ছবি: সংগৃহীত
স্বাধীনতার দুই দশক পেরিয়ে গেলেও যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এতদিন কেবল রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার হাতিয়ার কিংবা আমলাতান্ত্রিক বেড়াজালে বন্দী ‘নখ-দন্তহীন ব্যাঘ্রে’ পরিণত হয়েছিল, তা এবার এক সম্পূর্ণ নতুন রূপ ও নতুন উদ্যমে মাঠে নামতে যাচ্ছে। বিগত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে দেশের অন্যতম এই শীর্ষ সংস্থাকে ব্যবহার করা হয়েছে একপাক্ষিক রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে—যেখানে একদিকে ছিল বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর সাজানো মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলার পাহাড়, অন্যদিকে ছিল ক্ষমতাসীন দলের দুর্নীতিবাজদের জন্য অকৃপণ আইনি সুরক্ষার ছাতা। সম্প্রতি দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তন ও গণ-অভ্যুত্থানের পর, নবনিযুক্ত কমিশন এই জঞ্জাল ঝেড়ে ফেলে এক আমূল পরিবর্তনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। নতুন গঠিত দুদকের প্রথম বৈঠকেই পুরো কমিশনকে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাবমুক্ত রেখে এক শক্তিশালী, আধুনিক ও আপসহীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে নতুন করে গড়ে তোলার এক গুচ্ছ অভাবনীয় পরিকল্পনা ও রোডম্যাপ গ্রহণ করা হয়েছে।
নবনিযুক্ত দুদক চেয়ারম্যান বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, বর্তমান কমিশন কোনো রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম বা মদদপুষ্ট হয়ে এই দায়িত্বে আসেনি; বরং জনগণের সেবক হিসেবে দেশের অগণিত মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণেই তারা অঙ্গীকারবদ্ধ। দায়িত্ব গ্রহণের পর পরই কর্মকর্তাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে বসেন চেয়ারম্যান এবং কমিশনের কাছে ঝুলে থাকা ও চলমান সমস্ত ফাইল জরুরি ভিত্তিতে তলব করেন। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন, ফাইলের পেছনে কার নাম রয়েছে, তিনি কোন দল বা ক্ষমতার অধিকারী, তা কোনোভাবেই বিবেচনায় নেওয়া হবে না; বরং দুর্নীতির মূল বস্তু ও গভীরতা বিচার করেই কঠোরতম আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয় ও ঝুলে থাকা অনুসন্ধান এবং তদন্তগুলো অতি দ্রুত নিষ্পত্তির কঠোর নির্দেশ জারি করা হয়েছে। অতীত ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই পদায়নকৃত আমলা ও রাজনৈতিক পছন্দের কমিশনারদের মাধ্যমে দুদকের মূল ভাবমূর্তি নষ্ট করা হয়েছিল। বিশেষ করে বিগত ১৫ বছরের শাসনামলে ইকবাল মাহমুদ ও মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহর মতো ধারাবাহিক চেয়ারম্যানদের সময়ে দুদকের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি চরম আকার ধারণ করে। সে সময় একদলকে সুরক্ষা দেওয়া ও প্রতিপক্ষকে নাজেহাল করার পাশাপাশি ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করা হয়েছিল; যার বিনিময়ে এমনকি দুদকের কর্মকর্তাদের ধানমণ্ডিতে ডুপ্লেক্স ভবন বরাদ্দের মতো অনৈতিক উপঢৌকন দেওয়ার নজিরও মিলেছে, যা নিয়ে বর্তমানে অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান চলছে। এসব অতীত গ্লানি মুছে ফেলতে এবার কমিশনের অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি অভিযানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক শেকল থেকে দুদককে স্থায়ীভাবে মুক্ত করতে কমিশন প্রধান কিছু বৈপ্লবিক পদক্ষেপের দিকে এগোচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজস্ব স্থায়ী ‘প্রসিকিউশন ইউনিট’ গঠন এবং প্রেষণে আমলা নিয়োগ প্রথা বন্ধ করা। গত ২১ বছর ধরে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে নিজস্ব প্রসিকিউশন ইউনিট গঠন না করায় প্রতিবার সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে প্যানেল আইনজীবী বদলে যেত। ফলে সরকারি দলের দুর্নীতিবাজেরা সহজেই খালাস পেতেন এবং বিরোধী দল দমন সহজ হতো। নিজস্ব আইনি ইউনিট থাকলে দুদকের বিচারকার্য অন্য কারও ওপর নির্ভর করবে না। পাশাপাশি, অন্যান্য সরকারি দপ্তর থেকে প্রেষণে আসা আমলাদের দুদকের ‘গলার কাঁটা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, কারণ এসব প্রেষণকৃত কর্মকর্তা অপকর্ম করলেও দুদকের তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো একচ্ছত্র ক্ষমতা ছিল না। এদের পরিবর্তে নিজস্ব জনবল দিয়ে শক্তিশালী অবকাঠামো গড়ার পাশাপাশি দুদকের কর্মকর্তাদের কাজের গতি ফেরাতে ঝুঁকি ভাতা, পদোন্নতির জট নিরসন, পরিবহন সমস্যা সমাধান এবং বাজেয়াপ্ত সম্পদের একটি অংশ প্রণোদনা বা পুরস্কার হিসেবে কর্মকর্তাদের দেওয়ার মতো বৈপ্লবিক প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
সংস্থাটির কাঠামোগত দুর্বলতা ও জনবল সংকট কাটাতে বর্তমান জনবলকে দ্বিগুণ করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সমগ্র দেশে দুদকের পরিধি ও সক্ষমতা বাড়াতে অর্গানোগ্রাম চূড়ান্ত করে ৬৪টি জেলা কার্যালয়, ঢাকা ও চট্টগ্রামে দুটি মহানগর কার্যালয় এবং এয়ারপোর্ট ও স্থলবন্দরে দুটি পৃথক দফতরসহ মোট ৬৮টি নতুন কার্যালয় চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। শুধু অবকাঠামো বৃদ্ধিই নয়, কাজের গতি ও স্বচ্ছতা আনতে পুরো বিচারিক ও অনুসন্ধান প্রক্রিয়াকে ম্যানুয়াল পদ্ধতির বদলে ‘ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড প্রসিকিউশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (আইপিএমএস)’ নামক আধুনিক সফটওয়্যারের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পুলিশের আদলে একটি সর্বাধুনিক ‘ক্রিমিনাল ডেটা বেইস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (সিডিএমএস)’ তৈরির মাধ্যমে পুরো সংস্থাকে ডিজিটাল রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা চলছে। প্রতিদিন গড়ে আসার প্রায় পাঁচ হাজার অভিযোগের মধ্যে মাত্র ১০-১২টি বাছাই করে বাকি হাজার হাজার ফাইল ফেলে রাখার যে ‘অভিযোগ যাচাই-বাছাই কমিটি (যাবাক)’ কেন্দ্রিক অভ্যন্তরীণ ‘দুষ্টচক্র’ গড়ে উঠেছিল, সেখানেও স্বাধীন ও পেশাদার কর্মকর্তাদের বসিয়ে আমূল পরিবর্তনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হচ্ছে।
বিদেশ থেকে পাচারকৃত কোটি কোটি ডলার ও সম্পদ ফিরিয়ে আনতে দুদককে পর্যাপ্ত আইনি ক্ষমতা দেওয়া ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সাথে সরাসরি সমঝোতা চুক্তি করার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হচ্ছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের মতে, স্বাধীনতার পর থেকে দুদককে যে রাজনৈতিক প্রভাব ও আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে পঙ্গু করে রাখা হয়েছিল, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে নতুন উদাহরণ স্থাপন করাই এই কমিশনের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ। সব মিলিয়ে, একটি স্বাধীন ইনটেলিজেন্স সেল গঠনের মাধ্যমে দুদকের ভেতরেই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে এবং নখ-দন্তহীন অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে একটি সুসংগঠিত, আধুনিক ও নিরপেক্ষ দুর্নীতি দমন কমিশন উপহার দেওয়াই এখন নতুন নেতৃত্বের মূল লক্ষ্য।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



