ছবি: সংগৃহীত
‘ওরা ভাবছে ওদের মা কোথাও আটকা পড়ে আছে এবং ঠিকই ফিরে আসবে...এখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই যে খোঁজ নেব। আমি ওদের বলে বোঝানোর চেষ্টা করছি, দুঃসংবাদ শোনার জন্য তৈরি থেকো।’
কথাগুলো ৫০ বছর বয়সী বিক্রম কোলাগাটলার। তিনি হন্যে হয়ে হদিস করছেন স্ত্রী গীতা রেড্ডির (৪৩)। নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে তিনি নিখোঁজ। বেঁচে আছেন কি না, এখনো নিশ্চিত নন বিক্রম।
তিনি থাকেন লন্ডনে। বিক্রম জানান, স্ত্রী গীতা গত শনিবার এক তীর্থযাত্রায় যান। ৪ সেপ্টেম্বর তাঁর ফেরার কথা ছিল। কিন্তু এর আগেই ঘটে গেল বিপর্যয়।
এখন ১২ ও ১৪ বছরের
দুই মেয়ে নিয়ে তিনি গীতার ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন। স্থানীয় ব্রিটিশ কনসুলেটে যোগাযোগ করে লাভ হয়নি। তারাও নেপালি কর্তৃপক্ষের তথ্যের আশায় রয়েছে।
ভয়াবহ ভূমিধস ও বন্যার ঘটনায় নেপালে এখন এমন অপেক্ষারত স্বজনের অভাব নেই। তারা প্রবল উৎকণ্ঠা নিয়ে অশ্রুসজল চোখে তাকিয়ে আছে প্রিয়জনদের ফিরে আসার অপেক্ষায়।
গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত ৫৪৭ জনের মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে নেপালের পুলিশ। আহত প্রায় দেড় হাজার। নেপাল ও চীনের তিব্বত মিলিয়ে এখনো প্রায় আড়াই হাজার মানুষ নিখোঁজ। এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ৯০ হাজারের বেশি। জাতিসংঘের জরুরি শিশু তহবিল ইউনিসেফ জানিয়েছে, বন্যায় ১৭ হাজারের বেশি শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের জরুরি মানবিক সহায়তা প্রয়োজন।
মরদেহ শনাক্ত ও ব্যবস্থাপনা চ্যালেঞ্জিং : বুধবারের আকস্মিক বন্যায় স্রোতের তোড়ে অনেক মরদেহ ভেসে দূরের জেলাগুলোতে চলে গেছে। ফলে নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করা এবং মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কাঠমাণ্ডু থেকে প্রায় ১৮৬ কিলোমিটার দক্ষিণে চিতওয়ানে ২২১টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া কাঠমাণ্ডু থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দক্ষিণে নওয়ালপরাসি পূর্ব এলাকা থেকে ১৩৪টি মরদেহ পাওয়া গেছে।
চিতওয়ানের প্রধান জেলা কর্মকর্তা গণেশ আরিয়াল বিবিসিকে বলেন, অনেক মরদেহের অবস্থা ভালো নেই। ফলে সেগুলো সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় হাসপাতালের মর্গেও আর মরদেহ রাখার জায়গা নেই। এ কারণে মরদেহ রাখার জন্য আপাতত একটি সরকারি ভবন নির্ধারণ করেছে কর্তৃপক্ষ। এখন পর্যন্ত ৫৪৭ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে দেশটির পুলিশ।
৯৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত : নেপালে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির প্রতিনিধিদলের প্রধান ডেভিড ফিশার গতকাল এক প্রেস ব্রিফিংয়ে দ্বিতীয় দফা বন্যার বিষয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘দ্বিতীয় দফা বন্যার আশঙ্কায় আমরা খুবই উদ্বিগ্ন।’ তিনি বলেন, বুধবারের এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ৯৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে। তাঁরা এ দুর্যোগ মোকাবেলায় তিন কোটি ১০ ডলার অর্থায়নের জন্য আবেদন করেছেন।
নেপালের তথ্যমন্ত্রী বিক্রম তিমিলসিনা বিবিসিকে জানান, ভয়াবহ বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাসুয়া জেলা। এটি যোগাযোগের ক্ষেত্রে কাঠামোগতভাবে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন।
রাজধানী কাঠমাণ্ডুর উত্তরের এই জেলার পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সেখানে যেতে পারিনি, তাই সেখানকার ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নিরূপণ করতে সময় লাগবে।’ তিনি বলেন, ‘শুধু হেলিকপ্টারের মাধ্যমে সেখান থেকে লোকজনকে উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে।’
উদ্ধার ও ত্রাণ সহায়তা : নেপাল ও চীনে উদ্ধারকাজ ও ত্রাণ তৎপরতা গতকাল সাময়িক বিরতির পর আবার নবোদ্যমে শুরু হয়। প্রাকৃতিকভাবে তৈরি লেক থেকে পানি উপচাতে শুরু করলে দুর্যোগকবলিত এলাকায় আতঙ্ক দেখা দেয়। এতে সাময়িকভাবে কাজ বন্ধ রাখা হয়।
নেপাল কর্তৃপক্ষ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ত্রিশূলীর লেহেন্দেখোলা নদীতে লেক সৃষ্টি হয়ে এতে প্রায় ২৫ লাখ ঘনমিটার পানি জমে তা উপচাতে থাকে। এতে আশপাশে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। উদ্ধারকাজ ঘণ্টা তিনেক বন্ধ থাকে। প্রবল বেগে ঢল নামার আশঙ্কায় হিমালয়ের চীনা অংশে উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া কর্মীরা যানবাহন নিয়ে নিরাপদ জায়গায় চলে যান। পরে এই ঢল নামার আশঙ্কা কমে এলে আতঙ্কও কমে আসে এবং উদ্ধারকাজ শুরু হয়।
নেপালের হেলিকপ্টারগুলো লাগাতার উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। দুর্গত এলাকায় আটকে পড়া লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনার হচ্ছে এসব হেলিকপ্টারের মাধ্যমে। উদ্ধারকারী দলের কর্মকর্তাদের কাছে আটকে পড়া লোকজনের খোঁজ নিতে লাইন ধরেছে স্বজনরা।
বিবিসি জানিয়েছে, ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে হেলিকপ্টর নিয়ে উদ্ধারকাজে যাওয়া সেনা সদস্যরা ত্রাণ তৎপরতা চালাচ্ছেন। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত রাসুয়া জেলায় একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে টানেলে আটকে পড়া একদল কর্মীকে টেনে বের করছিলেন সেনা সদস্যরা।
নেপালের ট্যুরিজম বোর্ড জানিয়েছে, বন্যা ও ভূমিধসের পর অন্তত ১২১ জন বিদেশি নাগরিককে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। বোর্ডের বিবৃতিতে বলা হয়, উদ্ধার করা ব্যক্তিদের মধ্যে ৮৫ জন ভারতীয় নাগরিক, ১৬ জন চীনা ও ৯ জন দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিক। অন্য তিনজনের নাগরিকত্বের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এর আগে কর্তৃপক্ষ জানায়, আরো পাঁচ শতাধিক পর্যটক এখনো নিখোঁজ। নেপালের ট্যুরিস্ট বোর্ড বলেছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার দুর্গত মানুষ, আটকে পড়া লোকজন এবং আহতদের উদ্ধার ও নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরে প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রচেষ্টা চলছে।
নেপালের মন্ত্রীরা তাঁদের এক মাসের বেতনের অর্থ দুর্যোগকবলিত ব্যক্তিদের জন্য গঠিত প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দেবেন। গতকাল সে দেশের মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
৫৭৫ পর্যটক এখনো নিখোঁজ : নেপালে গতকাল পর্যন্ত ৫৭৫ জন পর্যটক নিখোঁজ থাকার তথ্য জানা গেছে। এর মধ্যে ১৪৯ জন নেপালি। নেপাল পুলিশের তথ্যের বরাতে বিবিসির খবরে এ কথা জানানো হয়।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে গতকাল জানানো হয়েছে, আকস্মিক বন্যায় বিধ্বস্ত নেপালে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না বা নিখোঁজ—এমন ভারতীয় নাগরিকের সংখ্যা ৩২০। তবে নেপাল পুলিশ ১৮৩ জন ভারতীয় নাগরিক নিখোঁজ থাকার কথা জানিয়েছে। তারা জানায়, নেপালে ৩৬টি দেশের নাগরিক নিখোঁজ রয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ৬৫ জন, ইউক্রেনের ৬২ জন ও যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন রয়েছে।
গতকাল ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়ের সময় মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেন, ‘নেপালে যে ২১ জন ভারতীয় পর্যটককে উদ্ধার করা হয়েছিল, তাদের ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তারা দিল্লিতে অবতরণ করেছে। তারা তামিলনাড়ুর বাসিন্দা।’
হিমবাহ গলে বাড়ছে বিপদ : জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে হিমালয় পর্বতমালার বরফ গলে বাড়ছে পানির উচ্চতা। বাড়ছে বিপদ। গত চার দশকে হিমালয় পর্বতমালার এক-চতুর্থাংশ বরফ গলেছে বলে বৈজ্ঞানিক সূত্রের বরাতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।
বিবিসি ভেরিফাই এমন দুটি ভিডিওর সত্যতা নিশ্চিত করেছে, যার মধ্যে নেপালে ভয়াবহ বন্যার নেপথ্য কারণ দুটি হিমবাহ ধসে পড়ার দৃশ্য রয়েছে। ড্রোনের মাধ্যমে ধারণ করা এসব ভিডিও চীনের সামাজিক যোগাযোগ প্ল্যাটফর্ম চাওহংশুতে পোস্ট করা হয়। ল্যাংতাং লিরাং চূড়ার কাছে এই ভূমিধস ঘটে, যা সমুদ্রপৃষ্ঠের সাত হাজার ২০০ মিটার উঁচুতে। এ সময় তুষারাবৃত পর্বতমালার ওপর ধুলার কুণ্ডলী দেখা যায়।
বিবিসি জানায়, এ অঞ্চলে এ ধরনের হিমবাহ থেকে যে ব্যারিয়ার লেক বা প্রতিবন্ধকতাপূর্ণ হ্রদ তৈরি হয়েছে, যেখানে পাথর ও কাদার সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে বাঁধ, এই সংকট নিরসনের একটি সম্ভাবনা হচ্ছে পানি ধীরগতিতে উপচে বিপদ কেটে যাওয়া। অন্যদিকে আকস্মিকভাবে এই বাঁধ ভেঙে বিপুল ঢল তৈরিরও আশঙ্কা রয়েছে, যার ক্ষয়ক্ষতি ব্যাপক।
সূত্র : বিবিসি, রয়টার্স
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



