ছবি: সংগৃহীত
সকালে ঘুম থেকে উঠেই যদি শরীর ভারি লাগে, চোখ ঘুমে জড়িয়ে থাকে কিংবা মনে হয় যেন সারারাত ঘুমই হয়নি—তাহলে বিষয়টি হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। অনেকেই প্রতিদিন এমন অভিজ্ঞতার কথা জানান। কারও ক্ষেত্রে মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা কিংবা দুর্বলতাও যোগ হয়। দিনের শুরুতেই এ ধরনের শারীরিক অস্বস্তি পুরো দিনের কর্মক্ষমতা ও মনোযোগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যা ধীরে ধীরে ব্যক্তি ও কর্মজীবন—দুটোকেই প্রভাবিত করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সকালে ঘুম ভাঙার পর অতিরিক্ত ক্লান্তি অনুভূত হলে শরীরের শক্তির মাত্রা কমে যেতে পারে। এর ফলে কাজে আগ্রহ কমে যায়, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দুর্বল হয় এবং সারাদিনই যেন এক ধরনের অবসাদ কাজ করে।
এ বিষয়ে ভারতীয় একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ডা. পাল মনিক্কম জানান, সকালে ঘুম থেকে উঠেই ক্লান্ত লাগার পেছনে বেশিরভাগ সময় দায়ী থাকে অনিয়মিত ঘুমের রুটিন, ভুল সময়ে খাবার গ্রহণ এবং রাতে অতিরিক্ত আলো বা শব্দযুক্ত পরিবেশে থাকা। তার মতে, এসব অভ্যাস শরীরের স্বাভাবিক ঘুমচক্র ব্যাহত করে।
ডা. পাল মনিক্কম বলেন, দৈনন্দিন জীবনের কয়েকটি ছোট অভ্যাসে পরিবর্তন আনলেই ঘুমের গুণগতমান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করা সম্ভব। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো একটি নির্দিষ্ট স্লিপ সাইকেল মেনে চলা—অর্থাৎ প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠা। এতে শরীরের সার্কাডিয়ান রিদম স্থিতিশীল থাকে এবং সকালে ঘুম ভাঙার পর স্বাভাবিক সতেজতা ফিরে আসে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে মোবাইল ফোন, টিভি বা যেকোনো স্ক্রিন ব্যবহার বন্ধ রাখা উচিত। কারণ স্ক্রিন থেকে নির্গত নীল আলো মেলাটোনিন হরমোনের নিঃসরণ কমিয়ে দেয়, ফলে ঘুম গভীর হয় না। ঘুমের আগে ২০ থেকে ৩০ মিনিট হালকা আলোয় বই পড়া, উষ্ণ পানিতে গোসল করা কিংবা শান্ত কোনো রুটিন অনুসরণ করলে শরীর ঘুমের জন্য মানসিক ও শারীরিকভাবে প্রস্তুত হয়।
ভালো ও গভীর ঘুমের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো আলো নিয়ন্ত্রণ। অতিরিক্ত আলো শরীরকে ভুল বার্তা দেয় যে, এখনো দিনের সময় শেষ হয়নি। তাই ঘর যতটা সম্ভব অন্ধকার রাখা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ব্ল্যাকআউট কারটেইনস কার্যকর ভূমিকা রাখে। এসব পর্দা বাইরের গাড়ির আলো, স্ট্রিটলাইট কিংবা ভোরের সূর্যের আলো ঘরের ভেতরে ঢুকতে বাধা দেয়। অন্ধকার পরিবেশে মেলাটোনিন নিঃসরণ বাড়ে, ফলে ঘুম দীর্ঘ ও গভীর হয় এবং সকালে ক্লান্তি অনুভূত হয় না।
ঘুমের মান নষ্ট হওয়ার আরেকটি বড় কারণ হলো ঘরের তাপমাত্রা সঠিক না থাকা। ঘুমের সময় শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা কমে আসে। তাই ঘর তুলনামূলক ঠান্ডা হলে দ্রুত ঘুম আসে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুমের জন্য আদর্শ তাপমাত্রা ১৮ থেকে ১৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অতিরিক্ত গরম পরিবেশ ঘুমের ছন্দ ভেঙে দেয় এবং মাঝরাতে বারবার জেগে ওঠার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যার ফল হিসেবে সকালে ক্লান্তি দেখা দেয়।
এ ছাড়া রাতের খাবারের সময়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দেরিতে ভারি খাবার খেয়ে শুয়ে পড়লে হজমের সমস্যা, অ্যাসিডিটি, অম্বল কিংবা গ্যাসের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এতে ঘুম ব্যাহত হয় কিংবা গভীর হয় না। তাই রাতে তুলনামূলক আগে খাবার খাওয়া হলে শরীর হজমের কাজ শেষ করে আরামদায়ক ঘুমে প্রবেশ করতে পারে। ফলে সকালে ঘুম থেকে উঠার পর শরীর হালকা ও সতেজ লাগে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব অভ্যাস নিয়মিত মেনে চললে সকালে ঘুম ভাঙার পর ক্লান্তি দূর হওয়ার পাশাপাশি শরীরের শক্তি ও কর্মক্ষমতাও ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। মানসম্মত ঘুম মনোযোগ, স্মরণশক্তি এবং হরমোনের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে হঠাৎ করে নতুন কোনো রুটিন শুরু করার আগে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যগত অবস্থার কথা বিবেচনা করে নিজ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



