ছবি: সংগৃহীত
মক্কায় হজ পালনকালে পবিত্র কাবা শরিফের পাশে ফিলিস্তিনের পতাকা তুলে গাজার শিশুদের রক্ষার আহ্বান জানানোর পর সৌদি নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়েছেন এক মিশরীয় হাজি। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকে এ ঘটনাকে ‘মানবতার কণ্ঠরোধ’ এবং ‘ইসলামের মূল শিক্ষার অবমাননা’ বলে উল্লেখ করছেন।
গাজার শিশুদের জন্য কান্না—তারপর গ্রেফতার
রোববার (২৭ জুলাই) মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম Middle East Eye এক প্রতিবেদনে জানায়, গ্র্যান্ড মসজিদের ভেতরে ওই মিশরীয় হাজি ফিলিস্তিনের জাতীয় পতাকা উড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “ও ইসলামা!”—এই শব্দ যুগ যুগ ধরে মুসলমানদের বিপদের সময় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সেইসঙ্গে তিনি চিৎকার করে বলেন, “গাজার শিশুরা মরছে, হে মুসলমানরা!”
এই আবেগঘন দৃশ্য মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, ওই হাজির কথাগুলোর পরপরই সৌদি নিরাপত্তা সদস্যরা হস্তক্ষেপ করে এবং তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়।
সৌদির ব্যাখ্যা বনাম সমালোচকদের ভাষ্য
সৌদি কর্তৃপক্ষ পরে জানায়, ইসলামের পবিত্র স্থানগুলোতে হজ ও ওমরাহ পালনের সময় রাজনৈতিক স্লোগান, জাতীয় পতাকা কিংবা অন্যান্য রাজনৈতিক প্রতীক নিষিদ্ধ—এই নিয়ম ভাঙার দায়ে তাকে আটক করা হয়েছে। তাদের মতে, এসব নিষেধাজ্ঞা মূলত ইবাদতের পবিত্রতা রক্ষার জন্য আরোপ করা হয়েছে।
কিন্তু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলন এবং হাজার হাজার মুসলিম সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী সৌদি সরকারের এই অবস্থানকে দ্বিচারিতা আখ্যা দিয়েছেন। তাদের বক্তব্য—একদিকে গাজায় ইসরাইলি বর্বরতা চলছে, অন্যদিকে মুসলিম বিশ্বের কেন্দ্রস্থল মক্কায় একজন হাজি যদি সেই নির্যাতনের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ জানায়, তাকেও চুপ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, যদি মুসলমানদের কেবলামুখী হওয়ার স্থান কাবাও ‘নির্যাতিতের পক্ষে আওয়াজ তোলার’ জায়গা না হয়, তাহলে কোথায় হবে?
একটি ঘটনাই নয়—বিচ্ছিন্ন না, ধারাবাহিকতা
এটাই প্রথম নয়—এর আগেও সৌদি কর্তৃপক্ষ একই কারণে হাজিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। ২০২৩ সালে এক ব্রিটিশ হাজিকে ফিলিস্তিন পতাকার রঙের তসবিহ ও সাদা কেফিয়ে পরার জন্য আটক করা হয়েছিল। একই সময়ে বেশ কয়েকজনকে ফিলিস্তিন-ইসরাইল ইস্যুতে বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়।
সৌদি আরবের বাইরেও, দেশটির ভেতরে যারা গাজা যুদ্ধ নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন, তাদের ওপরও দমন-পীড়নের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ইসরাইলের বিরুদ্ধে মতপ্রকাশ ও ফিলিস্তিনের প্রতি সহানুভূতি দেখানোয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের গ্রেফতারের নজির ক্রমশ বাড়ছে।
মতপ্রকাশে কঠোরতা, আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস) সৌদি আরবের কার্যত শাসনক্ষমতায় আসার পর থেকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নাটকীয়ভাবে সংকুচিত হয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক জোট রাজনীতি বা ইসরাইল সম্পর্কিত সমালোচনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এমনকি ২০২0 সালে সৌদি আরবের নাগরিক কিছু সাংবাদিক ও একাডেমিকদের কয়েকজনকে শুধুমাত্র ফিলিস্তিন নিয়ে সহানুভূতিশীল পোস্ট করার কারণে কয়েক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে Human Rights Watch।
ইসলামের মর্মবাণী বনাম আধুনিক সৌদি রাজনীতি
অনেক মুসলিম নেতৃবৃন্দ, আলেম এবং ইসলামি চিন্তাবিদ এই ঘটনাকে ইসলামের মূল মর্মবাণীর বিপরীতে দাঁড় করিয়েছেন। তাদের মতে, ইসলাম কেবল ইবাদতের ধর্ম নয়, বরং মানবতা, ন্যায়ের পক্ষেও ধর্ম। কাবার প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে যদি একজন হাজি নির্যাতিত মুসলমান ভাই-বোনদের জন্য কান্না প্রকাশও করতে না পারেন, তাহলে এটি মুসলিম বিশ্বে গভীর হতাশার বার্তা পাঠায়।
অনেকেই এই ঘটনাকে ইসলামের পবিত্র স্থানগুলোর রাজনীতিকীকরণের অংশ বলেও অভিহিত করছেন। সৌদি আরব ইসলাম ধর্মের কেন্দ্রে অবস্থান করেও কীভাবে একটি মানবিক আহ্বানকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে, সেই প্রশ্ন এখন মুসলিম বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই ঘটনা
এই গ্রেফতারের ঘটনা এমন সময় ঘটল, যখন গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি বাহিনীর সামরিক অভিযান ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। শত শত শিশু ও নারীর প্রাণহানি, খাদ্য সংকট এবং মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র প্রতিনিয়ত সামনে আসছে। বিশ্বজুড়ে মুসলমানরা ফিলিস্তিনের জন্য দোয়া ও সহানুভূতি প্রকাশ করলেও সৌদির এই কঠোর অবস্থান অনেকের কাছেই অস্বাভাবিক ও বেদনাদায়ক ঠেকছে।
সমালোচনার ঝড়, প্রশ্ন সৌদির অবস্থান নিয়ে
ঘটনার পরপরই টুইটার (বর্তমানে এক্স), ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকে হ্যাশট্যাগ #FreeThePilgrim, #PalestineInMakkah ট্রেন্ড করতে শুরু করে। লক্ষাধিক মানুষ সৌদি সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আপনি যদি মুসলমানদের সবচেয়ে পবিত্র স্থানে গাজার পক্ষে কথা না বলতে পারেন, তাহলে মুসলিম উম্মাহর পবিত্রতা কোথায়?”
এদিকে কয়েকটি মুসলিমপ্রধান দেশের বিশিষ্ট আলেম ও সংগঠনও সৌদি সরকারের এই আচরণের সমালোচনা করে বিবৃতি দিয়েছে।
এই ঘটনাটি শুধু একজন হাজির গ্রেফতারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি, মানবতা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার জটিল বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। অনেকেই মনে করছেন, এই পরিস্থিতি সামনে আরও বড় প্রতিবাদ এবং নৈতিক প্রশ্নের জন্ম দেবে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



