ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) এবং চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের অ্যাসাইনমেন্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন অব রিস্ক (এআইআর) শাখা যৌথ অভিযান চালিয়ে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরে সংঘটিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য জালিয়াতির এক ভয়াবহ চিত্র উন্মোচন করেছে। কাগজে-পরমে কৃষি যন্ত্রপাতি, টুথপিক, প্রিন্টিং কাগজ কিংবা স্টেইনলেস স্টিলের মতো কম শুল্কের পণ্য আমদানির ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তব চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সিল কেটে কন্টেইনার খুলে দেখা যায়, চীন, পাকিস্তান ও থাইল্যান্ড থেকে কৌশলে নিয়ে আসা হয়েছে কোটি কোটি টাকার উচ্চ শুল্কের নামী ব্র্যান্ডের প্রসাধনী, বিএসটিআই নিষিদ্ধ ক্ষতিকর পণ্য, দামি মোটরপার্টস এবং বিয়ারিং।
এমনকি অপরাধচক্রের দুঃসাহস এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে, কাস্টমস কর্তৃক অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড (ASYCUDA World) সিস্টেমে পণ্যচালান ‘লক’ করার পরও বন্দরের কাস্টমস লক ভেঙে, অরিজিনাল সিল কেটে ‘গায়েবি সিল’ লাগিয়ে আস্ত কন্টেইনার খালাস করে নেওয়ার চেষ্টা চালানো হয়েছে। সম্প্রতি টানা অভিযানে উন্মোচিত এমন ৮টি বড় ধরনের চালানে প্রায় পৌনে ৮ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছে। এই ঘটনার সাথে জড়িত আমদানিকারক ও সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের বিরুদ্ধে কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর ৩৩ ও ১৭১ ধারায় কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
মিথ্যা ঘোষণার আড়ালে যা নিয়ে আসা হচ্ছিল:
-
পাওয়ার স্প্রেয়ারের পেটে কসমেটিকস: ঢাকার নিউ মার্কেটের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান 'ফরচুন গ্লোবাল ট্রেডিং' চীন থেকে কৃষি খাতের জন্য ১১,৯৫৬ কেজি ‘পাওয়ার স্প্রেয়ার মেশিন’ আমদানির কথা জানিয়েছিল (বি/ই: C-1203065)। তবে কায়িক পরীক্ষায় কন্টেইনারজুড়ে মিলেছে ভারী স্টেজ লাইট, ফেস ক্রিম, সান ক্রিম, টুথপেস্ট, পিলিং জেল, সিরাম, এলইডি লাইট, সানগ্লাস এবং ব্ল্যাক হেয়ার শ্যাম্পু। ঘোষিত ওজনের চেয়ে প্রায় ১,৮১৭ কেজি অতিরিক্ত পণ্য এনে প্রায় ২.৫ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অপচেষ্টা চালানো হয়।
-
টুথপিকের আড়ালে নিষিদ্ধ ক্রিম ও স্প্রে: পুরান ঢাকার চকবাজারের 'কাফ কর্পোরেশন' চীন থেকে সাড়ে ২২ টন কাঠের 'টুথপিক' আনার কথা ঘোষণা দেয় (বি/ই: C-1098766)। কায়িক পরীক্ষায় কন্টেইনারে টুথপিকের পরিমাণ মিলেছে মাত্র ১,৬২০ কেজি। বাকি ১৫.৭ টনজুড়েই ছিল পাকিস্তানের ক্ষতিকর রাসায়নিকযুক্ত ও বিএসটিআই নিষিদ্ধ ‘গোরি বিউটি ক্রিম’, ফেস ক্রিম, অ্যান্টি-এজিং জেল, হেয়ার রিমুভার স্প্রে, প্রিমিয়াম সানগ্লাস এবং যৌন উত্তেজক ‘ডিলে স্প্রে’। এতে সরকারের ক্ষতি হতো প্রায় ২.৮ কোটি টাকার রাজস্ব।
-
রবার বুশের আড়ালে থাইল্যান্ডের ইঞ্জিন পার্টস: ঢাকার 'এইচ.আর এন্টারপ্রাইজ' থাইল্যান্ড থেকে ১৬,০৪০ কেজি 'ইঞ্জিন রবার বুশ' আনার কথা জানিয়েছিল (বি/ই: C-1216730)। পরীক্ষার পর দেখা যায় রবার বুশ রয়েছে মাত্র ৬,৬২৫ কেজি। বাকি ১৩ হাজার কেজির পুরোটাই অরিজিনাল ইঞ্জিন মাউন্টিং, সাসপেনশন বুশ, আর্ম বুশ, সেন্টার বিয়ারিং, স্প্রিং শ্যাকল ও স্টিয়ারিং-এর মতো অত্যন্ত দামি মোটরপার্টস (অতিরিক্ত ২২% পণ্য)। অন্যদিকে, একই আমদানিকারকের অপর একটি চালানে (বি/ই: C-1234267) গোয়েন্দা নজরদারির মুখে পড়ে রাতারাতি কমিশনারের পূর্বানুমতি ছাড়া এইচএস কোড পরিবর্তনের অপচেষ্টাও নস্যাৎ করা হয়। এতে সম্ভাব্য রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ ৪৪ লাখ টাকা।
-
পেপার আমদানির নামে ফ্লেক্স ব্যানার: 'নিউ ট্রাস্ট ট্রেডার্স' নামক প্রতিষ্ঠানটি ২৩,৬১৮ কেজি 'হিট ট্রান্সফার পেপার' আমদানির ঘোষণা দিয়ে কন্টেইনার আনে (বি/ই: C-1054001)। কিন্তু ভিতরে মাত্র ৩,১৬০ কেজি পেপার রেখে বাকি ২১,৪৬৭ কেজি জুড়েই আনা হয় উচ্চ শুল্কের ‘পিভিসি ফ্লেক্স ব্যানার’। ফাঁকিকৃত রাজস্বের আনুমানিক পরিমাণ ৪০ লাখ টাকা।
-
স্টেইনলেস স্টিলের আড়ালে শত টন নাট-বল্টু: বংশালের 'নিউ রনি এন্টারপ্রাইজ' ও ওয়ারীর 'মোহাম্মাদীয়া ট্রেড' একই কৌশল অবলম্বন করে। মোহাম্মাদীয়া ট্রেড (বি/ই: C-1237019) ২২ টন স্টিল সার্কেল ও এক্সকাভেটর গিয়ারের ঘোষণা দিলেও বাস্তবে ধরা পড়ে মাত্র ৩.৮ টন আসল পণ্য। বাকি ২২,১১৩ কেজি পুরোটাই নাট, বল্টু ও স্ক্রু (ফাঁকি ৩২ লাখ টাকা)। আবার নিউ রনি এন্টারপ্রাইজ (বি/ই: C-1236789) একই কায়দায় ১৭,৫৯২ কেজি নাট-বল্টু, ২,৭৮৭ কেজি ভারী রোলিং বিয়ারিং এবং ২,৩৩৬ কেজি গ্যাস লিফ্ট সিলিন্ডার আমদানি করে (ফাঁকি ৪২ লাখ টাকা)।
কাস্টমস লক ভেঙে চুরির নজিরবিহীন অপচেষ্টা
সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনাটি ঘটে আমদানিকারক 'কাফ কর্পোরেশন'-এর অন্য একটি চালানে (বি/ই: C-1246669)। চালানটি ইয়েলো লেনভুক্ত থাকায় এবং রাজস্ব ফাঁকির সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়ায় কাস্টমসের ASYCUDA World সিস্টেমে এটি লক করে দেওয়া হয়। কিন্তু সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের অসাধু প্রতিনিধিরা কায়িক পরীক্ষার আগেই গত ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে কন্টেইনারটি অবৈধভাবে কিপ ডাউন করে আসল সিল কেটে সেখানে ‘SGT596953’ নম্বরের একটি গায়েবি সিল লাগিয়ে দেয়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করে নথিপত্র তৈরি করে আস্ত কন্টেইনার সরানোর সুপরিকল্পিত চক্রান্ত করা হয়েছিল। তাৎক্ষণিকভাবে কাস্টমস গোয়েন্দারা বিষয়টি ধরে ফেলে কন্টেইনারটি বাজেয়াপ্ত করে সিকিউরিটি হেফাজতে নেয়।
কাস্টমস কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সাফ জানিয়েছেন, দেশীয় শিল্প ও জাতীয় রাজস্ব রক্ষায় এই ধরনের সংঘবদ্ধ চক্রের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বজায় রাখা হবে এবং জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



