ছবি: সংগৃহীত
স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য সুবিধা অক্ষুণ্ণ রাখতে বিভিন্ন দেশ ও বাণিজ্য জোটের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন ছয় দেশের জোট ‘গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল’ (জিসিসি)-এর সঙ্গে প্রস্তাবিত এফটিএ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) সাম্প্রতিক এক সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় দেখা গেছে, চুক্তি অনুসারে জিসিসিভুক্ত দেশগুলো থেকে আমদানি করা সব পণ্যের শুল্ক-কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হলে বাংলাদেশের বছরে প্রায় ১,৭০০ কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হতে পারে। তবে পর্যায়ক্রমে শুল্ক কমানো (‘স্টেজিং’ পদ্ধতি) এবং বাণিজ্য বৃদ্ধিসহ কৌশলগত পদক্ষেপে এই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ ও সরকারি কর্মকর্তারা।
আগামী বছরগুলোতে এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে বিদ্যমান শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা হারাবে। এই সম্ভাব্য বাণিজ্য ধাক্কা সামলাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ ৮ থেকে ১০টি দেশ ও জোটের সঙ্গে কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (সিইপিএ) বা এফটিএ সম্পন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানান, বিশ্ববাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করা এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে এলডিসি উত্তরণের আগেই এই চুক্তিগুলো সম্পন্ন করার প্রক্রিয়া দ্রুততর করা হচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় জিসিসি জোটের সঙ্গে এফটিএ করার এ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা করা হয়।
জিসিসি জোটের ছয়টি সদস্য রাষ্ট্র হলো— সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, ওমান ও বাহরাইন।
সংকলিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই অঞ্চলে বাংলাদেশের রপ্তানি ও আমদানির মধ্যে একটি বিশাল ব্যবধান রয়েছে:
-
জিসিসিতে বাংলাদেশের রপ্তানি: প্রায় ৬৯ কোটি মার্কিন ডলার।
-
জিসিসি থেকে বাংলাদেশের আমদানি: প্রায় ৫৬৪ কোটি মার্কিন ডলার।
বর্তমানে বাংলাদেশ প্রধানত তৈরি পোশাক, মসলা, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, পানপাতা, শাকসবজি, পাটের সুতা ও ফলের জুস রপ্তানি করে থাকে। অন্যদিকে, জিসিসির দেশগুলো থেকে বাংলাদেশের আমদানির বড় অংশই জুড়ে রয়েছে পেট্রোলিয়াম ও জ্বালানি পণ্য। ফলে সব ধরনের শুল্ক শূন্য করা হলে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব ঝুঁকির মুখে পড়বে এই জ্বালানি খাতই।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পক্ষ থেকে শুল্ক কমার ফলে সৃষ্ট ঘাটতি পূরণ ও বিকল্প রাজস্ব আদায়ের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এই রাজস্ব ক্ষতি ন্যূনতম পর্যায়ে রাখতে সমীক্ষায় বিশেষ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে:
১. সংবেদনশীল শুল্ক কাঠামো (Sensitive List): যেসব পণ্য থেকে উচ্চ রাজস্ব আসে এবং যা দেশীয় সংবেদনশীল শিল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত, সেগুলোতে শুল্ক পুরোপুরি শূন্য না করে সীমিত পর্যায়ে ৫ শতাংশ বজায় রাখা। ২. ধাপে ধাপে শুল্ক কমানো (Staging Phase): চুক্তি কার্যকর হওয়ার পরপরই একলাফে শুল্ক না কমিয়ে পর্যায়ক্রমে কমানো।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এফটিএ অনুবিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, এফটিএ স্বাক্ষরিত হলে প্রথম বছরেই বড় রাজস্ব ধাক্কা আসবে না। চুক্তি বাস্তবায়নের সাথে সাথে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে দীর্ঘমেয়াদে এই প্রাথমিক রাজস্ব ক্ষতি অনেকটাই সমন্বয় করা সম্ভব হবে। বিটিটিসির হিসেব অনুযায়ী, এফটিএ হলে জিসিসি থেকে বাংলাদেশের আমদানি প্রায় ২১ কোটি ডলার বাড়তে পারে (যার মধ্যে সাড়ে ১৪ কোটি ডলার ট্রেড ক্রিয়েশন এবং সাড়ে ছয় কোটি ডলার ট্রেড ডাইভারশন)।
রাজস্ব হ্রাসের শঙ্কা থাকলেও জিসিসির সুবিশাল বাজারে বাংলাদেশের জন্য বিপুল সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে পারে:
-
তৈরি পোশাক খাত: ২০২৪ সালে জিসিসিভুক্ত দেশগুলো প্রায় ১৩.৫৪ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক আমদানি করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের ওপর গড় এমএফএন (MFN) শুল্ক ৫.০৩ শতাংশ (কৃষিপণ্যে ৬.৬২% ও অকৃষিপণ্যে ৪.৮%) রয়েছে। এফটিএ হলে পোশাক খাতে বাংলাদেশ বড় বাজার পেতে পারে। তবে পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ জানিয়েছে, কম শুল্ক থাকা সত্ত্বেও অতীতে আশানুরূপ প্রবেশ করা যায়নি, তাই খাতভিত্তিক নিখুঁত বিশ্লেষণ প্রয়োজন। বিকেএমইএ প্রতিনিধিরা অবশ্য এই ১৩ বিলিয়ন ডলারের বাজারে বড় রপ্তানি বৃদ্ধির আশা প্রকাশ করেছেন।
-
অন্যান্য পণ্য: ওষুধ, হালাল খাদ্যসামগ্রী, প্রক্রিয়াজাত চামড়াজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, ফুটওয়্যার, সিরামিক ও বাইসাইকেলের রপ্তানি বহুগুণ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
-
সেবা খাত ও দক্ষ জনশক্তি (Mode-4): কেবল পণ্য বাণিজ্য নয়, এফটিএ-তে ‘মুভমেন্ট অব ন্যাচারাল পারসন্স’ বা মোড-৪ এর আওতায় সেবা খাত ও দক্ষ কর্মী পাঠানোর সুবিধা যুক্ত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি ও রেমিট্যান্স উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে।
কর্মশালায় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরা এফটিএ-এর বহুমুখী সুবিধার কথা তুলে ধরেন:
-
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ERD) ও FBCCI: জিসিসির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত কেবল রাজস্ব আয়ের দৃষ্টিতে দেখা উচিত নয়। এর পেছনে বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত সুবিধা রয়েছে। বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক সংকটের সময়ে জ্বালানি কিংবা অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে জিসিসি জোটের সঙ্গে চুক্তি (সিইপিএ/ইপিএ) বাংলাদেশকে সুবিধা দেবে।
-
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়: ইতিপূর্বে জিসিসির সঙ্গে পাঁচটি আলাদা খাতে সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এখন এফটিএ-র জন্য অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
-
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ: যেহেতু বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি পেট্রোলিয়াম আমদানি করে, তাই এই বাণিজ্য চুক্তিতে সুনির্দিষ্ট জ্বালানি সহযোগিতা (Energy Cooperation) অন্তর্ভুক্ত করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
সৌদি আরবসহ গালফ দেশগুলোর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়িত হলে স্বল্পমেয়াদে প্রায় ১,৭০০ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতির যে ঝুঁকি রয়েছে, তা কৌশলগত শুল্ক নির্ধারণের মাধ্যমে কমানো সম্ভব। পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, হালাল পণ্য এবং দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে এই এফটিএ বাংলাদেশের উত্তরণ-পরবর্তী অর্থনীতিতে এক নতুন গতি সঞ্চার করবে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



