ছবি: সংগৃহীত
দেশের কর ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করার লক্ষ্যে দেশের অধিকাংশ স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতার জন্য অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে নির্ধারিত কিছু বিশেষ শ্রেণির করদাতাকে বাদ দিয়ে অন্য সব ব্যক্তি করদাতাকে এখন থেকে এনবিআরের ই-ট্যাক্স পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হবে।
রোববার (২৮ জুন) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান স্বাক্ষরিত এক বিশেষ আদেশে এই নির্দেশনা জারি করা হয়। আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ৩২৮-এর উপধারা (৪)-এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। এর ফলে দেশের কর ব্যবস্থায় ডিজিটাল সেবার ব্যবহার আরও বাড়বে এবং করদাতাদের জন্য রিটার্ন দাখিল প্রক্রিয়া আগের তুলনায় আরও সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ হবে বলে আশা করছে এনবিআর।
বিশেষ আদেশ অনুযায়ী, যেসব ব্যক্তি করদাতা অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতার আওতায় পড়বেন, তাদের সবাইকে এনবিআরের নির্ধারিত ই-ট্যাক্স পোর্টাল ব্যবহার করে রিটার্ন জমা দিতে হবে। কাগজে রিটার্ন জমা দেওয়ার পরিবর্তে অনলাইন প্ল্যাটফর্মকে মূল মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সরকারের ডিজিটাল রূপান্তর কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে এনবিআর কয়েকটি বিশেষ শ্রেণির করদাতাকে এই বাধ্যবাধকতার বাইরে রেখেছে। আদেশ অনুযায়ী, ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রবীণ করদাতাদের অনলাইনে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক হবে না। একইভাবে শারীরিকভাবে অসমর্থ অথবা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন করদাতারা, প্রয়োজনীয় সনদপত্র দাখিলের শর্তে, কাগজে রিটার্ন জমা দিতে পারবেন। এছাড়া বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি করদাতা, মৃত করদাতার পক্ষে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদেরও এই বাধ্যতামূলক অনলাইন রিটার্ন ব্যবস্থার বাইরে রাখা হয়েছে।
যদিও এসব শ্রেণির করদাতাদের জন্য অনলাইন রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক নয়, তবুও তারা চাইলে স্বেচ্ছায় ই-ট্যাক্স পোর্টাল ব্যবহার করে অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দিতে পারবেন। অর্থাৎ তাদের জন্য অনলাইন ব্যবস্থা উন্মুক্ত থাকবে এবং ইচ্ছা করলে তারা ডিজিটাল পদ্ধতির সুবিধাও গ্রহণ করতে পারবেন।
এনবিআর জানিয়েছে, নতুন এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের মাধ্যমে করদাতাদের ভোগান্তি কমবে। আগে রিটার্ন জমা দিতে কর অফিসে গিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো, বিভিন্ন কাগজপত্র বহন করতে হতো এবং অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সময় ব্যয় হতো। অনলাইন পদ্ধতি চালুর ফলে এখন করদাতারা নিজ বাসা, অফিস কিংবা যেকোনো স্থান থেকে ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে সহজেই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন। এতে সময় ও ব্যয় দুটিই সাশ্রয় হবে।
বিশেষ আদেশে আরও বলা হয়েছে, যদি কোনো বাধ্যতামূলক করদাতা ই-রিটার্ন সিস্টেমে নিবন্ধন করতে না পারেন অথবা কারিগরি সমস্যার কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনলাইনে রিটার্ন জমা দিতে ব্যর্থ হন, তাহলে তিনি সংশ্লিষ্ট উপকর কমিশনারের কাছে লিখিতভাবে আবেদন করার সুযোগ পাবেন। আবেদনপত্রে সমস্যার সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংযুক্ত করতে হবে।
এ ধরনের আবেদন পর্যালোচনার পর সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত কর কমিশনার অথবা যুগ্ম কর কমিশনারের অনুমোদন সাপেক্ষে ওই করদাতাকে কাগজে বা পেপার রিটার্ন দাখিলের অনুমতি দেওয়া হবে। অর্থাৎ প্রযুক্তিগত জটিলতা বা যৌক্তিক সমস্যার কারণে কোনো করদাতা যেন রিটার্ন দাখিল থেকে বঞ্চিত না হন, সে বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মতে, অনলাইন রিটার্ন ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে কর প্রশাসনের কার্যক্রম আরও দক্ষ, গতিশীল ও জবাবদিহিমূলক হবে। একই সঙ্গে কর সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ, যাচাই ও বিশ্লেষণের কাজও আরও দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। ডিজিটাল পদ্ধতির মাধ্যমে তথ্য সংরক্ষণ নিরাপদ হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে করদাতাদের জন্য বিভিন্ন সেবা আরও সহজে প্রদান করা যাবে।
এনবিআর আরও মনে করছে, অনলাইন আয়কর রিটার্ন বাধ্যতামূলক করার ফলে করদাতাদের মধ্যে প্রযুক্তিনির্ভর সেবা গ্রহণের প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে কর প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে এবং কাগজভিত্তিক কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। এতে পরিবেশবান্ধব প্রশাসনিক ব্যবস্থাও গড়ে উঠবে।
নতুন এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিষয়টি অবহিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এনবিআর আশা করছে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতায় অনলাইন আয়কর রিটার্ন ব্যবস্থা সফলভাবে বাস্তবায়িত হবে এবং দেশের কর ব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তর আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে।
কর বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক হওয়ার ফলে করদাতারা ঘরে বসেই নিরাপদ ও দ্রুত সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। পাশাপাশি কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি, সেবার মান উন্নয়ন এবং কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠায় এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতায় এ ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতে কর ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তুলবে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



