ছবি: সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা শুরু হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ইরান–এ হামলার সিদ্ধান্ত ঘিরে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান, এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প–এর কঠোর বার্তা বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যবস্থাকে নতুন ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরাসরি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও কৌশলগত রুট ও রপ্তানি টার্মিনালকে ঘিরে শঙ্কাই দামের ঊর্ধ্বগতির জন্য যথেষ্ট।
উৎপাদন ও সরবরাহে ইরানের অবস্থান
ইরান প্রতিদিন প্রায় ৩ দশমিক ৩ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করে, যা বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রায় ৩ শতাংশ। ওপেকভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ইরান শীর্ষ উৎপাদনকারীদের একটি। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও দেশটি তার তেলের বড় অংশ রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছে—বিশেষ করে চীনের বেসরকারি শোধনাগারগুলোতে ছাড়মূল্যে সরবরাহের মাধ্যমে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের উৎপাদন পরিমাণ হয়তো বৈশ্বিক মোটের তুলনায় সীমিত মনে হতে পারে, কিন্তু এর ভূ-কৌশলগত অবস্থান বিশ্ব সরবরাহ ব্যবস্থায় বহুগুণ প্রভাব ফেলে। কারণ, পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ইরানের ভৌগোলিক সুবিধা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হরমুজ প্রণালি: বৈশ্বিক জ্বালানির ‘চোকপয়েন্ট’
বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত—সব বড় রপ্তানিকারক দেশই এ রুটের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানিকারক কাতার-ও একই পথ ব্যবহার করে।
তেহরান একাধিকবার হুঁশিয়ারি দিয়েছে—প্রয়োজনে তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে। যদিও বাস্তবে পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন এবং দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখা আরও কঠিন, তবু সাময়িক বিঘ্নও বৈশ্বিক বাজারে বড় ধাক্কা দিতে পারে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সামুদ্রিক নিরাপত্তা মিশন Operation Aspides সতর্ক করে জানিয়েছে, আঞ্চলিক উত্তেজনার জেরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঝুঁকি বেড়েছে। ইতোমধ্যে কিছু বড় তেল কোম্পানি ও ট্রেডিং হাউজ সাময়িকভাবে জাহাজ চলাচল স্থগিত করেছে।
খার্গ দ্বীপ ও রপ্তানি অবকাঠামো
ইরানের প্রধান রপ্তানি টার্মিনাল খার্গ দ্বীপ পারস্য উপসাগরের উত্তরে অবস্থিত। এখান থেকে প্রতিদিন দুই মিলিয়নের বেশি ব্যারেল তেল রপ্তানি হয়েছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে। দ্বীপটিতে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেলেও রপ্তানি টার্মিনাল সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না—তা নিশ্চিত নয়।
জ্বালানি বিশ্লেষক ড. আরিফুল করিম বলেন, “খার্গ দ্বীপে বড় ধরনের ক্ষতি হলে ইরানের অর্থনীতি তাৎক্ষণিকভাবে চাপে পড়বে। একই সঙ্গে বাজারে আতঙ্ক তৈরি হবে, যা দামে দ্রুত প্রতিফলিত হবে।”
ইরানের ঐতিহাসিক আবাদান শোধনাগার, বন্দর আব্বাস ও পারস্য উপসাগর স্টার রিফাইনারি—এসব স্থাপনা দেশের জ্বালানি প্রক্রিয়াজাত সক্ষমতার মেরুদণ্ড। অতীতে সীমিত হামলা হলেও রপ্তানি অবকাঠামো অক্ষত থাকায় দামের দীর্ঘমেয়াদি উল্লম্ফন দেখা যায়নি।
সরবরাহ কমলে দামের প্রভাব
অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বৈশ্বিক সরবরাহ ১ শতাংশ কমলে তেলের দাম গড়ে ৩ থেকে ৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এই অনুপাত সবসময় স্থির নয়; বাজারের মনস্তত্ত্ব, মজুত পরিস্থিতি এবং বিকল্প সরবরাহ সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে তা আরও বাড়তে পারে।
গত বছরের সংঘাতে লন্ডনে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৮০ ডলার ছাড়ালেও অবকাঠামো অক্ষত থাকায় দ্রুত স্থিতিশীলতা ফিরে আসে। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ, বাজারে আগেই ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি প্রিমিয়াম যোগ হয়েছে।
আঞ্চলিক পাল্টা হামলার আশঙ্কা
ইরান অতীতে প্রতিবেশী দেশের জ্বালানি অবকাঠামোতেও হামলার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছে। ২০১৯ সালে সৌদি আরবের আবকাইক প্রক্রিয়াজাতকরণ স্থাপনায় ড্রোন হামলায় বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ৭ শতাংশ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। সেই অভিজ্ঞতা বাজারকে এখনো সতর্ক রাখে।
নৌ-নিরাপত্তা বিশ্লেষক ক্যাপ্টেন (অব.) মাহবুব রহমান বলেন, “পুরো প্রণালি বন্ধ করা কঠিন হলেও জিপিএস জ্যামিং, সামুদ্রিক মাইন বা ড্রোন হামলার মতো সীমিত পদক্ষেপেই বড় শিপিং বিঘ্ন তৈরি করা সম্ভব। এতে বীমা খরচ বাড়বে, জাহাজ ভাড়া বাড়বে, শেষ পর্যন্ত তা ভোক্তার ওপরই পড়বে।”
বিকল্প সরবরাহ ও ওপেকের ভূমিকা
সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কিছু বিকল্প পাইপলাইন রয়েছে, যা হরমুজ এড়িয়ে আংশিক সরবরাহ দিতে পারে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, সৌদি রপ্তানি তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইরাক, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও রপ্তানি বাড়িয়েছে।
তবে বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, “বিকল্প সক্ষমতা থাকলেও পুরো ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়।” ওপেকের অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতা সীমিত, এবং তা রাজনৈতিক সমন্বয়ের ওপর নির্ভরশীল।
চীনের ফ্যাক্টর
চীন উপসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা এবং ইরানের তেলের প্রধান গন্তব্য। আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়লে বেইজিংয়ের কূটনৈতিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইরান এমন কোনো পদক্ষেপ নিতে চাইবে না যা চীনের সরাসরি অর্থনৈতিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বাজারে সম্ভাব্য দৃশ্যপট
বিশেষজ্ঞরা তিনটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট তুলে ধরছেন—
সীমিত সংঘাত, অবকাঠামো অক্ষত: দাম সাময়িক বাড়বে, পরে স্থিতিশীল হবে।
রপ্তানি টার্মিনাল বা প্রণালিতে বিঘ্ন: ব্রেন্ট ৯০–১০০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক যুদ্ধ: বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে, পরিবহন ব্যয় ও জ্বালানি বিল বৃদ্ধি পাবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্বালানি অর্থনীতির অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম বলেন, “বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এ ধরনের অস্থিরতা বাজেট ঘাটতি ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপে রূপ নিতে পারে।”
মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তেজনা এখনো পূর্ণমাত্রার সরবরাহ সংকটে রূপ নেয়নি। কিন্তু কৌশলগত রুট, রপ্তানি অবকাঠামো ও শিপিং নিরাপত্তা—এই তিন ঝুঁকি একসঙ্গে সক্রিয় থাকায় বৈশ্বিক তেলবাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই দামে ‘ঝুঁকি প্রিমিয়াম’ যুক্ত হবে—যার প্রভাব পড়বে বিশ্ব অর্থনীতি থেকে শুরু করে সাধারণ ভোক্তার দৈনন্দিন জীবনে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



