ছবি: সংগৃহীত
দেশের সর্বস্তরের ভোক্তাদের জন্য নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে ১ নভেম্বর থেকে কঠোর অবস্থান নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)। খাদ্য আইন, ২০১৩ এবং সম্প্রতি প্রকাশিত 'নিরাপদ খাদ্য (রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স) প্রবিধানমালা, ২০২৬'-এর আওতায় দেশের ছোট-বড় সব ধরনের খাদ্য প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধনের আওতায় আনা হচ্ছে।
১৬ জুলাই গেজেট প্রকাশের পর কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে—নিবন্ধন বা লাইসেন্স ছাড়া কোনো ধরনের খাদ্য ব্যবসা পরিচালনা করা হলে তা সরাসরি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশের খাদ্য শিল্পে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন নীতি-নির্ধারকরা।
বিএফএসএ-এর নতুন নীতিমালা অনুযায়ী খাদ্য খাতকে ব্যবস্থার ধরন অনুযায়ী দুটি প্রধানভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রচলিত সাধারণ ১৬টি ক্যাটাগরির ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য নিবন্ধন নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, অন্যদিকে বিশেষায়িত বা ঝুঁকিপূর্ণ খাদ্যপণ্য প্রস্তুত ও আমদানিকারকদের ক্ষেত্রে লাইসেন্স গ্রহণ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
কারা পাচ্ছেন নিবন্ধনের নির্দেশ:
প্রবিধানমালার তোড়ে বাদ পড়ছে না কোনো খাদ্য প্রতিষ্ঠানই। ফুটপাতের সাধারণ ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকানদার থেকে শুরু করে বহুজাতিক আমদানিকারক—সবাইকে নিবন্ধনের আওতায় আসতে হবে।
১. ক্ষুদ্র ও ফুটপাত ব্যবসায়ী: রাস্তার পাশে পিঠা, পুরি, পেঁয়াজু বা চা-নাস্তা বিক্রি করা ভ্রাম্যমাণ ও অস্থায়ী দোকানসমূহ।
২. খাদ্য সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান: ছোট-বড় সব রেস্তোরাঁ, ক্যাটারিং সার্ভিস, পেস্ট্রি শপ, বেকারি এবং ফলের রসের দোকান।
৩. উৎপাদন ও পাইকারি খাত: মিষ্টির দোকান, ডেইরি বা দুগ্ধজাত পণ্য প্রস্তুতকারী, প্যাকেটজাত খাদ্য প্রস্তুতকারক, পাইকারি মুদি ব্যবসায়ী, খাদ্য গুদাম এবং কোল্ড স্টোরেজ।
৪. বিশেষ প্রক্রিয়াজাত খাদ্য খাত: ভোজ্যতেল, ভোজ্য লবণ, পুষ্টিসমৃদ্ধ (Fortified) খাদ্য, জৈব-খাদ্য (Organic Food), একাধিক ধাপে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, কিরণ-সম্পাতকৃত খাদ্য, ব্যবহারিক খাদ্য এবং খাদ্যে ব্যবহৃত বিভিন্ন সংযোজন দ্রব্য (Food Additives) প্রস্তুত, মজুদ ও বিপণনকারী।
কাদের জন্য লাইসেন্স বাধ্যতামূলক:
সাধারণ নিবন্ধনের বাইরে চার শ্রেণির বিশেষায়িত ও স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত খাদ্য প্রস্তুতকারক ও আমদানিকারকদের ক্ষেত্রে লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
শিশুদের ফর্মুলা দুধ এবং শিশু খাদ্য।
বয়স্ক কিংবা বিশেষ রোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য তৈরিকৃত বিশেষ পথ্য ও চিকিৎসাসংক্রান্ত খাবার।
স্বাস্থ্য সহায়ক, খাদ্য সম্পূরক (Supplements), প্রোবায়োটিক, প্রিবায়োটিক এবং নিউট্রাসিউটিক্যালস পণ্য।
প্রজননগত বা জিনগতভাবে পরিবর্তিত খাদ্য (GMO Food), অভিনব খাদ্য এবং যেসব খাদ্যপণ্যের বিজ্ঞাপনে 'রোগের ঝুঁকি হ্রাস' বা 'বিশেষ স্বাস্থ্য উপকারিতার' দাবি করা হয়।
আবেদন পদ্ধতি, ফি ও ভোক্তা অধিকার:
খাদ্য ব্যবসায়ীদের প্রাথমিক উৎসাহ দিতে প্রচলিত ১৬ ক্যাটাগরির ব্যবসার প্রথম নিবন্ধনে কোনো ফি রাখা হয়নি (বিনামূল্যে)। অন্যদিকে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের প্রিমিসেস লাইসেন্স ফি নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতিষ্ঠানের আয়তনের ওপর ভিত্তি করে। সর্বনিম্ন ১০০ বর্গমিটার বা তার ছোট স্পেসের জন্য ১০ হাজার টাকা এবং ১০ হাজার বর্গমিটারের চেয়ে বড় বড় শিল্প কারখানার জন্য লাইসেন্স ফি ধরা হয়েছে ৬০ হাজার টাকা।
ব্যবসায়ীদের বিএফএসএ-এর তফশিল-১০ অনুযায়ী নির্ধারিত ফরম (নিবন্ধনের জন্য ফরম ৫.১ এবং লাইসেন্সের জন্য ৬.১, ৭.১, ৮.১ ও ৯.১) পূরণ করে জেলা কার্যালয়ে জমা দিতে হবে। পর্যায়ক্রমে পুরো ব্যবস্থাটিকে ডিজিটাল ও ১০০% অনলাইন করার উদ্যোগ চলছে।
নিবন্ধন ও লাইসেন্সের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ বছর, যা মেয়াদ শেষে নির্ধারিত ফি দিয়ে নবায়ন করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এখন থেকে উৎপাদিত প্রতিটি মোড়কজাত খাদ্যপণ্যের গায়ে স্পষ্টভাবে 'BFSA রেজিস্ট্রেশন নম্বর' ছাপাতে হবে। ফলে ভোক্তারা খুব সহজেই অনুমোদিত পণ্য চিহ্নিত করতে পারবেন এবং কোনো খাদ্যে ভেজাল বা অনিয়ম পেলে ওই নম্বরের বিপরীতে কর্তৃপক্ষের কাছে সরাসরি অভিযোগ জানাতে পারবেন। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুশিয়ারি দিয়ে ১ নভেম্বরের আগেই ব্যবসায়ীদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করার আহ্বান জানিয়েছে বিএফএসএ।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



