ছবি: সংগৃহীত
দেশব্যাপী চোরাচালান প্রতিরোধ ও রাজস্ব ফাঁকি বন্ধে একের পর এক সফল অভিযানের ধারাবাহিকতায় এবার চোরাচালানকারীদের এক নতুন ও অভিনব রুট এবং কৌশলের সন্ধান পেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি)। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও কমলাপুর রেলওয়ে ফরেন পোস্ট অফিসে পরিচালিত দুই দিনব্যাপী ঝটিকা অভিযানে কোটি টাকারও বেশি মূল্যের চোরাই পণ্য জব্দ করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত পণ্যের মধ্যে রয়েছে মারাত্মক জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিপূর্ণ সাইলডেনাফিল (ভায়াগ্রা) ও তাপমাত্রা-সংবেদনশীল ইনসুলিনসহ বিপুল পরিমাণ ওষুধ, ক্ষতিকর কেমিক্যালযুক্ত ত্বক ফর্সাকারী নিষিদ্ধ ক্রিম, স্বর্ণালঙ্কার, বিদেশি সিগারেট, ল্যাপটপ, ব্যবহৃত স্মার্টফোন এবং মাদকদ্রব্য।
বিভাগীয় গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, গত ১৩ ও ১৪ অক্টোবর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে ফরেন পোস্ট অফিসে এই পৃথক ও সমন্বিত অভিযানগুলো পরিচালিত হয়। দুই দিনের অভিযানে উদ্ধারকৃত চোরাই ও অবৈধ পণ্যের মোট আনুমানিক বাজারমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১ কোটি ১৩ লাখ ৪০ হাজার ১০০ টাকা।
বিমানবন্দর থেকে রেলপথ: চোরাচালানের নতুন কৌশল উন্মোচিত
সিআইআইডির অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্রগুলোর নিত্যনতুন কৌশল। এবার আকাশপথে পণ্য এনে বিমানবন্দরের ভেতরেই খালাস না করে, ডাক ব্যবস্থার ফাঁকফোকর গলে তা রেলপথে দূরবর্তী জেলাগুলোতে পৌঁছে দেওয়ার এক জটিল ও চতুর ছক উন্মোচিত হয়েছে।
অভিযানের বিবরণ অনুযায়ী, ১৩ অক্টোবর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের ফরেন পোস্ট অফিসে এক ঝটিকা অভিযান চালান কাস্টমস গোয়েন্দারা। সেখানে সন্দেহভাজন ডাকপণ্য তল্লাশি করে উদ্ধার করা হয় ৭,৭৮৭ পিস আমদানি-নিষিদ্ধ বিষাক্ত ‘গৌরি ক্রিম’ এবং ৩১টি ব্যবহৃত ল্যাপটপ। অনুসন্ধানে জানা যায়, আকাশপথে বিভিন্ন ফ্লাইটে দেশে পৌঁছানোর পর পণ্যগুলো বিমানবন্দরের মূল কাস্টমস চ্যানেল এড়িয়ে কৌশলগতভাবে পাঠানো হয় বিমানবন্দর ডাক বাছাই কেন্দ্রে (Airport Sorting Centre)। সেখান থেকে কমলাপুরের রেলওয়ে মেইল সার্ভিস (RMS) সেন্টার হয়ে তা ট্রেনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম জেনারেল পোস্ট অফিসে (GPO) পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল।
চোরাচালানকারীদের মূল লক্ষ্য ছিল ঢাকা কিংবা বিমানবন্দরে কাস্টমসের কড়া নজরদারি এড়িয়ে অপেক্ষাকৃত কম নজরদারির আওতায় থাকা চট্টগ্রাম জিপিও থেকে সুবিধাজনক সময়ে এসব পণ্য খালাস করে বাজারে সরবরাহ করা। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে বিমান, ডাক এবং রেল—এই তিন পরিবহনের শৃঙ্খলে সমন্বিত কাস্টমস নজরদারির জরুরি প্রয়োজনীয়তা আরও জোরালোভাবে ফুটে উঠেছে।
ব্যাগেজে মারাত্মক ঝুঁকি: ৫৫ কেজি ভায়াগ্রা ও ইনসুলিন আটক
অভিযানের দ্বিতীয় দিন, ১৪ অক্টোবর কাস্টমস গোয়েন্দাদের সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়টি নজরে আসে। এদিন ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্সের (ফ্লাইট নম্বর ET680) একটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের যাত্রী জাহাঙ্গীরের ব্যাগেজ কাস্টমস গ্রিন চ্যানেলে স্ক্যানিং ও তল্লাশি করা হয়। সেখান থেকে ভায়াগ্রা ও ইনসুলিনসহ প্রায় ৫৫.৮ কেজি বিভিন্ন ধরনের সংবেদনশীল ওষুধ আটক করা হয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সাইলডেনাফিল বা ভায়াগ্রাজাতীয় ওষুধের অবাধ ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার মানবদেহে মারাত্মক দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি এবং হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি করে। অন্যদিকে, ইনসুলিনের মতো জীবনরক্ষাকারী ওষুধ নির্দিষ্ট তাপমাত্রা (কোল্ড চেইন) বজায় না রেখে ব্যাগেজে করে অননুমোদিতভাবে পরিবহন করলে ওষুধের গুণাগুণ নষ্ট হয়ে তা বিষাক্ত উপাদানে পরিণত হয়। কাস্টমস গোয়েন্দাদের এই সময়োপযোগী পদক্ষেপে মারাত্মক জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি থেকে রক্ষা পেল দেশ।
ব্যাগেজ তল্লাশি ও পরিত্যক্ত চালানে পণ্যের বিশাল বহর
দুই দিনের এই ধারাবাহিক অভিযানে বিমানবন্দরে সাধারণ যাত্রীদের ব্যাগেজ ও পরিত্যক্ত কার্টন থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ মূল্যবান ও ক্ষতিকর দ্রব্যাদি:
-
১৩ অক্টোবরের অভিযান: হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করা বিভিন্ন মধ্যপ্রাচ্য ও এশীয় ফ্লাইটের সন্দেহভাজন যাত্রীদের ব্যাগেজ তল্লাশি করে ১০০ গ্রাম স্বর্ণালঙ্কার, ল্যাপটপ, স্যামসাং গ্যালাক্সি S25 FE-সহ বেশ কয়েকটি ফ্ল্যাগশিপ ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, ২৮৮ কার্টন বিদেশি সিগারেট, ৪৬ কেজি বিষাক্ত ত্বক ফর্সাকারী ক্রিম এবং ১৭ লিটার বিদেশি মদ ও অ্যালকোহলজাতীয় পানীয় জব্দ করা হয়।
-
১৪ অক্টোবরের অভিযান: এদিন থাই এয়ারওয়েজ, সালাম এয়ারসহ বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের যাত্রী ও বিমানবন্দর ট্রানজিট এলাকায় ফেলে রাখা একাধিক পরিত্যক্ত কার্টন থেকে যৌথভাবে উদ্ধার করা হয় ২৪৩ কার্টন বিভিন্ন ব্যান্ডের বিদেশি সিগারেট, ৩৮ কেজি কসমেটিকস সামগ্রী এবং আরও ১৮.১৮ কেজি ক্ষতিকর ‘গৌরি ক্রিম’।
জব্দকৃত পণ্যের সার্বিক খতিয়ান
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সমন্বিত তথ্য অনুযায়ী, দুই দিনে আটক করা মোট পণ্যের তালিকা ও পরিমাণ নিচে তুলে ধরা হলো:
|
জব্দকৃত পণ্যের নাম |
মোট পরিমাণ |
|
আমদানি-নিষিদ্ধ গৌরি ক্রিম (কমলাপুর) |
৭,৭৮৭ পিস |
|
নিষিদ্ধ ত্বক ফর্সাকারী ক্রিম (বিমানবন্দর) |
৬৪.১৮ কেজি |
|
অন্যান্য কসমেটিকস |
৬৮ কেজি |
|
ওষুধ (ভায়াগ্রা ও ইনসুলিনসহ) |
৫৫.৮ কেজি |
|
স্বর্ণালঙ্কার |
১০০ গ্রাম |
|
ল্যাপটপ ও ব্যবহৃত স্মার্টফোন |
৩২টি ল্যাপটপ ও ৩টি মোবাইল ফোন |
|
মদ ও অ্যালকোহলজাতীয় পানীয় |
১৭ লিটার |
|
আটককৃত পণ্যের সর্বমোট বাজারমূল্য |
১,১৩,৪০,১০০ টাকা (১ কোটি ১৩ লাখ ৪০ হাজার ১০০ টাকা) |
জাতীয় অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কাস্টমস
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, এই ধারাবাহিক ও সফল অভিযান কেবল শুল্ক-কর ফাঁকি রোধ করে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব সুরক্ষা করেনি, বরং অবৈধ ওষুধের বিশ্বব্যাপী কালোবাজারি প্রতিরোধ ও সার্বিক জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় অসামান্য অবদান রেখেছে।
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আকাশপথ, সমুদ্রপথ কিংবা স্থলপথ—কোনো মাধ্যমকেই চোরাচালানকারীরা যেন নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে, সেজন্য জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, পোস্টাল বাছাই কেন্দ্র এবং রেলওয়ে যোগাযোগের স্থানগুলোতে এই সমন্বিত গোয়েন্দা নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক অনুসন্ধান কার্যক্রম ভবিষ্যতেও আরও কঠোর ও জোরদার করা হবে।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



