ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও রোমাঞ্চকর খেলা ফুটবল। গোলপোস্টের জালের বল জড়ানোর এই লড়াইয়ের দিকে কোটি কোটি মানুষের চোখ আটকে থাকে ঠিক ৯০ মিনিট। দুটি অর্ধে সমান ৪৫ মিনিট করে বিভক্ত এই খেলায় মাঝখানে থাকে মাত্র ১৫ মিনিটের বিরতি। তবে কখনও কি মনে প্রশ্ন জেগেছে, ফুটবল ম্যাচের নির্ধারিত সময় কেন ঠিক ৯০ মিনিটই করা হলো? কেন এর চেয়ে কম বা বেশি সময় নির্ধারণ করা হলো না?
ফুটবলের এই বহুল প্রচলিত ৯০ মিনিটের নিয়মের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস, আকস্মিক কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা, তৎকালীন যাতায়াত ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র এবং গবেষকদের নানা আকর্ষণীয় গাণিতিক ও তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা। খেলার জন্মলগ্ন থেকে আজকের আধুনিক রূপ লাভ করার পেছনে রয়েছে এক রোমাঞ্চকর পথপরিক্রমা।
ফুটবলের আদি পর্বে সময়ের কোনো নির্দিষ্ট বাধানিষেধ ছিল না
খেলার বর্তমান আধুনিক যুগে ৯০ মিনিটের বিধান অত্যন্ত কঠোরভাবে মানা হলেও, ফুটবলের ইতিহাসের শুরুর দিকে ম্যাচের নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বা স্থায়ী কোনো সময় কাঠামো ছিল না।
১৮৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএ) প্রথমবারের মতো ফুটবলের লিখিত ও আনুষ্ঠানিক কিছু নিয়মকানুন প্রকাশ করে। এই নিয়মগুলো প্রণয়নের পেছনে সংস্থাটির প্রথম মহাসচিব এবেনেজার কব মর্লির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এফএ-এর সেদিনের সেই আদি নিয়মাবলীতে ম্যাচটি ঠিক কত সময় ধরে মাঠে গড়াবে কিংবা প্রতি দলে কতজন করে খেলোয়াড় অংশ নেবেন—তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো ধারা বা নির্দেশনা উল্লেখ করা হয়নি।
সেই সময়ে ইংল্যান্ডের শেফিল্ড শহরটি ছিল বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। ১৮৫৭ সালে এখানেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন ফুটবল ক্লাব ‘শেফিল্ড এফসি’। এর পরের বছর ক্লাবটি তাদের নিজস্ব কিছু নীতিমালা প্রকাশ করে, যা ইতিহাসে ‘শেফিল্ড রুলস’ নামে পরিচিতি লাভ করে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, সেখানেও ম্যাচের নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি।
শেফিল্ডের দুই ঘণ্টার ম্যাচ ও অনির্দিষ্ট সময়সীমা
বিশিষ্ট ফুটবল ইতিহাসবিদ ও গবেষক অ্যাড্রিয়ান হার্ভির গভীর গবেষণা থেকে জানা যায়, ১৮৫০-এর দশকের শেষ দিকে শেফিল্ডের মাঠগুলোতে যে সমস্ত ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হতো, সেগুলোর ফরম্যাট আজকের আধুনিক ফুটবলের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। তখন কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম না থাকায় প্রতি দলে প্রায় ২০ জন করে খেলোয়াড় একসঙ্গে মাঠে নেমে খেলতেন।
খেলার কোনো টাইমকিপিং বা নির্দিষ্ট সমাপ্তি না থাকায় একটি ম্যাচ চলত টানা প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে! এমনকি ১৮৬২ সালেও খেলার সময় নিয়ে সর্বজনীন বা গ্রহণযোগ্য কোনো আইন তৈরি হয়নি। সেই যুগে একেকটি ম্যাচ কখনো এক ঘণ্টায় শেষ হয়ে যেত, আবার কোনো কোনো রোমাঞ্চকর বা হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ম্যাচ তিন ঘণ্টা পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হতো। সময়ের এই অনিশ্চয়তা খেলাটিকে একটি সুশৃঙ্খল কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছিল।
যেভাবে প্রথম চালু হলো ৯০ মিনিটের ম্যাচ
ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, বর্তমানের মতো প্রথম ৯০ মিনিটের নির্ধারিত সময়ে কোনো ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৬৬ সালের ৩১ মার্চ। ওই দিন লন্ডনের বিখ্যাত ব্যাটারসি পার্কে শেফিল্ড এফসির মুখোমুখি হয়েছিল লন্ডনের বিভিন্ন নামকরা ক্লাবের সেরা খেলোয়াড়দের নিয়ে গঠিত একটি বিশেষ দল।
ঐতিহাসিক ও গবেষকদের মতে, এই ৯০ মিনিট সময় নির্ধারণের পেছনে অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক একটি কারণ কাজ করেছিল। সে যুগে শেফিল্ড থেকে খেলোয়াড় ও দর্শকদের লন্ডনে যাতায়াত করতে হতো ট্রেনে করে। ট্রেন ছাড়ার নির্দিষ্ট সময়সূচি এবং রেলওয়ের টাইম টেবিলের কথা মাথায় রেখেই ম্যাচটির স্থায়িত্ব বা সময়সীমা ঠিক সাড়ে এক ঘণ্টা বা ৯০ মিনিটে বেঁধে দেওয়া হয়েছিল।
পরবর্তীতে রেলওয়ের সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি এই ৯০ মিনিটের ফরম্যাটটি খেলোয়াড় ও দর্শকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এর ফলশ্রুতিতে ১৮৭১ সালে যখন মর্যাদাপূর্ণ ‘এফএ কাপ’-এর প্রথম আসর বসল, তখন প্রতিযোগিতার আনুষ্ঠানিক নিয়মেই প্রতিটি ম্যাচের সময় পাকাপাকিভাবে দেড় ঘণ্টা বা ৯০ মিনিট নির্ধারণ করা হয়।
সংখ্যার রহস্য ও মধ্যযুগীয় ৬০ মিনিটের ধারণা
ফুটবল ম্যাচের সময় ৯০ মিনিট হওয়ার পেছনে কেবল ট্রেন বা যাতায়াতের ঐতিহাসিক ঘটনাই নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সময় পরিমাপের পুরোনো গাণিতিক ও তাত্ত্বিক রহস্য। বিখ্যাত ইংরেজ গবেষক পিটার সেডন তার অত্যন্ত জনপ্রিয় বই ‘ফুটবল টক: দ্য ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড ফোকলোর অব দ্য ওয়ার্ল্ডস গ্রেটেস্ট গেম’-এ এই বিষয়ে একটি সুদূরপ্রসারী ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন।
তার মতে, সময়কে ৬০ মিনিটের একটি নির্দিষ্ট ইউনিটে ভাগ করার প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ধারণার সঙ্গে ৯০ মিনিটের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। প্রায় ৬০০ বছর আগে গণিতে ‘৬০’ সংখ্যাটিকে একটি অত্যন্ত পূর্ণাঙ্গ, নিখুঁত ও সহজে হিসাবযোগ্য বা গোছানো সংখ্যা হিসেবে গণ্য করা হতো। সেই ঐতিহ্যগত ধারণা থেকেই সময়ের ১৫ মিনিটের ভাগ কিংবা এর নানা গুণিতকগুলো ক্রীড়াঙ্গনে সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্ব পেতে শুরু করে। এমনকি বিশ্বখ্যাত টেনিস খেলার প্রাচীন স্কোরিং পদ্ধতির সঙ্গেও এই বিশেষ সংখ্যাগত ধারণার গভীর মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
ফুটবলে ১৫ মিনিটের অদৃশ্য মনস্তাত্ত্বিক গুরুত্ব
আধুনিক ফুটবলের ৯০ মিনিটের এই সময়সীমাকে যদি চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়, তবে দেখা যাবে পুরো ম্যাচটি মূলত ছয়টি ১৫ মিনিটের ভাগে বিভক্ত। খেলার কৌশলগত দিক থেকে এই ১৫ মিনিটের ভাগগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম।
ফুটবল কোচ ও ম্যানেজাররা সাধারণত ম্যাচের প্রথম ১৫ মিনিট দলকে প্রতিপক্ষের কৌশল বোঝার জন্য রক্ষণ সামলে ঠান্ডা মাথায় খেলার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। আবার ঠিক তেমনিভাবে, ম্যাচের শেষ ১৫ মিনিটকে ক্রীড়াজগতে বিবেচনা করা হয় সবচেয়ে রোমাঞ্চকর, জটিল ও নির্ণায়ক সময় হিসেবে। কারণ শারীরিক ক্লান্তি ও স্নায়ুর চাপের এই মুহূর্তে অনেক ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায়।
ফরাসি কিংবদন্তি ফুটবল কোচ ও দূরদর্শী ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব আর্সেন ওয়েঙ্গারও সবসময় বিশ্বাস করতেন যে, ইউরোপিয়ান বা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের মতো বড় ম্যাচে শেষ ১০ থেকে ১৫ মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও টার্নিং পয়েন্ট। কারণ এই সময়ই ক্লান্ত খেলোয়াড়দের ওপর মানসিক চাপ বাড়ায় যেকোনো দল আকস্মিকভাবে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
সংক্ষেপে বলা যায়, ফুটবল ম্যাচ ৯০ মিনিট স্থায়ী হওয়ার পেছনে কোনো একক বা পরীক্ষাগারে প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক কারণ নেই। বরং এটি দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ, উনিশ শতকের রেলওয়ের যাতায়াত ব্যবস্থা, মধ্যযুগীয় গাণিতিক ধ্যান-ধারণা এবং সময়ের সঙ্গে মানুষের অভ্যস্থতার এক নান্দনিক ও স্বতঃস্ফূর্ত সমন্বয়। আর এই দীর্ঘ পথপরিক্রমা পার হয়ে তৈরি হওয়া ৯০ মিনিটের সেই চিরচেনা নিয়মটিই আজ বিশ্বজুড়ে ফুটবলকে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাণবন্ত ও আকর্ষণীয় উপাস্য খেলায় পরিণত করেছে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



