ছবি: সংগৃহীত
ইরান মার্কিন সামরিক সম্পদের আবাসস্থল উপসাগরীয় দেশগুলোকে লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে প্রতিশোধ নিচ্ছে। অন্যদিকে ইসরায়েলি ও মার্কিন বাহিনী ইরানের ওপর তাদের আক্রমণ অব্যাহত রেখেছে, যার মধ্যে রয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারক সংস্থার ওপর হামলা। ইরান জানিয়েছে, সাম্প্রতিক হামলায় দেশটির অন্তত ১৫৩টি শহর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত মোট ৫০৪টি স্থানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা হয়েছে।
রেকর্ডকৃত আক্রমণের সংখ্যা এক হাজার ৩৯-এ পৌঁছেছে। এদিকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী লেবাননের ওপর বিমান হামলাও তীব্র করেছে এবং দেশটির দক্ষিণে নতুন করে স্থল আক্রমণ শুরু করেছে।
ইরানে কাতারের হামলা : এদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে তেহরানের সাম্প্রতিক হামলার জবাবে ইরানে পাল্টা হামলা চালিয়েছে কাতার। গত ২৪ ঘণ্টায় ইরানের বিভিন্ন এলাকা লক্ষ্য করে কাতারের সামরিক বাহিনী এই হামলা চালায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পশ্চিমা সূত্রের বরাত দিয়ে ইসরায়েলের টেলিভিশন চ্যানেল ১২ এক প্রতিবেদনে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। ওই সূত্র জানিয়েছে, কাতারের এই পদক্ষেপের পর সৌদি আরবও শিগগিরই ইরানে হামলা শুরু করতে পারে। ইসরায়েলের রাষ্ট্রায়ত্ত সম্প্রচারমাধ্যম কানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এক জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানান, সোমবার ইরানের হামলার শিকার হওয়ার পর সৌদি আরবও পাল্টা জবাব দেবে বলে ইসরায়েল ধারণা করছে। মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মেজর জেনারেল আব্দুল নাসের আল হুমাইদি বলেন, গত কয়েক দিনে ইরান থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিকে ১৮৬টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৮১২টি ড্রোন নিক্ষেপ করা হয়েছে।
তবে এর বেশির ভাগই লক্ষ্যে আঘাত হানার আগেই আকাশে ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের প্রতিশোধমূলক ‘ট্রু প্রমিজ ৪’ অভিযানের প্রথম দুই দিনে ৬৫০ জনেরও বেশি মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা ও সদস্য নিহত বা আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। আইআরজিসির মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী মোহাম্মদ নায়েইনি বলেছেন, বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর সদর দপ্তর এবং যুদ্ধজাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ ইরানের উপকূলীয় জলসীমা থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে।

হামলায় বিধ্বস্ত তেহরানের ঘরবাড়ি। ছবি : এএফপি
রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসে হামলা : সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে ভয়াবহ ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে।
মঙ্গলবার ভোরে সংঘটিত এ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে খুব শিগগির বড় ধরনের ‘পাল্টা পদক্ষেপ’ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে হামলার খবর নিশ্চিত করেছে। মন্ত্রণালয় বলেছে, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী দুটি ড্রোন দিয়ে এ হামলা চালানো হয়। এর ফলে দূতাবাস ভবনে ‘সামান্য অগ্নিকাণ্ড ও সাধারণ ক্ষয়ক্ষতি’ হয়েছে। তবে কোনো প্রাণহানির খবর এ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। হামলার পরপরই সৌদি আরবে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের মিশন রিয়াদ, জেদ্দা ও দাহরানে অবস্থানরত তাদের সব কর্মীকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে ওই অঞ্চলের যেকোনো সামরিক স্থাপনায় অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত সীমিত করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন স্থাপনাগুলোয় এখন সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি রয়েছে। তবে এ ঘটনা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বিদ্যমান উত্তেজনাকে আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
রয়টার্স বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, সৌদি কর্তৃপক্ষ রাজধানীতে মার্কিন দূতাবাসে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করার কয়েক ঘণ্টা পরেই রিয়াদের কূটনৈতিক এলাকায় আরো দুটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এই হামলার পর সৌদি আরবে মার্কিন মিশনগুলোতে সব কনস্যুলার সেবা বাতিলের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সংঘাতের কারণে পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত কুয়েতে মার্কিন দূতাবাস বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এদিকে এএফপি বাহরাইনের রাজধানী মানামায় বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণের খবর দিয়ে বলেছে, রাজধানীজুড়ে ঘন ঘন সাইরেন বাজছে।
ইরানে প্রেসিডেন্টের অফিসে হামলা : তেহরানে ইরানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ও ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল ভবনে বিমান হামলা চালানোর কথা বলেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে এ কথা বলেছে তারা। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ইসরায়েলি বিমানবাহিনী তেহরানের কেন্দ্রস্থলে ইরানি শাসকগোষ্ঠীর নেতাদের কম্পাউন্ডের স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়ে সেগুলো ধ্বংস করেছে। কম্পাউন্ডে হামলার সময় প্রেসিডেন্টের কার্যালয় এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের ভবনের ওপর বিপুল গোলাবারুদ ফেলা হয়েছে।’ এ ছাড়া ইরানের কেরমান প্রদেশের একটি সামরিক ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ১৩ জন ইরানি সেনা নিহত হয়েছেন।
ওমানে ড্রোন হামলা : ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি-মার্কিন যুদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মঙ্গলবার ওমানের বাণিজ্যিক বন্দর দুকমে ড্রোন হামলা চালানো হয়, যা একটি জ্বালানি ট্যাংকে আঘাত হানে। ওমান নিউজ এজেন্সি একটি নিরাপত্তা সূত্রের বরাত দিয়ে বলেছে, একটি নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, দুকমের বাণিজ্যিক বন্দরে জ্বালানি ট্যাংকগুলোকে বেশ কয়েকটি ড্রোন লক্ষ্য করে আক্রমণ করা হয়েছিল, যার মধ্যে একটি জ্বালানি ট্যাংকে আঘাত করেছে। ফলে কোনো মানবিক হতাহত ছাড়াই ক্ষতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। তিন দিনের মধ্যে দুকমে এটি দ্বিতীয় হামলা। তবে ড্রোন হামলাটি কারা চালিয়েছে তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। এদিকে ওমানের সালালাহ বন্দরের কাছে একটি ড্রোন বিধ্বস্ত হয়েছে। তবে এতে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি বলে জানা গেছে। এ ছাড়া ধোফার গভর্নরেটে আরো দুটি ড্রোন আটকে দেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
লেবাননে ইসরায়েলের ব্যাপক বিমান হামলা : লেবাননের বৈরুতের দক্ষিণে শহরতলিতে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। ইসরায়েলি আর্মি রেডিও জানিয়েছে, ওই এলাকায় হিজবুল্লাহ নেতাদের এক বৈঠক লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, কোনো আগাম সতর্কতা ছাড়াই চালানো এই অভিযানে ভবনগুলোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
১৬৫ ইরানি শিশুর দাফন সম্পন্ন : শনিবার ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মিনাবের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলায় নিহত ১৬৫ জন স্কুলছাত্রী এবং কর্মীর জন্য গতকাল মঙ্গলবার একটি গণ-অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। ইরান এই ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলা বলে বর্ণনা করেছে। মঙ্গলবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে মিনাবের একটি পাবলিক স্কয়ারে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হন। পুরুষরা ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের পতাকা উত্তোলন করেছিলেন এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কালো চাদর পরা মহিলাদের থেকে আলাদা দাঁড়িয়ে ছিলেন। জনতা ‘আমেরিকার মৃত্যু’, ‘ইসরায়েলের মৃত্যু’ এবং ‘আত্মসমর্পণ নয়’ স্লোগানে ফেটে পড়ে।
সূত্র : আলজাজিরা, বিবিসি, এএফপি, আনাদোলু
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



