ছবি: সংগৃহীত
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর করতে ও স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে বিশ্বব্যাংকের কাছে দুই বছরমেয়াদি বিশেষ আর্থিক সুরক্ষাবলয় (ফাইন্যান্সিয়াল সেফটি নেট) চেয়েছে সরকার। ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক বার্ষিক সভার ফাঁকে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিশ্বব্যাংক গ্রুপের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে এই প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। তবে সুরক্ষাবলয়ের আওতায় অর্থায়নের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ, শর্ত কিংবা অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার সহায়তা নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, আলোচনার এ প্রক্রিয়াটি আগামী কয়েক মাস ধরে ঢাকায় এবং বিশ্বব্যাংকের সদর দফতরে চলমান থাকবে।
১. সংকট মোকাবিলা ও আর্থিক সুরক্ষাবলয়ের প্রস্তাব
মূলত সার্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার মধ্যবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ ও অর্থায়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতেই বাংলাদেশ এই সুরক্ষাবলয়ের প্রস্তাব দিয়েছে।
-
আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সমন্বয়: অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ সমন্বিত সহযোগিতার ওপর জোর দিয়েছেন।
-
অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের পাশে পাওয়া: দুই বিশ্বসংস্থা একত্রে কাজ করলে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)সহ অন্যান্য বহুপক্ষীয় ঋণদাতাদের কাছ থেকেও বাজেট সহায়তা পেতে বাংলাদেশের পথ সুগম হবে।
-
ইতিবাচক বিনিয়োগ বার্তা: আন্তর্জাতিক বাজার ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কাছে দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার ইতিবাচক বার্তা পৌঁছানো যাবে।
বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) অজয় বঙ্গার সঙ্গে বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার যখন দায়িত্ব নেয়, তখন দেশের অর্থনীতি মারাত্মক সংকটের মধ্যে ছিল। বিগত সরকারের রেখে যাওয়া বিপুল দায়ভার এবং সাম্প্রতিক বৈশ্বিক যুদ্ধ ও সংঘাতের প্রভাবে যে অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে, বিশ্বব্যাংক তা অনুধাবন করছে। সরকার গৃহীত নীতি ও আগামী দিনের অর্থনৈতিক গতিপথের সঙ্গে বিশ্বব্যাংক পূর্ণ একমত পোষণ করেছে এবং বাংলাদেশকে পূর্ণাঙ্গ সমর্থন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
২. অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলারের গুঞ্জন ও প্রকৃত বাস্তবতা
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বিশ্বব্যাংকের কাছে বাংলাদেশের অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার সহায়তা চাওয়ার খবর প্রকাশ পেয়েছিল। অর্থমন্ত্রী এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলোকে অসংগতিপূর্ণ ও অসম্পূর্ণ বলে অভিহিত করেন। তিনি স্পষ্ট করেন যে, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে যেকোনো আলোচনা একটি দীর্ঘ ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।
অর্থমন্ত্রী বলেন, “একটি বৈঠকেই সবকিছু চূড়ান্ত হয়ে যায় না। এটি আলোচনার সূচনা মাত্র। এই আলোচনার ওপর ভিত্তি করে বেশ কিছু ফলোআপ বৈঠক হবে, যা আগামী কয়েক মাস ধরে ঢাকার মাটিতেও চলবে। ফলে এই মুহূর্তেই কোনো সংখ্যা বা পরিমাণকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।”
৩. নতুন দেশভিত্তিক অংশীদারিত্ব কাঠামো (সিপিএফ)
বৈঠকে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের পরবর্তী দেশভিত্তিক অংশীদারিত্ব কাঠামো বা কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক (সিপিএফ) প্রণয়ন নিয়ে বিস্তারিত কথা হয়েছে। সরকার চায় আগামী ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে এই নতুন কাঠামোটি চূড়ান্ত করতে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত আরআরআইপি (RRIP) কৌশলকে এই কাঠামোর মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত নতুন নীতিমালায় ৪টি বিশেষ খাতের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে:
-
বাণিজ্য অর্থায়ন (Trade Financing): জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সারের মতো জরুরি ও অত্যাবশ্যকীয় নিত্যপণ্য আমদানির জন্য সাশ্রয়ী অর্থায়ন নিশ্চিত করা।
-
ব্যবসা-বাণিজ্য সহজীকরণ: বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের বিকাশ ও ব্যবসায়িক পরিবেশ সহজ করা।
-
আর্থিক খাত সংস্কার: ব্যাংক ও আর্থিক কাঠামোর দুর্বলতা দূর করে সুশাসন ও স্থায়িত্ব ফিরিয়ে আনা।
-
অর্থনৈতিক অভিঘাত মোকাবিলা: বৈশ্বিক মন্দা বা অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলানোর জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
সরকারের লক্ষ্য কেবল ঋণ বা সাহায্য নেওয়া নয়, বরং আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তা যেন সরাসরি দেশের উৎপাদনশীল বিনিয়োগ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত হয় তা নিশ্চিত করা।
৪. উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আনার তাগিদ
উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা বাংলাদেশে একটি বড় সমস্যা। বৈঠকে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে চালিত প্রকল্পগুলোর গতি বাড়ানো নিয়েও চুলচেরা বিশ্লেষণ হয়।
-
বাস্তবায়ন সময়সীমা হ্রাস: বর্তমানে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে একটি প্রকল্প শেষ হতে গড়ে প্রায় ৭ বছর সময় লাগে। সরকার এই সময়সীমা কমিয়ে ৫ বছরে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
-
অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুতকরণ: বাংলাদেশে ইতিপূর্বে প্রকল্প অনুমোদনেই প্রায় ১৮ মাস সময় ব্যয় হতো, যা সম্প্রতি কমিয়ে ৮ মাসে আনা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী এটিকে আরও কমিয়ে সর্বোচ্চ ৬ মাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ করার জোর দাবি জানান।
-
যৌথ সমন্বয়: প্রকল্প দ্রুত শেষ করতে কেবল বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত করলেই চলবে না, বরং বিশ্বব্যাংকের নিজস্ব জটিল অনুমোদন কাঠামোর মধ্যেও গতি আনতে হবে। এ লক্ষ্যে ঢাকাতেই উভয় পক্ষের সমন্বয়ে যৌথ কর্মপর্যায় (Joint Working Group) গঠিত হবে।
৫. ব্যাংক খাত, পুঁজিবাজার ও রাজস্ব সংস্কার
বৈঠকের আলোচনায় অন্যতম প্রধান গুরুত্ব পেয়েছে ব্যাংক খাত ও আর্থিক নীতি সংস্কার। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ টানতে ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে আর্থিক খাতে সংস্কার জরুরি বলে সরকার মনে করে।
-
ব্যাংক খাতের পুনরুদ্ধার: বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মূলধন পুনর্গঠন, লাগামহীন খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ তুলে ধরা হয়। এ সংস্কার প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থা (আইএফসি)-র সক্রিয় অংশগ্রহণের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
-
আমানতকারীদের আস্থা: প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আমানত প্রত্যাহারের মতো কোনো আতঙ্কজনক চাপ ব্যাংকগুলোতে নেই, তবে অনিয়ন্ত্রিত খেলাপি ঋণ এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সমস্যা সমাধানে দুর্বল ব্যাংক একীভূতকরণের (Merge) পরিকল্পনাও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
-
পুঁজিবাজার ও রাজস্ব বোর্ড পৃথকীকরণ: পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও পেশাদার সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাজকে দুটি ভাগে ভাগ করার প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে—নীতি প্রণয়ন করবে আলাদা বিভাগ এবং রাজস্ব আদায় করবে পৃথক প্রশাসনিক বিভাগ। পুরো করব্যবস্থাকে স্বয়ংক্রিয় (Automated) করা হবে।
-
বিনিয়োগের গ্যারান্টি: রাষ্ট্রায়ত্ত অলাভজনক প্রতিষ্ঠান বেসরকারীকরণ এবং জ্বালানি বহির্ভূত খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণে বহুপক্ষীয় বিনিয়োগ নিশ্চয়তা সংস্থার (এমআইজিএ বা MIGA) কাছ থেকে ক্রেডিট গ্যারান্টি পাওয়ার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সার্বিকভাবে, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনার এ অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করে অর্থমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, নীতিগত সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুতই ঘুরে দাঁড়াবে। আগামী কয়েক মাসের আলোচনা ও ঢাকা সফরের মাধ্যমে নতুন অংশীদারিত্বের রূপরেখা ও অর্থায়নের পরিমাণ চূড়ান্ত করা হবে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



