ছবি: সংগৃহীত
প্রত্যাশা আর বাস্তবতার কঠিন সমীকরণে দাঁড়িয়ে আসন্ন ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নে এক অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে সরকার। নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন, কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ড চালু, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণসহ নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত জনবান্ধব অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়নের কাজ ইতোমধ্যে শুরু করেছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। তবে এসব প্রতিশ্রুতি পূরণে প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ অর্থ, আর সেই অর্থ জোগানেই তৈরি হয়েছে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, রাজস্ব আয়ের শ্লথগতি, ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা এবং আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থার কঠোর শর্ত—সব মিলিয়ে সরকার শেষ পর্যন্ত দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঙ্কের ঘাটতি বাজেট উপস্থাপনের পথে হাঁটতে পারে।
অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে এবারের বাজেট হবে গতানুগতিক ধারার বাইরে। তাঁর ভাষায়, এটি হবে জনগণের অংশগ্রহণমূলক, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিতকারী এবং পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতিমুক্ত বাজেট। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, উচ্চ প্রত্যাশার এই বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজস্ব ঘাটতি ও বৈদেশিক চাপ।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬–২৭ অর্থবছরের সম্ভাব্য বাজেটের আকার আট লাখ ৪৮ হাজার কোটি থেকে সাড়ে আট লাখ কোটি টাকার মধ্যে থাকতে পারে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ধরা হতে পারে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা। তুলনায় চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের মূল বাজেট ছিল সাত লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা, যা পরে দুই হাজার কোটি টাকা কমিয়ে সংশোধিত বাজেট সাত লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। ২০২৪–২৫ অর্থবছরের বাজেট ছিল সাত লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আগের বছরের তুলনায় বাজেটের আকার কমানোর নজির তৈরি হয়েছিল চলতি অর্থবছরে।
চলতি অর্থবছরে ঘাটতি ধরা হয়েছে দুই লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩.৬ শতাংশ। কিন্তু আগামী অর্থবছরে সেই ঘাটতির পরিমাণ দুই লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে ঘাটতির হার জিডিপির ৪ থেকে ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে—যা সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য বড় চাপের কারণ হবে।
রাজস্ব আয়ের দুর্বলতাই এখন বাজেটের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)–এর হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই–জানুয়ারি) রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬০ হাজার ১১৩ কোটি টাকা। এ সময় আদায়ের লক্ষ্য ছিল দুই লাখ ৮৩ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা। আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক—তিন প্রধান খাতেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। ফলে রাজস্বের মূল ভিত দুর্বল হয়ে পড়েছে, যা বড় বাজেট বাস্তবায়নে ঝুঁকি তৈরি করছে।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে আগামী ১০ মার্চ থেকে পরীক্ষামূলকভাবে ফ্যামিলি কার্ড চালুর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। প্রাথমিক পর্যায়ে কার্ডধারীরা মাসে দুই হাজার ৫০০ টাকা করে সহায়তা পাবেন। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আপাতত থোক বরাদ্দ থেকে অর্থ জোগান দেওয়া হলেও পরবর্তী বাজেটে এ খাতে নিয়মিত বরাদ্দ রাখা হবে। পাশাপাশি নতুন পে স্কেল কার্যকরের লক্ষ্যে চলতি সংশোধিত বাজেটে বেতন-ভাতা খাতে বরাদ্দ প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে এক লাখ ছয় হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা করা হয়েছে। এসব ব্যয় ভবিষ্যৎ বাজেটে স্থায়ী চাপ হিসেবে যুক্ত হবে।
সামষ্টিক অর্থনীতির এই পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ–এর অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান। তাঁর মতে, রাজস্ব আয় না বাড়লে ঘাটতি মেটাতে সরকারকে হয় বিদেশি ঋণ বাড়াতে হবে, নয়তো অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নিতে হবে—যা মূল্যস্ফীতি ও সুদের হারে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। তিনি নীতি সুদহার সমন্বয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় সক্রিয়তা, বিনিময় হার বাজারমুখী করা এবং সরকারি ব্যয়ে মিতব্যয়িতার ওপর জোর দেন।
জনগণের প্রত্যাশা পূরণের পথে আরেক বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)–এর শর্ত। ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, ভর্তুকি কমানো, ব্যাংক খাতের সংস্কার এবং বিদ্যুৎ খাতে মূল্য সমন্বয়সহ নানা কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিশেষ করে ভর্তুকি কমানোর চাপ নতুন পে স্কেল বা কৃষক কার্ডের মতো উদ্যোগ বাস্তবায়নে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে ঋণের পরবর্তী কিস্তি স্থগিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নতুন চাপ তৈরি করবে।
এদিকে বেসরকারি খাতেও বিনিয়োগ স্থবির। বাংলাদেশ ব্যাংক–এর তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৬.০৩ শতাংশে—যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। উচ্চ সুদহার, আমদানি সংকোচন ও বিনিয়োগ অনিশ্চয়তা শিল্পখাতের সম্প্রসারণকে বাধাগ্রস্ত করছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নীতিগত অনিশ্চয়তায় নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ কমেছে, সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নেও গতি নেই।
এই প্রেক্ষাপটে প্রাক-বাজেট আলোচনা শুরু করেছে এনবিআর। বিভিন্ন চেম্বার, বণিক সমিতি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রস্তাব আহ্বান করা হয়েছে। অংশগ্রহণমূলক ও ন্যায়সংগত বাজেট প্রণয়নের লক্ষ্যে আগামী ১৫ মার্চের মধ্যে প্রস্তাব জমা দিতে বলা হয়েছে। সরকার চাইছে, অর্থনীতির বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নিয়ে বাস্তবসম্মত বাজেট কাঠামো তৈরি করতে।
অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাম্প্রতিক এক বৈঠকে বলেন, অর্থনীতি বর্তমানে ‘কঠিন ও স্থবির’ অবস্থায় রয়েছে। দারিদ্র্য বৃদ্ধি, বিনিয়োগ হ্রাস ও কর্মসংস্থান সংকোচনের প্রেক্ষাপটে কাঠামোগত সংস্কার ও সুশাসন নিশ্চিত করাই হবে বাজেটের অগ্রাধিকার। তাঁর মতে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল জনগণের কাছে পৌঁছানোই হবে মূল লক্ষ্য।
অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদ মনে করেন, কেবল বাজেটের আকার বাড়ালেই সমাধান আসবে না; প্রয়োজন কঠোর ব্যয়-নিয়মানুবর্তিতা, সুশাসন এবং পরিকল্পিত অর্থায়ন। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি ব্যয় ও ঋণ পরিশোধের চাপ বিবেচনায় না নিয়ে বড় ঘাটতি বাজেট দিলে দীর্ঘমেয়াদে সামষ্টিক অর্থনীতি আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে সরকার এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে জনগণের প্রত্যাশা, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও আন্তর্জাতিক আর্থিক শৃঙ্খলার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সেই ভারসাম্য রক্ষায় সফল না হলে রেকর্ড পরিমাণ ঘাটতির বাজেট সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



