ছবি: সংগৃহীত
২০২৫-২৬ করবর্ষে অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিলে নতুন রেকর্ড গড়েছেন দেশের করদাতারা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) জানিয়েছে, চলতি করবর্ষে এখন পর্যন্ত ৪০ লাখের বেশি ব্যক্তি করদাতা ই-রিটার্ন দাখিল করেছেন। একই সময়ে প্রায় ৫০ লাখ করদাতা ই-রিটার্ন সিস্টেমে নিবন্ধন সম্পন্ন করেছেন, যা দেশে কর ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল রূপান্তরের একটি বড় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এ বছর একটি বিশেষ আদেশের মাধ্যমে এনবিআর ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী প্রবীণ করদাতা, শারীরিকভাবে অসমর্থ বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি করদাতা, মৃত করদাতার পক্ষে আইনগত প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিক ছাড়া সকল ব্যক্তি শ্রেণির করদাতার জন্য অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করেছে। ফলে করদাতাদের বড় একটি অংশ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হয়েছেন।
গত ৪ আগস্ট ২০২৫ থেকে ই-রিটার্ন গ্রহণ শুরু হওয়ার পর ধাপে ধাপে রিটার্ন দাখিলের সংখ্যা বেড়েছে। আগস্ট মাসে ২ লাখ ৫১ হাজার ৭৮৪ জন, সেপ্টেম্বরে ৩ লাখ ১ হাজার ৩০২ জন, অক্টোবরে ৪ লাখ ৫৪ হাজার ৭৬ জন, নভেম্বরে ১০ লাখ ৪০ হাজার ৪৭২ জন এবং ডিসেম্বরে ৯ লাখ ৭৮ হাজার ১৯৮ জন করদাতা ই-রিটার্ন দাখিল করেন। নতুন বছরের জানুয়ারি ২০২৬ মাসে ৬ লাখ ৫৫ হাজার ৩৬৩ জন এবং ফেব্রুয়ারিতে ২ লাখ ৯৪ হাজার ৯৮৭ জন রিটার্ন জমা দেন। মার্চ মাসের প্রথম চার দিনেই আরও ৩৬ হাজার ৭০০ জন করদাতা ই-রিটার্ন দাখিল করেছেন। গত বছর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যেখানে ১৩ লাখ ৯৯ হাজার ৬৫৫ জন ই-রিটার্ন দাখিল করেছিলেন, সেখানে চলতি বছর সেই সংখ্যা ইতোমধ্যেই কয়েকগুণ ছাড়িয়েছে।
লিঙ্গভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দাখিলকৃত ই-রিটার্নের মধ্যে ২৮ লাখ ৬৬ হাজার ৬১৮ জন পুরুষ এবং ১১ লাখ ৩৬ হাজার ৩ জন নারী করদাতা রয়েছেন। আয়ের খাত অনুযায়ী বিশ্লেষণে দেখা যায়, বেতনভুক্ত আয় দেখিয়েছেন ১৬ লাখ ১০ হাজার ৭৫০ জন পুরুষ ও ৪ লাখ ৭৮ হাজার ৫৬৬ জন নারী করদাতা। বাড়িভাড়া খাতে আয় দেখিয়েছেন ১ লাখ ৮৭ হাজার ৭৫৪ জন পুরুষ এবং ৮৪ হাজার ৪৭৭ জন নারী।
করযোগ্য সীমার নিচে আয় দেখিয়েছেন ১৪ লাখ ৩৫ হাজার ৬৩০ জন পুরুষ এবং ৭ লাখ ৬৫ হাজার ১৯৭ জন নারী করদাতা। ৫ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকার মধ্যে আয় দেখিয়েছেন ৫ লাখ ৩৪ হাজার ৯৫৪ জন পুরুষ ও ১ লাখ ৯৩ হাজার ৮৩৭ জন নারী। ১০ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকার মধ্যে আয় দেখিয়েছেন ১ লাখ ৬৪ হাজার ৯৮৩ জন পুরুষ ও ৪৭ হাজার ৫৩২ জন নারী। ২০ লাখ থেকে ৪০ লাখ টাকার মধ্যে আয় দেখিয়েছেন ৫৪ হাজার ২১২ জন পুরুষ ও ১১ হাজার ৪৫৫ জন নারী। আর ৪০ লাখ টাকার বেশি আয় দেখিয়েছেন ২৯ হাজার ৮০ জন পুরুষ ও ৫ হাজার ১১৭ জন নারী করদাতা।
এছাড়া সম্পদের পরিমাণ সারচার্জ আরোপযোগ্য হওয়ায় ৩৯ হাজার ৩৬৩ জন পুরুষ এবং ১১ হাজার ৬৫ জন নারী করদাতা সারচার্জ পরিশোধ করেছেন, যা উচ্চ আয়ের করদাতাদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি করদাতাদের জন্য অনলাইনে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক না হলেও তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে। পাসপোর্ট নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ও ই-মেইল ঠিকানাসহ প্রয়োজনীয় তথ্য [email protected] ঠিকানায় পাঠালে সংশ্লিষ্ট করদাতার ই-মেইলে ওটিপি ও রেজিস্ট্রেশন লিংক পাঠানো হচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রবাসীরাও সহজেই অনলাইনে রিটার্ন দাখিল করতে পারছেন। পাশাপাশি করদাতার ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধিরাও এ বছর ই-রিটার্ন দাখিলের সুযোগ পাচ্ছেন।
ই-রিটার্ন ব্যবস্থার অন্যতম সুবিধা হলো—কোনো কাগজপত্র বা দলিল আপলোড না করেই করদাতারা তাদের আয়, ব্যয়, সম্পদ ও দায়ের তথ্য অনলাইনে এন্ট্রি করতে পারছেন। ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড, ইন্টারনেট ব্যাংকিং কিংবা মোবাইল ফাইন্যানশিয়াল সার্ভিস যেমন বিকাশ বা নগদের মাধ্যমে অনলাইনে কর পরিশোধ করে তাৎক্ষণিকভাবে রিটার্ন দাখিলের স্বীকৃতিপত্র (acknowledgement slip) ও আয়কর সনদ সংগ্রহ করা যাচ্ছে। ফলে ঘরে বসেই ঝামেলামুক্তভাবে কর পরিশোধের সুযোগ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে দেশে-বিদেশে অবস্থানরত করদাতাদের কাছে।
রিটার্ন দাখিলে কোনো ভুল হলে ১৮০ দিনের মধ্যে একই সিস্টেম ব্যবহার করে সংশোধিত রিটার্ন দাখিলের সুযোগ রয়েছে। এখন পর্যন্ত ৫৬ হাজারের বেশি করদাতা ২০২৫-২৬ করবর্ষে সংশোধিত রিটার্ন দাখিল করেছেন, যা ই-রিটার্ন ব্যবস্থার প্রতি আস্থারই বহিঃপ্রকাশ।
করদাতাদের সহায়তায় এনবিআর একটি কল সেন্টার চালু করেছে। ০৯৬৪৩ ৭১ ৭১ ৭১ নম্বরে ফোন করে করদাতারা তাৎক্ষণিক সহায়তা পাচ্ছেন। পাশাপাশি www.etaxnbr.gov.bd ওয়েবসাইটের eTax Service অপশন থেকে লিখিত অভিযোগ বা জিজ্ঞাসা পাঠিয়েও সমাধান পাওয়া যাচ্ছে। দেশের সব কর অঞ্চলে স্থাপিত ই-রিটার্ন হেল্প ডেস্ক থেকেও অফিস চলাকালীন সময়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
জরিমানা এড়াতে এনবিআর ইতোমধ্যে ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের এসএমএসের মাধ্যমে ই-রিটার্ন দাখিলের অনুরোধ জানিয়েছে। সংস্থাটি সকল করদাতাকে ৩১ মার্চ ২০২৬ তারিখের মধ্যে ২০২৫-২৬ করবর্ষের আয়কর রিটার্ন অনলাইনে দাখিলের আহ্বান জানিয়েছে। ডিজিটাল করব্যবস্থায় এই ব্যাপক অংশগ্রহণকে কর প্রশাসনের আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



