ছবি: সংগৃহীত
বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ সংস্থার বাণিজ্যিক স্বত্ব নিয়ে তৈরি হওয়া তীব্র বিতর্ক ও নানা মহলের সমালোচনার মুখেও পিছু হঠছেন না জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। ফিফা সভাপতির পদ থেকে স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ানোর কোনো পরিকল্পনা তার নেই। বরং বৈশ্বিক ফুটবলের এই শীর্ষ পদে নিজের আধিপত্য বজায় রেখে ২০৩১ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালনের লক্ষ্যে চতুর্থবারের মতো ফিফা সভাপতি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। বিশেষ করে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) শক্ত সমর্থন পাওয়ার পর তার পুনর্নির্বাচনের আত্মবিশ্বাস এখন আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে।
চলতি বছরের জুলাই মাসে ফিফার বাণিজ্যিক ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে একটি বেসরকারি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে ফিফার অংশীদারত্ব বিক্রির বিতর্কিত প্রস্তাব সামনে এনেছিলেন জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ বা সংক্ষেপে এফএফই (FFE) নামের ওই উদ্যোগটি প্রকাশ পাওয়ার পরই বিশ্ব ফুটবল অঙ্গনে তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে।
বিনিয়োগকারীদের হাতে ফিফার বাণিজ্যিক স্বত্ব চলে যাওয়ার আশঙ্কায় বিভিন্ন দেশের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ও ইউরোপীয় পক্ষ থেকে তীব্র আপত্তি জানানো হয়। বাড়তে থাকা বিতর্কের মুখে শেষ পর্যন্ত নজিরবিহীনভাবে ওই বিতর্কিত প্রস্তাবটি থেকে সরে আসতে বাধ্য হয় ফিফা। আর এর পরই ফিফা সভাপতির পদ থেকে ইনফান্তিনোর পদত্যাগের দাবি জোরালো হয়ে ওঠে।
সম্প্রতি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে নিজের পদত্যাগের সম্ভাবনা নিয়ে চলা গুঞ্জনকে এক ফুৎকারে উড়িয়ে দেন ফিফা প্রধান। ক্যামেরার সামনে হাসিমুখেই নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে ইনফান্তিনো বলেন, ফিফার অন্তর্ভুক্ত ২১১টি সদস্য সংস্থার গণতান্ত্রিক ভোটের মাধ্যমেই তিনি এই পদে নির্বাচিত হয়েছেন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের বিশাল এই ক্রীড়া সংস্থায় বিভিন্ন দেশ ও মহাদেশের ভিন্নমত থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। তবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সবার মতামত ও ভোটের মূল্য সমান হলেও, যখন বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য কোনো একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে উপনীত হয়, তখন সেটিকে যথাযথ সম্মান জানানো উচিত। ফুটবল যে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নয়, বরং গোটা পৃথিবীর—এই বিশ্বাসের কথা পুনর্ব্যক্ত করে তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সদস্য সংস্থাগুলোর মতামতকে সবসময় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর জোর দেন।
শুরুতে এফএফই (FFE) প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক যখন তুঙ্গে, তখন এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি), উত্তর-মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা (কনকাকাফ) এমনকি ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা (উয়েফা)-র একাংশও ইনফান্তিনোর কঠোর সমালোচনা মুখর হয়েছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তন আসতে শুরু করে।
-
এশিয়ার সমর্থন: সম্প্রতি টোকিও সফরকালে এএফসির পূর্ণ সমর্থন লাভ করেছেন ইনফান্তিনো। এএফসি সভাপতি শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল খলিফা শুক্রবার স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন যে, এশিয়ার ফুটবল প্রশাসন সভাপতি ইনফান্তিনোর সঙ্গেই ঐক্যবদ্ধভাবে রয়েছে।
-
আফ্রিকান দেশগুলোর সায়: সম্প্রতি কেপ ভার্দে সফর শেষে ইনফান্তিনো দাবি করেন যে, আফ্রিকার দেশগুলোর ফুটবল সংস্থাও তার নেতৃত্বের পাশে শক্তভাবে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে তার এই নিয়মিত যোগাযোগ ও কূমশ বাড়ন্ত সমর্থন তাকে সুবিধাজনক অবস্থানে রেখেছে।
অন্যদিকে, কনকাকাফের ভেতর মতপার্থক্য দেখা দেওয়ায় এবং এএফসি তাদের আগের অবস্থান থেকে সরে এসে ইনফান্তিনোকে সমর্থন দেওয়ায় ইউরোপীয় পক্ষগুলো এই ইস্যুতে ক্রমশ একা হয়ে পড়েছে।
গত সপ্তাহে সুইজারল্যান্ডের জ্যুরিচে অনুষ্ঠিত ফিফা কাউন্সিলের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এফএফই (FFE) প্রস্তাব পরিচালনা পদ্ধতি নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং সবার সামনে ক্ষমা চান ইনফান্তিনো। তবে তার এই দুঃখ প্রকাশ বা সমঝোতার পদক্ষেপ জার্মানি ও ইংল্যান্ডের মতো প্রভাবশালী ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থাগুলোর অসন্তোষ পুরোপুরি দূর করতে পারেনি।
৫৬ বছর বয়সি এই সুইস-ইতালীয় ফুটবল প্রশাসক অবশ্য স্বীকার করেছেন যে, বিশ্বজুড়ে এতগুলো ভিন্নপক্ষের ভিন্নমতকে এক ছাদের নিচে নিয়ে আসা সবসময় সহজ কাজ নয়। তবুও মতপার্থক্য ভুলে সবাইকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সবার কণ্ঠস্বর ও বক্তব্যকে সম্মান জানিয়েই ফুটবলের চাকা সচল রাখতে হবে।
আগামী ২০২৭ সালের মার্চ মাসে ফিফা সভাপতির পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ওই নির্বাচনে চতুর্থ মেয়াদে নিজের প্রার্থিতা ঘোষণা করে লড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ইনফান্তিনো। নিয়ম অনুযায়ী, সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ১৮ নভেম্বর।
ফিফার ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব কার হাতে যাবে, তা নিয়ে বাইরের যতই আলোচনা বা সমালোচনা হোক না কেন, চূড়ান্ত ক্ষমতা যে সদস্য দেশগুলোর হাতেই ন্যস্ত—সেকথা আরও একবার স্পষ্ট করে দিয়েছেন ইনফান্তিনো। তার সুষ্পষ্ট ঘোষণা—কে পরবর্তী সভাপতি হবেন এবং এই বৈশ্বিক সংস্থাটি আগামী দিনে কীভাবে পরিচালিত হবে, সেই চূড়ান্ত রায় দেওয়ার একমাত্র অধিকার কেবল ফিফার সদস্য দেশগুলোরই রয়েছে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



