ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এখন একটাই আলোচনায় মুখর—আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেমন হবে? স্বচ্ছতা ও সুষ্ঠুতা নিয়ে যখন নানা প্রশ্ন, সমালোচনা ও আশঙ্কা ঘুরপাক খাচ্ছে, তখন একেবারে স্পষ্ট বার্তা দিলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন। তিনি বলেছেন, যারা মনে করছেন এবারও কেন্দ্র দখল বা ভোটের বাক্স দখল করে জয়ের চেষ্টা করবেন, তাদের সেই আশা পূরণ হবে না। “ভোটকেন্দ্র ও বাক্স দখলের স্বপ্নভঙ্গ হবে”—এই হুঁশিয়ারিই এখন তার মুখে মুখে।
শনিবার (২৩ আগস্ট) বিকেলে তিনি রাজশাহী আঞ্চলিক লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এই বক্তব্য দেন। সিইসির মতে, অতীতে যা হয়েছে, তা ইতিহাস; এবার হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন। নির্বাচন কমিশন এবার এতটাই কঠোর থাকবে যে, কোনো অনিয়মকারীর বিন্দুমাত্র সুযোগ থাকবে না।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, “আমি একটা দুঃসংবাদ দিতে চাই। যারা কেন্দ্র দখল করার চিন্তা করছেন, বাক্স দখলের পরিকল্পনা করছেন, তাদের স্বপ্ন ভেঙে যাবে। আপনারা অতীত ভুলে যান। ভোটকেন্দ্র দখল কিংবা বাক্স ছিনতাইয়ের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিন। যদি এখনও মনে করেন ওই পথে জিতবেন, তবে দাঁতভাঙা জবাব দিতে প্রস্তুত থাকুন।”
তিনি আরও বলেন, “এবার কেউ ঘুঘু দেখবেন না, এবার তারা ফাঁদ দেখবেন। আমাদের হুকুম হবে একদম রুল অনুযায়ী। নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে আমাদের কর্মকর্তাদের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকবে। অন্যায় কোনো হুকুম আমরা দেব না, আর কারও অন্যায় আবদারও শুনব না।”
সিইসি নাসির উদ্দিন স্পষ্ট ভাষায় জানান, ভোটকেন্দ্রে কোনো ধরনের অস্ত্রবাজি বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বরদাশত করা হবে না। তিনি বলেন, “যারা অস্ত্র নিয়ে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাদের জন্য খুবই দুঃসংবাদ আছে। অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চলবে, আর কেউ অস্ত্রবাজি করে জিততে চাইলে কঠোরতম ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
আসন্ন নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনার প্রসঙ্গ উঠলে তিনি বলেন, “অনেকে আনুপাতিক পদ্ধতি বা পিআর পদ্ধতির কথা বলছেন। কিন্তু সংবিধানে এ ধরনের কোনো ধারা নেই। আমরা সংবিধানের বাইরে যেতে পারি না। যদি আইন পরিবর্তন হয়, তখন দেখা যাবে। তবে এটা রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়, নির্বাচন কমিশনের বিষয় নয়।”
বিগত নির্বাচনগুলোতে যেসব কর্মকর্তা জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাদের নিয়ে প্রশ্ন তুললে সিইসি বলেন, “আমার অধীনে ৫ হাজার ৭০০ কর্মকর্তা আছেন। সবাইকে এক জায়গায় সরিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে যারা স্বপ্রণোদিত হয়ে ভোট কারচুপিতে জড়িয়েছিলেন, তাদের এবার দায়িত্বে রাখা হবে না।”
নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে সিইসি বলেন, “আপনারা যতটা ভাবছেন, আমরা তার চেয়েও বেশি সজাগ। আমাদের কর্মকর্তারা জানেন এবার কমিশন কোনো পক্ষপাত করছে না। আমরা আইন অনুযায়ী কাজ করতে চাই। অতীতে কমিশন অনেক সময় সরকারের চাপে পড়ে পক্ষপাত করেছে, কিন্তু এবার সে পরিস্থিতি নেই।”
সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে সিইসি খোলামেলা বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, “এখন পর্যন্ত সরকার আমাদের কোনো নির্দেশ দেয়নি। যেদিন দেবে, সেদিন আমি এই চেয়ারে থাকব না। সরকার যদি চায় কমিশন তার হুকুমমতো কাজ করুক, সেদিন নাসির উদ্দিনকে আর এই পদে দেখবেন না। এই গ্যারান্টি আমি দিচ্ছি।”
ভোটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনা মোতায়েন নিয়েও সিইসি দৃঢ় অবস্থান নেন। তিনি বলেন, “আমরা এবার সেনাবাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞার মধ্যে আনছি। আগের মতো শুধু নামমাত্র স্ট্রাইকিং ফোর্স নয়, এবার সত্যিকার অর্থেই সেনাবাহিনী মাঠে নামবে। সেনা, নৌ, বিমানবাহিনী, কোস্টগার্ড—সব বাহিনীই নির্বাচন নিরাপত্তায় যুক্ত থাকবে।”
নির্বাচনকালীন বিশৃঙ্খলা হলে কী হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি স্পষ্ট করে বলেন, “একটা কেন্দ্রে অনিয়ম হলে কেবল সেই কেন্দ্র নয়, পুরো আসনের ভোট বাতিল করা হবে। এটা নিয়ে আমরা বিধান করছি। যদি দেখি বিশৃঙ্খলা হয়েছে, পুরো আসনের নির্বাচন ক্যানসেল করে দেব।”
ভোটের আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে অনেকের আশঙ্কা থাকলেও সিইসি আশাবাদী। তিনি বলেন, “আইনশৃঙ্খলা কোনো সমস্যা হবে না। সরকারও এ বিষয়ে সজাগ আছে। আমরা একসঙ্গে কাজ করছি।”
সব দল নির্বাচনে আসবে কি না, এ নিয়েও সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন। উত্তরে তিনি বলেন, “সময় বলে দেবে কে আসবে আর কে আসবে না। আমি বিশ্বাস করি, রাজনৈতিক দলগুলো দেশের স্বার্থেই এক জায়গায় আসবে। তবে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আপাতত স্থগিত আছে আদালতের বিচারাধীন মামলার কারণে। রায় না হওয়া পর্যন্ত তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থগিত থাকবে।”
সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার পর সিইসি রাজশাহী অঞ্চলের নির্বাচন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এ বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন। এখানে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রস্তুতি, নিরাপত্তা এবং নিরপেক্ষতা নিশ্চিতে নানা বিষয় আলোচনা হয়।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



