ছবি: সংগৃহীত
অর্থাভাব, মানসিক চাপ আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করেই বিশ্বমঞ্চে এগিয়ে চলেছেন বাংলাদেশের ফেরদৌসি আক্তার মারিয়া। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত ‘আয়রনম্যান ৭০.৩’ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তিনি আবারও বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছেন।
গত ২২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত এই প্রতিযোগিতাটি ছিল ব্যতিক্রমী চ্যালেঞ্জে ভরা। সমুদ্রে কুমিরের উপদ্রবের কারণে নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি থাকায় সাঁতারের অংশ বাতিল করা হয়। ফলে প্রতিযোগীদের ১১১.১ কিলোমিটার পথ (সাইক্লিং ও দৌড়) সম্পন্ন করতে হয়। মারিয়া এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেন ৫ ঘণ্টা ৩২ মিনিট ২৫ সেকেন্ডে। ১৮-২৪ বছর বয়সভিত্তিক ক্যাটাগরিতে তিনি দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন এবং নারী বিভাগে ৭৬ জনের মধ্যে ৪০তম হন।
মারিয়া বলেন, ‘বিদেশের মাটিতে যখন বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়ে ফিনিশিং লাইন অতিক্রম করি, তখন চারদিকের করতালিতে মনে হয় আমার সব কষ্ট সার্থক। কিন্তু এই হাসির আড়ালে যে কতটা মানসিক যন্ত্রণা আর সীমাহীন অনিশ্চয়তা লুকিয়ে থাকে তা হয়তো অনেকেরই অজানা।’
তিনি বলেন, ‘ফিনিশ লাইনে আমার নাম যখন ভেসে ওঠে, তখন সেটি কেবল একটি সময় ছিল না, সেটি ছিল হাজারও প্রতিকূলতাকে জয় করার এক অনবদ্য দলিল। এ অর্জনের পেছনের গল্পটি ছিল চরম উৎকণ্ঠার। প্রতিযোগিতার ঠিক দুই দিন আগেও আমি জানতাম না যে আমি শ্রীলঙ্কায় যেতে পারব কি না। কোনো স্পন্সর না থাকায় যখন গভীর ডিপ্রেশনে দিন কাটছিল, তখন আমার ভাই নিজের জমানো টাকা এবং বন্ধুদের কাছ থেকে ধার করে এনে আমার হাতে দিয়ে বলেন, মারিয়া তুমি যাও; সুযোগটি হাতছাড়া করো না। পরিবারের এ ত্যাগ আর ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে যখন ট্র্যাকে নামি, তখন মনের মধ্যে সেরাটা দেওয়ার ইচ্ছার চেয়েও টাকা ম্যানেজ করার দুশ্চিন্তা বড় হয়ে দেখা দেয়। এই প্রচণ্ড আর্থিক ও মানসিক চাপের কারণে হয়তো আমি আমার সামর্থ্যের শতভাগ মাঠে ঢেলে দিতে পারি না।’
মারিয়া বলেন, ‘আমার এ সংগ্রামী যাত্রার শুরু হয়েছিল বিকেএসপির ফুটবল মাঠে। সেখানে পাওয়া কঠোর শৃঙ্খলা আর লড়াই করার মানসিকতা আজও আমার রক্তে মিশে আছে। বর্তমানে আমি ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ‘ফিজিক্যাল এডুকেশন অ্যান্ড স্পোর্টস সায়েন্স’ বিভাগে অধ্যয়ন করছি। পড়াশোনার পাশাপাশি আমি ট্রায়াথলন, পাওয়ারম্যান এবং দুর্গম ‘বাংলা চ্যানেল’ সাঁতরে পাড়ি দেওয়ার মতো কঠিন চ্যালেঞ্জগুলোতে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছি। গত ১৭ জানুয়ারি আমি ৭ ঘণ্টা ১২ মিনিটে বাংলা চ্যানেল জয় করি। তবে আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ক্ষত হয়ে আছে ২০২৫ সালের ৮ নভেম্বরে অনুষ্ঠিত স্পেনের বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপ। পর্যাপ্ত খেলাধুলার সরঞ্জামের অভাব এবং তীব্র ঠান্ডার সাথে লড়াই করার মতো প্রয়োজনীয় ‘ওয়েটস্যুট’ না থাকায় আমি মাঝপথেই হিমশীতল পানির মধ্যে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েছিলাম। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে শুধু সাহস দিয়ে বিশ্বমঞ্চে লড়াই করা যায় না, সেখানে প্রয়োজন উন্নত সরঞ্জাম ও সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা। অথচ সেই ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়েই আমি নিজেকে আবারও গড়ে তুলেছি, যার ফলশ্রুতিতে আমি সফলভাবে ১০০ কিলোমিটারের ‘আল্ট্রা ট্রেইল রান’ সম্পন্ন করতে পেরেছি।’
রংপুরের পীরগঞ্জের এক সাধারণ পরিবারের মেয়ে হিসেবে বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান বা সরকারি সাহায্য ছাড়া ট্রায়াথলনের মতো ব্যয়বহুল খেলা চালিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। মারিয়া বলেন, ‘প্রতিবার রেসের আগে আমাকে সরঞ্জামের চেয়েও বেশি টাকার চিন্তায় মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়। এভাবে চলতে থাকলে হয়তো একদিন আমিও আরও অনেক প্রতিভাবান অ্যাথলেটের মতো সময়ের অকাল গর্ভে হারিয়ে যাব। বর্তমানে আমি ‘আয়রনম্যান ৭০.৩’ বা হাফ আয়রনম্যান খেললেও আমার স্বপ্ন অনেক বড়। প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা এবং আর্থিক নিশ্চয়তা পেলে আমি ‘ফুল আয়রনম্যান’ সম্পন্ন করে দেশের জন্য এক নতুন ইতিহাস গড়তে চাই।’
তিনি যোগ করেন, ‘দেশের নতুন গণতান্ত্রিক সরকার এবং মাননীয় যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রীর কাছে আমার বিনীত আকুতি— আপনারা যদি আমার মতো লড়াই করা অ্যাথলেটদের পাশে এসে দাঁড়ান, তবে ফ্রান্সে অনুষ্ঠেয় আগামী ১২- ১৩ সেপ্টেম্বরের বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে আমি কেবল অংশগ্রহণই নয়, দেশের জন্য সেরা সম্মান বয়ে আনতে পারব। বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে আমার বিনীত অনুরোধ- আপনারা আমার এ সংগ্রামের সাথী হোন। আমি বাংলাদেশের প্রতিটি মেয়েকে বলতে চাই—আমরা ঘরবন্দি থাকার জন্য জন্মাইনি। আমি যদি এত বাধা পেরিয়ে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছাতে পারি, তবে আপনারাও পারবেন। আমি চাই না আমার বিশ্বজয়ের স্বপ্ন আর্থিক অনটনের দেয়ালে থমকে যাক। আমি চাই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে বুক ফুলিয়ে বলতে, “আমি বাংলাদেশের মেয়ে, আমরাও পারি।’
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



