ছবি: সংগৃহীত
মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামের বাইশ গজের চারপাশে একা একা উদ্দেশ্যহীনভাবে পায়চারি করছিলেন বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম। গতকাল দুপুরে যখনকার ঘটনা এটি, ততক্ষণে ক্রিকেটারদের বর্জনের ডাকে বাংলাদেশের ক্রিকেট রীতিমতো অচল হয়ে পড়েছে। বোর্ডের কেন্দ্রীয় চুক্তির ক্রিকেটারদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করা বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলামের পদত্যাগের দাবিতে খেলোয়াড়রা এমনই অটল ছিলেন যে বিপিএলের দুপুর ১টার ম্যাচ খেলতে হোটেল থেকে চট্টগ্রাম রয়ালস ও নোয়াখালী এক্সপ্রেসের টিম বাস ছাড়েনি। ওই সময়ে বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজির ক্রিকেটাররা বরং সংবাদ সম্মেলন করার জন্য জড়ো হচ্ছিলেন বনানীর এক হোটেলে।
সেখান থেকে ক্রিকেটারদের সংস্থা কোয়াবের সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুনের নেতৃত্বে তাঁরা অনড় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করার পর সন্ধ্যার ম্যাচ খেলতে মাঠে আসেনি রাজশাহী ওয়ারিয়র্স ও সিলেট টাইটানসও। তাই ২০১৯ সালের অক্টোবরে সাকিব আল হাসানের নেতৃত্বে খেলোয়াড় বিদ্রোহের পর বাংলাশের ক্রিকেট আরেকবার পড়ে অচলাবস্থার মধ্যে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তার সঙ্গে যোগ হওয়া এই সমস্যার সমাধান হতে হতে গতকাল মধ্যরাত পেরিয়ে যায়।
মধ্যরাতে সমাধান, মাঠে ফিরছে ক্রিকেটমধ্যরাতে কোয়াব সভাপতি মিঠুন ও বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজকে নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসে অচলাবস্থা নিরসনের ঘোষণা দেন বিসিবি পরিচালক ইফতেখার রহমান।
তাই আজ থেকে মাঠে ক্রিকেট ফিরতে আর কোনো বাধা নেই। গতকালের ম্যাচগুলো হবে আজ। আজকের ম্যাচগুলো বডিলি শিফট হয়ে চলে যাবে আগামীকাল। এক দিনের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ১৮ জানুয়ারির বিরতিও এখন সূচি থেকে বাদ যাচ্ছে।
সেদিনও খেলা হবে। সমাধানের জন্য এর আগে দীর্ঘ বৈঠকে মিঠুনদের সঙ্গে বসেছিলেন সভাপতি আমিনুলও। এই বৈঠকে বিতর্কিত পরিচালক নাজমুলকে উপস্থিত রাখার চেষ্টা করেও বিসিবি ব্যর্থ হয়েছে বলে জানান ইফতেখার, ‘আমরা সারা দিন উনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে চেষ্টা করেছি। এখানে আনতে চেয়েছিলাম, কিন্তু উনার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। আমরা সবাই একমত হয়েছি যে ক্রিকেটটা আবার শুরু করতে হবে।’
নাজমুলের প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনার শর্তে একাট্টা হওয়া ক্রিকেটারদের নেতা মিঠুনও বিসিবির গতকালের সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়ে বলেছেন, ‘আমরা এখনো (নাজমুলের মন্তব্য) মেনে নিতে পারছি না। উনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি (বিসিবি)। তবে উনারা (বোর্ড কর্মকর্তারা) আমাদের কথা নিয়েছেন, তাঁর (নাজমুলের) সঙ্গে যত দ্রুত সম্ভব যোগাযোগ করে আমাদের যে দাবি, সেটি পূরণ করা হবে।’
এই বৈঠকে বসার আগে গত রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কোয়াবও ক্রিকেটারদের কিছুটা নমনীয় অবস্থানের কথা জানিয়েছিল। বুধবার বিকেলে নাজমুলের বক্তব্যের সাড়ে তিন ঘণ্টা পর এক বিবৃতি দিয়ে তাঁর মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করা বিসিবি প্রয়োজনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে বলেও জানায়। রাত পার হওয়ার আগেই নাজমুলকে কারণ দর্শাতেও বলা হয়। কিন্তু ক্রিকেটারদের দাবি ছিল, তাঁকে পদত্যাগ করতেই হবে। কাল বিকেল পর্যন্ত সেটি তিনি না করায় সন্ধ্যার ম্যাচটিও বাতিল হয়। অবশ্য দিনের দ্বিতীয় ম্যাচের আগেই নাজমুলকে বিসিবির অর্থ কমিটির প্রধানের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানায় বিসিবি। দুটি ম্যাচই বাতিল হয়ে যাওয়ার পর দেশের সর্বোচ্চ ক্রিকেট প্রশাসনও কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে বলে জানাচ্ছিলেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক পরিচালক। তবে রাত আরো বাড়তেই গুলশানে বিসিবির নাভানা টাওয়ারের কার্যালয়ে বসা বৈঠক সমাধানের পথ খুঁজে দেয় দুই পক্ষকে।
এর আগে দিনভর অচলাবস্থার পর রাতে কোয়াবের বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, ‘বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলামকে অর্থ কমিটি থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাই। যেহেতু তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং তাঁর পরিচালক পদ নিয়ে প্রক্রিয়াগত কারণে যেহেতু বিসিবি সময় চেয়েছে, সেই সময়টুকু আমরা দিতে চাই। তবে আশা করব, সেই প্রক্রিয়া চলতে থাকবে।’ সেই সঙ্গে কোয়াবের বিবৃতিতে মাঠে নামার জন্য শর্ত শিথিলও করা হয়, ‘পাশাপাশি পরিচালক এম নাজমুল ইসলাম যেহেতু প্রকাশ্যে ক্রিকেটারদের নিয়ে অপমানজনক কথা বলেছেন, তিনি প্রকাশ্যেই ক্ষমা চাইবেন বলে আশা করি। বিসিবিকে আমরা জানিয়ে দিয়েছি, তিনি প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইলে এবং তাঁর পরিচালক পদ নিয়ে প্রক্রিয়া চলমান থাকলে আমরা শুক্রবার থেকেই খেলায় ফিরতে প্রস্তুত।’
নাজমুলের প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার শর্তে শুরুতে বিসিবি সভাপতিরও আপত্তি ছিল বলে জানা গেছে। গতকাল দুপুরের সংবাদ সম্মেলনে কোয়াব সভাপতি মিঠুন দুঃখ করে বলছিলেন, আমিনুল তখন পর্যন্ত তাঁদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগই করেননি। তবে বিকেলের দিকে তাঁদের মধ্যে সেই যোগাযোগ হয়েছে। তবে কোয়াবের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে আমিনুল নাকি কোয়াব প্রতিনিধিদের বলেছিলেন, নাজমুল যা বলেছেন ভুল বলেননি। তবু এই পরিচালক বিসিবিতে তাঁর সহকর্মীদের সামনে রুদ্ধদ্বারে ক্ষমা চেয়েছেন বলে জানান আমিনুল। তবে নাজমুল প্রকাশ্যে কিছুতেই ক্ষমা চাইবেন না বলেও কোয়াবকে সাফ জানিয়ে দেন বিসিবি সভাপতি, যা ক্রিকেটারদের আবার বিগড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি করেছিল। তবে মধ্যরাতে বৈঠক থেকে বের হওয়ার পর দুই পক্ষের হাসিমুখই বলে দিচ্ছিল যে কাঙ্ক্ষিত সমাধানে তাঁরা পৌঁছেছেন।
সারা দিন দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি লেগে থাকার মধ্যে দিনভর সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ঝড় উঠেছে। অনেকে ক্রিকেটারদের বিরুদ্ধাচরণ করেছেন তো নাজমুলও সমালোচিত হয়েছেন ভীষণ। এদিকে এক অনুষ্ঠানে ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলও বিসিবি পরিচালক নাজমুলের ওপর একহাত নেন, ‘বিসিবির এক পরিচালক বাংলাদেশের সব ক্রিকেটারকে নিয়ে অপমানজনক কথা বলেছেন। ক্রিকেটের ভক্ত হিসেবে বলতে পারি, এটি দায়িত্বহীন মন্তব্য।’ বিসিবি সহসভাপতি ফারুক আহমেদ আবার খেলোয়াড়দের কর্মকাণ্ডে খুঁজে পান অন্য কিছুর গন্ধ, ‘উনি (নাজমুল) কথা বললেন বিকেল ৫টায়। আমরা (বিসিবি) বিবৃতি দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করলাম রাতে সাড়ে ৮টায়। রাত ১২টার মধ্যে নাজমুল সাহেবকে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেওয়া হলো। আমরা তো ব্যবস্থা নিচ্ছিলামই। তবু ওরা (ক্রিকেটাররা) ১৬-১৭ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাচ বয়কট করল। এতেই বোঝা যায়, এর মধ্যে অন্য কোনো উদ্দেশ্যও আছে।’ যা-ই থাকুক, শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ক্রিকেট অচলাবস্থার ঘূর্ণাবর্ত থেকে বেরিয়ে এলো।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



