ছবি: সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে কাতারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন স্থগিত হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশসহ এশিয়ার আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে। ফলে দেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
জ্বালানি বিশ্লেষকরা বলছেন, কাতারে এলএনজি উৎপাদন স্থগিত হওয়া বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
এর প্রভাব থেকে বাংলাদেশ কতটা রক্ষা পাবে, তা নির্ভর করবে সংঘাতের স্থায়িত্ব এবং বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করার সক্ষমতার ওপর। তবে পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে দেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।
ইরানের ড্রোন হামলার পর কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কম্পানি কাতার এনার্জি এলএনজি উৎপাদন ও রপ্তানি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। একই সময় সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কম্পানি সৌদি আরামকো তাদের বৃহত্তম শোধনাগার রাস তানুরা রিফাইনারি সতর্কতামূলকভাবে বন্ধ রেখেছে।
ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি বর্তমানে ঝুঁকির মুখে। এই পথ দিয়েই বিশ্বের বড় অংশের তেল ও এলএনজি পরিবাহিত হয়। হামলা-পাল্টাহামলার ঘটনায় এ পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাত আমদানিনির্ভর। দেশের জ্বালানি তেলের প্রায় শতভাগই আমদানি করা হয়। অপরিশোধিত তেলের পুরোটা আসে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। পরিশোধিত তেল আসে বিভিন্ন দেশ থেকে। অন্যদিকে দেশের মোট গ্যাস চাহিদার প্রায় ৩৫ শতাংশ পূরণ হয় আমদানি করা এলএনজি দিয়ে, যার বেশির ভাগই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা চার হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। গতকাল মঙ্গলবার চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হয় দুই হাজার ৬৬২ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে বিদেশ থেকে আমদানি করা এলএনজি থেকে সরবরাহ করা হয় ৯৫২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। বাকিটা দেশীয় কূপগুলো থেকে উৎপাদন করে সরবরাহ করা হয়। বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে সামনে এলএনজির সরবরাহ এক হাজার ৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আমদানি ব্যাহত হলে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে না। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে লোডশেডিং বাড়তে পারে। পাশাপাশি পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কমে শিল্প, পরিবহন ও আবাসিকে রান্নাবান্নায় ভোগান্তি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিপিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমানে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকেই চাহিদার বড় অংশ উৎপাদন করা হচ্ছে। বাকিটা কয়লা, তেল থেকে উৎপাদন করা হচ্ছে। গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হলে অবশ্যই বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব পরবে।’
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলছেন, চলতি বছর মোট ১১৫টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকে ৪০টি ও ওমান থেকে ১৬টি কার্গো আসার কথা। এ ছাড়া খোলাবাজার (স্পট মার্কেট) থেকে ৫৯টি কার্গো কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি মার্চ মাসে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার ও ওমান থেকে ১১টি কার্গো আসার কথা, যার কয়েকটি ইতিমধ্যে হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে এসেছে। তবে নতুন জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে পরবর্তী সময়ে সরবরাহে প্রভাব পড়তে পারে। এতে প্রতিদিন প্রায় ২০০ থেকে ২২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যেতে পারে। বর্তমানে গড়ে ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করা হলেও তা ৭০০ মিলিয়নে নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে। গ্যাসের ঘাটতি হলে শিল্প খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরবরাহ দেওয়া হবে। আবাসিক ও পরিবহন খাতে সরবরাহ সমন্বয় করা হতে পারে।
পেট্রোবাংলার ঊর্ধ্বতন দুই কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে এলএনজি আমদানির সংকট তৈরি হলে সরকার বিকল্প হিসেবে স্পট মার্কেট (খোলাবাজার) থেকে এলএনজি আমদানির বিষয়ে ভাবছে। তবে স্পট মার্কেটে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে দেশের অর্থনীতিতে ভর্তুকির চাপ এবং আর্থিক চাপ বাড়বে। তবে জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে—এখনো এমন বলা যাবে না। তবে বৈশ্বিক উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় মারাত্মক চাপ বাড়বে।
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বই জ্বালানি সংকটে ‘ফেঁসে যাবে’। তবে চলমান মার্চ মাসে দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির কোনো ঘাটতি হবে না বলে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেছেন তিনি।
ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘মানুষের শঙ্কা দূর করার জন্যই আমরা নিরলস কাজ করছি। আশা করি, আমরা সফল হব। অন্তত চলতি মার্চ মাসে জ্বালানি বা বিদ্যুৎ নিয়ে কোনো চিন্তার কারণ নেই।’
জ্বালানি মন্ত্রী বলেন, ‘যুদ্ধটা দীর্ঘমেয়াদি হলে অবশ্যই আমাদের জন্য সমস্যা হবে। শুধু বাংলাদেশ নয়, যুদ্ধের প্রভাব দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বের সব দেশই সংকটে ফেঁসে যাবে। তবে আমাদের পক্ষ থেকে যতখানি চেষ্টা করা দরকার, তার সবটুকুই আমরা করব।’
বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও এলএনজির দাম বাড়বে, আমদানি ব্যয় বাড়বে এবং সরকারের ভর্তুকির চাপও বাড়তে পারে। শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুৎ খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতি ঘোর বিপজ্জনক হতে পারে। বিভিন্ন দেশ এলএনজি আমদানির জন্য প্রতিযোগিতায় নামলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম আরো বাড়বে। তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মজুদ নেই। তাই দ্রুত বিকল্প উৎস নিশ্চিত করা জরুরি।
জ্বালানি বিভাগের সচিব মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে আপাতত সমস্যা নেই। তবে মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হলে চাপ তৈরি হতে পারে। ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম এরই মধ্যে বেড়ে গেছে। দাম আরো বাড়লে সরকারের ভর্তুকি ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়বে।’
জ্বালানি সচিব বলেন, ‘চীনভিত্তিক ট্রেডারদের সঙ্গে ছয় মাসের চুক্তির আওতায় মার্চ ও এপ্রিলের চালান নিয়ে প্রাথমিক নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে। তবে এলএনজি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বেশি। বাংলাদেশের বড় অংশের এলএনজি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে কাতার থেকে আসে। এ ছাড়া ওমানভিত্তিক ট্রেডিং কম্পানির মাধ্যমে কাতার, অস্ট্রেলিয়া ও আজারবাইজান থেকেও এলএনজি আসে।’
এলপিজির বাজারেও সংকটের আশঙ্কা : এদিকে এলপিজির বাজারেও সংকটের আশঙ্কা রয়েছে। কারণ এই খাত প্রায় পুরোপুরি বেসরকারি আমদানিনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে আমদানিকারকরা সরবরাহ কমাতে পারেন। যদিও সম্প্রতি বিপিসিকেও এলপিজি আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
এলপিজির বিষয়ে জ্বালানি সচিব বলেন, এলপিজি মূলত বেসরকারি খাতে আমদানিনির্ভর। বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে আমদানিকারকরা কম আনতে পারেন—এমন আশঙ্কা রয়েছে। তবে এর মধ্যে প্রায় এক লাখ ৯৮ হাজার টন এলপিজি দেশে এসেছে বলে জানা গেছে।
জ্বালানি তেলের মজুদ এক লাখ ৩৬ হাজার টন : দেশে বর্তমানে জ্বালানি তেল মজুদ ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজানুর রহমান জানিয়েছেন, দেশে বর্তমানে সব মিলিয়ে মোট এক লাখ ৩৬ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেলের মজুদ রয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি নজরে রেখে তেলের বিকল্প বাজার খোঁজার বিষয়ে ভাবা হচ্ছে। তবে বর্তমানে দেশে যে পরিমাণ মজুদ রয়েছে, তাতে দাম বাড়ার শঙ্কা নেই।
তিনি বলেন, নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখতে গত সোমবার পর্যন্ত সাতটি জাহাজের এলসি সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে যে ডিজেল আছে তাতে ১৪ দিন, অকটেন ২৮ দিন, পেট্রল ১৫ দিন, ফার্নেস ৯৩ দিন ও জেড ফুয়েল ৫৫ দিন চলবে।
সংস্থাটি জানিয়েছে, বর্তমানে সমুদ্রপথ এবং খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে আরো প্রায় ২০ দিনের সরবরাহ। সরকার জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ২৮ লাখ ২০ হাজার টন তেল আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে বড় অংশ উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, চীন ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা হবে। ফলে এ ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা নেই বলে জানিয়েছে বিপিসি।
তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে অপরিশোধিত তেল (ক্রুড অয়েল) আমদানিতে সংঘাত দীর্ঘ হলে প্রভাব পড়তে পারে। বিকল্প হিসেবে ফুজাইরাহ টার্মিনাল ব্যবহারের প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।
সূত্র: কালের কণ্ঠ
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



