ছবি: সংগৃহীত
চলছে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের আয়কর দেওয়ার কাজ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনেক করদাতা ইতিমধ্যেই তাঁদের আয়কর রিটার্ন দাখিল করেছেন, আবার অনেকেই এখনো রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নিয়ম অনুযায়ী, আয়কর রিটার্ন দাখিল করা কেবল একজন দায়িত্বশীল নাগরিকের নিয়মিত কর্তব্যই নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু আইনি বাধ্যবাধকতা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা না দিলে আর্থিক জরিমানা থেকে শুরু করে নানা ধরনের জটিলতার মুখোমুখি হতে হতে পারে। এমনকি নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে ইউটিলিটি সেবা যেমন—বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি কিংবা ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার বিশেষ ক্ষমতাও রয়েছে কর কর্তৃপক্ষের হাতে। তবে সাধারণ করদাতাদের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই; কারণ রিটার্ন জমা না দিলেই যে সবার বাসাবাড়ির সংযোগ সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেটে দেওয়া হবে, বিষয়টি তেমন নয়।
আইন লঙ্ঘন ও জরিমানার বিধান
বাংলাদেশের প্রচলিত আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২৬৬ ধারা অনুযায়ী, কোনো যুক্তিসঙ্গত ও গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়া নির্ধারিত সময়ে আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট করদাতাকে কড়া জরিমানার মুখে পড়তে হতে পারে। আইনের এই ধারা অনুযায়ী, সর্বশেষ নিরূপিত করযোগ্য আয়ের ১০ শতাংশ অথবা ন্যূনতম ১,০০০ টাকা জরিমানা ধার্য করার সুযোগ রয়েছে। তবে জরিমানার এই পরিমাণ এবং এর প্রয়োগ পুরোপুরি নির্ভর করে আইনের নির্দিষ্ট শর্তাবলীর ওপর। এ ছাড়া রিটার্ন দাখিলে বিলম্ব বা ব্যর্থতা অব্যাহত থাকলে সংশ্লিষ্ট উপকর কমিশনার (ডিসিটি) প্রতিদিনের জন্য ৫০ টাকা হারে অতিরিক্ত জরিমানা আরোপ করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে করদাতার পূর্ববর্তী কর নির্ধারণের ইতিহাস ও ট্র্যাক রেকর্ড বিবেচনা করে জরিমানা হিসাব করা হয়। ফলে সময়মতো রিটার্ন না দিলে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়।
পরিষেবা সংযোগ বিচ্ছেদের বাস্তব চিত্র
আয়কর আইনে নির্দিষ্ট কিছু আইনি শর্ত পূরণ সাপেক্ষে কর কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সেবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার যে এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি এবং ইন্টারনেটের মতো অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবাগুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কিন্তু এই ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্রশাসনিক পদক্ষেপ ও দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। তাই রিটার্ন জমা দেওয়া না হলেই তাৎক্ষণিকভাবে পরিষেবা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে—এমন অনুমান বা গুজব ছড়ানো ঠিক নয়। এটি মূলত করদাতার সার্বিক পরিস্থিতি, আইন অমান্যের মাত্রা এবং রাজস্ব কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
করছাড় হ্রাস ও বাড়তি করের চাপ
নির্ধারিত সময়ের পর রিটার্ন দাখিল করলে কেবল জরিমানাই নয়, বরং করদাতার প্রাপ্য কর রেয়াত বা করছাড়ের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। আয়কর আইনের ১৭৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী, সময়মত রিটার্ন জমা না দিলে নির্ধারিত বিনিয়োগের বিপরীতে প্রাপ্য করছাড়ের সুবিধা উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়ে আসতে পারে। এর ফলে করদাতাকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি আয়কর পরিশোধের আইনি দায়ের মুখোমুখি হতে হয়। তবে করদাতার ধরন ও ব্যবসার প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে এই আর্থিক দায় নির্ধারিত হয়।
ই-রিটার্ন ও করদাতাদের করণীয়
বর্তমানে এনবিআর ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের সুবিধার্থে অনলাইনে ‘ই-রিটার্ন’ ব্যবস্থার ব্যাপক বিস্তার ঘটিয়েছে। যেসব করদাতার জন্য ই-রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, তাঁদের নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে অনলাইনে ফরম পূরণ করতে হবে। এর আগে ১ কোটি ১৫ লাখের বেশি টিআইএন (TIN) ধারীর বিপরীতে মাত্র ৩১ লাখ করদাতা রিটার্ন জমা দিয়েছিলেন, যা থেকে বোঝা যায় কর সচেতনতা বাড়ানোর এখনো অনেক অবকাশ রয়েছে। তাই আইনি জটিলতা ও আর্থিক শাস্তি এড়াতে আইনি সময়সীমার মধ্যেই রিটার্ন জমা দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে। কোনো কারণে দেরি হলে গুজবে কান না দিয়ে নিকটস্থ কর অফিস বা এনবিআরের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



