে হবে। বৈষম্য, ক্ষুধা, দারিদ্র্য, পরিবেশ বিপর্যয়—এসব সমস্যার কোনো সীমানা নেই। তাই সমাধানও হতে হবে বিশ্বব্যাপী, ঐক্যবদ্ধভাবে।”
তিনি বিশ্ব নেতাদের উদ্দেশে আহ্বান জানান, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে নিজেদের দায়িত্ব স্বীকার করতে হবে এবং এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



