ছবি: সংগৃহীত
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থকদের বিরুদ্ধে সংশোধিত সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রয়োগ করে ব্যাপক গ্রেপ্তারের পথ খোলায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংগঠনটি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে অভিযুক্ত করেছে যে অন্তর্বর্তী সরকার শান্তিপূর্ণ বাকস্বাধীনতা এবং সমবেত হওয়ার অধিকারকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গ্রেপ্তারে সন্ত্রাসবিরোধী আইনকে অপব্যবহার করছে।
এইচআরডব্লিউর এশিয়া উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি-এর উদ্ধৃত বক্তব্য সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তুলে ধরা হয়েছে—রাজনীতিতে বিরোধী মতকে কোর্টরুমে গুঁতোড়ে মোড়ানো কিংবা শান্তিপূর্ণ মতপ্রকাশ বন্ধ করা কখনই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেছেন, সরকারকে উচিত বিএনপির সময়ের মতো কেবল বিরোধীতা দমন না করে, বরং নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা ও মানবাধিকার রক্ষায় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। সংগঠনটি জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরকে বাংলাদেশে হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং অনির্বাচিত গ্রেপ্তারের ঘটনাগুলোতে জরুরি হস্তক্ষেপ করার আহ্বান জানিয়েছে।
প্রেক্ষাপট ও ঘটনার সারমর্ম
গত এক বছরে বাংলাদেশে রাজনৈতিক উত্তেজনা নিরসনে ব্যাপক তৎপরতা শুরু হয়েছে। টানা তিন সপ্তাহব্যাপী বিক্ষোভ-নির্ঘণ্ট ও সংঘর্ষের পর—যেখানে প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রায় এক হাজার চারশ' মানুষ নিহত হয়েছে—২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। ক্ষমতায় থাকার এক পর্যায়ে অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ১২ মে সংশোধিত সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ওই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে দলটির সমর্থনে যেকোনো সভা, প্রকাশনা ও অনলাইন বক্তব্য। তারপর থেকেই বিরোধী নেতাকর্মী ও শান্তিপূর্ণ অধিকারকর্মীদের গ্রেপ্তারে আইনটি ব্যবহার করা হচ্ছেঃ এমনই দাবি করেছে এইচআরডব্লিউ।
সংগঠনের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে নানান পরিস্থিতি: হঠাৎ করে বিতর্কিত সভা বা আলোচনাসভার উপস্থিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সশস্ত্রতারভাবে আন্দোলনকে প্ররোচিত করার অভিযোগ আনা, পুলিশি হেফাজতে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের উপর শারীরিক অত্যাচার ও চিকিৎসা থেকে বঞ্চারার অভিযোগ, এবং আদালতে আসাকালীন সময় গ্রেপ্তৃতদের প্রতি অপদস্থকর আচরণ। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২৮ আগস্ট ‘মঞ্চ ৭১’ আয়োজিত একটি আলোচনাসভা থেকে সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদসহ মোট ১৬ জনকে আটক করা হয়; বন্ধ করে দেওয়া হয় ওই সভার প্রতিরক্ষা চেষ্টাকে। ওই সভার জায়গা ছিল ডিআরইউ’র কার্যালয়—একটি নিরাপদ, প্রকাশ্য স্থান—তবে সেখানে উপস্থিত ব্যক্তিদের অনুগত হওয়ার অভিযোগকে ভিত্তি দেখিয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। সভার অনেকে বয়সে প্রবীণ—ক’জনের বয়স ছিল ৭০–৮০ বছর—তাঁদেরও বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ নেয়া হয়।
আইনি প্রক্রিয়া ও মানবাধিকার সংস্থার পর্যবেক্ষণ
এইচআরডব্লিউ জানিয়েছে, অনেক ঘটনাতেই গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কেবল সন্দেহের ভিত্তিতেই হত্যার মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। বহুজনকে সন্ত্রাসবিরোধী ধারায় আটক রাখা হয়েছে এবং তাদের অনিয়মিতভাবে পুলিশি হেফাজতে সংরক্ষণে রাখার সময় বিভিন্ন ধরনের দুর্ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে—যেমন চিকিৎসাসেবা না দেওয়া, মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন ইত্যাদি। এর ফলে এক ধরনের আইনি সুরক্ষা সংকট তৈরী হয়েছে, যেখানে অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত উভয় পক্ষের জন্যই ন্যায়বিচার নিশ্চিত হচ্ছে না।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, ৪ সেপ্টেম্বরে জামিন শুনানিতে সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্নাকে হেলমেট, হাতকড়া ও বুলেটপ্রুফ ভেস্ট পরিয়ে আদালতে উপস্থিত করা হয়; সেই সময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা অন্য এক সাংবাদিকের উপর হামলা চালিয়েছেন বলে অভিযোগ তোলে পর্যবেক্ষকরা। এসব ঘটনায় পরিবারগুলো বলছে—“যারা আমাদের ওপর হামলা করেছে, তারা মুক্ত; কিন্তু যাদের আমাদের রক্ষা করার জন্য কল করা হয়েছিল, তাদেরকে আটক করা হয়েছে।” এমন অভিজ্ঞতা অনেকের কাছে একরকম ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি মনে হচ্ছে।
আইনগত ইতিহাস ও সংশোধনীর প্রসঙ্গ
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ উল্লেখ করেছে, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল। কর্তৃপক্ষ বলেছে, ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় এই আইনের অপব্যবহার রোধ করতে ২০২৫ সালে সংশোধনী আনার প্রয়োজনীয়তা ছিল। তবে সংশোধনী কার্যকর হওয়ার পর থেকে বিদ্যমান উদ্বেগ হলো—আইনটি যা উদ্দেশ্য নিয়ে করা হয়েছিল, তা রাজনৈতিক বিরোধীতা দমন করতে সহায়ক মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার হতে পারে। সম্পাদক পরিষদ সহ কিছু সংগঠনের মন্তব্য—এই সংশোধনগুলো মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করবে—এই ভয়কে উস্কে দিচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের মুখপাত্র ড. মুহাম্মদ ইউনূস এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
স্থানীয় মানবাধিকার সংগঠনগুলো ও অন্যান্য তথ্যসূত্র বলছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত উচ্ছৃঙ্খল জনতার (মব) হামলায় অন্তত ১৫২ জন নিহত হয়েছেন। এই তসমাহীনতা দেখিয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের মতো প্রতিষ্ঠানও সতর্ক করছে যে, আইন প্রয়োগের কৌশল ও অনভিপ্রেত পরিণতি সমাধান করা জরুরি নয়ত পরিস্থিতি আরও অবনতি হবে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব
এইচআরডব্লিউর বক্তব্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক বিরোধীতা দমন করা বা বিরোধী নেতৃত্বকে বিচারের নামে গ্রেপ্তার করা একপর্যায়কালে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। রাজনৈতিক কর্মীরা বলছেন—“অবশ্যই দোষীদের শাস্তি হওয়া উচিত, কিন্তু তা নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হওয়া চাই।” তারাই যোগ করেন যে, বর্তমানে অবস্থাটা এমন—কিন্তু দু’টি সম্ভাব্য বিকল্প ছাড়া অন্য কোন পথ নেই: বা গভীর রাজনৈতিকভাবে বন্দি থাকা, নয়তো উচ্ছৃঙ্খল জনতার আক্রমণের ঝুঁকি। আর এই ‘দুই চরম’র মাঝামাঝি কোনো নিরপেক্ষ, ন্যায়সঙ্গত উপায় তারা দেখছেন না।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও সুপারিশ
এইচআরডব্লিউ ছাড়াও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে নিকট থেকে পর্যবেক্ষণ করছে এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরকে প্রাসঙ্গিক পরিস্থিতি মাঠ পর্যায়ে দেখে সতর্ক ও ন্যায়সংগত পর্যবেক্ষণ চালানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বিশেষতঃ নিম্নলিখিত সুপারিশগুলো তুলে ধরছে—
-
সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপব্যবহার বন্ধ করা;
-
নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও স্থির বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করা;
-
পুলিশি হেফাজতে আটক ব্যক্তিদের মানবিক ও চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করা;
-
সরকারকে নিরাপদ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টিতে মনোযোগী করা; এবং
-
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও মানবাধিকার সংস্থাদের ওপর সহযোগিতা বাড়ানো।
বাংলাদেশে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের প্রয়োগ ও সংশোধনীর ফলে রাজনৈতিক মঞ্চে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে—যেখানে আইনি শক্তি ও মানবাধিকার রক্ষার প্রয়োজনের মধ্যে স্থিতি বজায় রাখা এখন একটি জটিল চ্যালেঞ্জ। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তীব্র সতর্কবার্তা ও স্থানীয় অসন্তোষ স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, আইন প্রয়োগকারী ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি জনবিশ্বাস ফেরানোর লক্ষ্যে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষ নীতি ও সংবিবেচনার অভাব পূরণ করা জরুরি। না হলে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও қоғамে বিভাজন দীর্ঘমেয়াদে গভীর ক্ষতি ডেকে আনবে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



