ছবি: সংগৃহীত
বন্ড সুবিধার চরম অপব্যবহার এবং মিথ্যা ঘোষণায় পাকিস্তান থেকে আমদানিকৃত ১৫০ টন কাঁচা তামাকের একটি বিশাল চালান চট্টগ্রাম বন্দরে জব্দ করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। এই পরিমাণ কাঁচামাল ব্যবহার করে বাজারে প্রায় ২১ কোটি ৪৩ লাখ শলাকা প্রিমিয়াম সিগারেট উৎপাদন করা সম্ভব হতো, যার সম্ভাব্য খুচরা বাজারমূল্য প্রায় ৪৯৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। কাস্টমস গোয়েন্দাদের প্রাথমিক তদন্তে আমদানি মূল্য নিয়ে ব্যাপক অসঙ্গতি এবং বিশাল অংকের রাজস্ব ফাঁকির চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাজধানী ঢাকায় কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান সংস্থাটির অতিরিক্ত মহাপরিচালক তানভীর আহম্মেদ।
চালানের বিবরণ ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের তথ্য: সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, জব্দকৃত ১০ কনটেইনারের এই চালানটি গত ১৭ অক্টোবর পাকিস্তান থেকে জাহাজে তোলা হয় এবং ১৯ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছায়। গত ২৫ অক্টোবর এর বিল অব এন্ট্রি দাখিল করা হলেও তার আগেই গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এর ওপর নজরদারি শুরু হয়। চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয় বুধবার চালানটি শতভাগ পরীক্ষা করে।
এই চালানের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান হলো কুষ্টিয়ার নিমতলীতে অবস্থিত শতভাগ রপ্তানিমুখী বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধাপ্রাপ্ত ‘গ্লোবাল লিফ টোব্যাকো কোম্পানি লিমিটেড’। অন্যদিকে পাকিস্তানের ‘আল আলিফ ট্রেডার্স লিমিটেড’ এই চালানটি রপ্তানি করেছে এবং পণ্যটি পাঠাতে মধ্যস্থতা করেছে দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘টেট্রা ট্রেড এফজেডসি’। পুরো চালানটি খালাসের দায়িত্বে ছিল চট্টগ্রামের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ‘ইসলাম অ্যান্ড সন্স’।
কারখানা পরিদর্শনে বেরিয়ে এলো ব্যাপক গরমিল: শুধু বন্দরই নয়, গত ২৮ অক্টোবর যশোরের কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের একটি বিশেষ দল গ্লোবাল লিফ টোব্যাকোর কুষ্টিয়ার কারখানা সরেজমিন পরিদর্শন করে। সেখানে প্রতিষ্ঠানের স্টক রেজিস্টারের সঙ্গে কারখানার প্রকৃত মজুতের হিসাবে মারাত্মক অসঙ্গতি ধরা পড়ে।
পরিদর্শনে দেখা যায়—
-
ঘাটতি: প্রতিষ্ঠানের সরকারি রেজিস্টারের তুলনায় বাস্তবে ২ লাখ ৫৭ হাজার ৩১৯ কেজি কাঁচা তামাক কম পাওয়া গেছে। কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি কেজি তামাকের বিপরীতে ৫০ টাকা নির্দিষ্ট হারে ভ্যাট ধরলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১ কোটি ২৮ লাখ ৬৮ হাজার ৪৫০ টাকা।
-
অবৈধ মজুত: অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠানে নির্ধারিত পরিমাপের চেয়ে ১৭ লাখ ২৫ হাজার ৬৭২ কেজি সেমি-প্রসেসড তামাক বা তামাকের লেমিনা অতিরিক্ত পাওয়া গেছে। এই বিশাল পরিমাণ তামাক কোথা থেকে সংগ্রহ করা হলো, তার কোনো বৈধ ক্রয়সংক্রান্ত তথ্য বা দালিলিক প্রমাণপত্র দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানটি।
রাজস্ব ফাঁকির আশঙ্কা ও আইনি পদক্ষেপ: প্রেস ব্রিফিংয়ে কাস্টমস গোয়েন্দা জানায়, হিসাব ও নথিপত্রের এই ঘাটতির কারণে উৎসে ভ্যাট বাবদ প্রায় ২ কোটি ৪১ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকির আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া কম পাওয়া কাঁচা তামাক এবং অতিরিক্ত পাওয়া সেমি-প্রসেসড তামাকের সম্পূর্ণ হিসাব মিলিয়ে প্রায় ৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকার কর-সং্লিষ্ট অনিয়মের বিষয় সামনে এসেছে।
বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে এ ধরনের অননুমোদিত আমদানির নেপথ্যে অন্য কোনো চক্র জড়িত আছে কি না এবং এর পেছনে বড় কোনো শুল্ক ফাঁকির সিন্ডিকেট কাজ করছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। ইতোমধ্যে চালানটির খালাস প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্থগিত রাখা হয়েছে এবং পুরো ঘটনাটির নিবিড় ও গভীর তদন্ত চলছে।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



