ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) গত এক বছরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ২৫ জনের বিরুদ্ধে রেড নোটিস জারি করার জন্য আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলে আবেদন করেছে। তবে এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্যে মাত্র চারজনের ক্ষেত্রে রেড নোটিস জারি হয়েছে। ওই চারজন হলেন সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজি) বেনজীর আহমেদ, এবং হত্যা মামলার পলাতক আরিফ সরকার, মহসিন মিয়া ও আওলাদ হোসেন।
এতে বোঝা যায়, ২১ জনের রেড নোটিস এখনো ঝুলে আছে। বিদেশে পলাতক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে রেড নোটিস জারি করার জন্য এনসিবি পৃথকভাবে তিনটি ধাপে আবেদন করেছে। যাদের বিরুদ্ধে আবেদন করা হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সন্তান সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, সজীব ওয়াজেদ জয়, সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত।
এছাড়া শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা আদায়ে গাফিলতি এবং দীর্ঘদিন বিদেশে অবস্থান সংক্রান্ত অভিযোগে টিএনজেড গ্রুপ, ডার্ড গ্রুপ ও রোর ফ্যাশন লিমিটেডের কর্তা-পরিচালকদের বিরুদ্ধেও রেড নোটিসের জন্য আবেদন করা হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে রেড নোটিস জারি হয়। এছাড়া হত্যার অভিযোগে পলাতক মহসিন মিয়াকে সম্প্রতি দুবাই থেকে দেশে ফেরত আনা হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (অপারেশনস) মো. রেজাউল করিম জানালেন, “বিদেশে পলাতক আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করতে ইন্টারপোলের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়। যাদের বিরুদ্ধে রেড নোটিস এখনো জারি হয়নি, তাদের আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। রেড নোটিস জারি হলে সংশ্লিষ্ট দেশের আইনশৃঙ্খলা সংস্থা তাদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেড নোটিস জারির প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিকভাবে সময়সাপেক্ষ। বাংলাদেশি আইনজীবী ও আন্তর্জাতিক অপরাধ বিষয়ক বিশ্লেষক ড. সামিউল হক মন্তব্য করেছেন, “রেড নোটিস শুধুমাত্র আবেদন দিয়ে কার্যকর হয় না। এটি ইন্টারপোলের যাচাই প্রক্রিয়া, সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। তাই এক বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রক্রিয়া স্থগিত থাকা স্বাভাবিক।”
ইন্টারন্যাশনাল ল’ বিশেষজ্ঞ এবং সাবেক ডিজি আইজি অফিসার রাশেদুল ইসলাম বলেন, “বৃহৎ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে রেড নোটিস জারি করা হলে এটি শুধু আইনি প্রয়োগ নয়, রাজনৈতিক সংবেদনশীলতাও জড়িত থাকে। এটি সময়সাপেক্ষ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রতি সংবেদনশীল। তবে আবেদনকারী দেশের পক্ষ থেকে তথ্য পূর্ণতা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা থাকলে প্রক্রিয়া দ্রুত হতে পারে।”
এদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অভিযোগসহ মোট তিনটি মামলা রয়েছে। চলতি বছরের নভেম্বর মাসে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল রেড নোটিসের আবেদন করার জন্য। দুদকও গত এক বছরে অন্তত ১০ জন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও তাদের স্বজনদের বিরুদ্ধে রেড নোটিস জারির চিঠি পাঠিয়েছে।
দুদক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, রেড নোটিস চেয়ে পাঠানো প্রতিটি চিঠিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিস্তারিত পরিচয়, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, পাসপোর্ট নম্বর, ঠিকানা এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানাসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংযুক্ত করা হয়েছে।
আইনজীবী ও আন্তর্জাতিক অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, “যত দ্রুত আন্তর্জাতিক প্রমাণাদি ও তথ্যাদি জমা দেওয়া হবে, তত দ্রুত রেড নোটিস জারি সম্ভব। তবে এটি সব সময়ই ধীর এবং সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া।”
সুতরাং, বাংলাদেশে বিদেশে পলাতক ২৫ জনের বিরুদ্ধে রেড নোটিসের প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও, আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়ার জটিলতা ও রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণে কার্যক্রমে গতি আসেনি। তবে কয়েকজনের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই নোটিস কার্যকর হওয়ায় আশা করা যায়, প্রক্রিয়া চলমান থাকলে বাকি প্রার্থীদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে বেশি দেরি হবে না।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



