ছবি: সংগৃহীত
ফিলিস্তিনের গাজায় চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাত বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার (২৯ সেপ্টেম্বর) এক বহুল আলোচিত ২০ দফা শান্তি প্রস্তাব প্রকাশ করেছেন। হোয়াইট হাউস থেকে ঘোষণা দেওয়া এই প্রস্তাব ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক রাজনৈতিক অঙ্গনে তুমুল আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পরিকল্পনাটি কার্যকর হলে তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধ বন্ধ হবে বলে দাবি করছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এর সব শর্ত মানতে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস রাজি হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পের এই শান্তি পরিকল্পনায় নীতিগত সমর্থন জানিয়েছেন। তবে হামাসের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। সংগঠনটির কর্মকর্তা মাহমুদ মারদাউই আল জাজিরাকে বলেছেন, লিখিত আকারে কোনো প্রস্তাব তারা পাননি। গাজায় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্যে এই নতুন আলোচনার খসড়া আসায় সাধারণ মানুষ দ্বিধা আর আশঙ্কার মধ্যে পড়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, উভয় পক্ষ প্রাথমিকভাবে একমত হলে যুদ্ধ তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ হবে। ইসরায়েলি সেনারা নির্দিষ্ট সীমান্তে প্রত্যাহার হবে এবং সব ধরনের সামরিক হামলা, যেমন বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণ বন্ধ থাকবে। চুক্তি গ্রহণের ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই বন্দি ইসরায়েলিদের জীবিত ও মৃতদেহ ফেরত দেওয়া হবে। পাল্টা হিসেবে ইসরায়েল গাজা থেকে আটক প্রায় দুই হাজার বন্দিকে মুক্তি দেবে, যাদের মধ্যে নারী, শিশু ও সাধারণ নাগরিকরা থাকবেন।
চুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গাজায় আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা অবাধে প্রবেশ করবে। জাতিসংঘ, রেড ক্রিসেন্ট এবং নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এ ত্রাণ সহায়তা পরিচালনা করবে। ধ্বংসস্তূপ সরানো, রাস্তা খোলা, হাসপাতাল পুনর্গঠন, এমনকি বেকারি পুনরায় চালুর মতো জরুরি কাজগুলোও এই সহায়তার অন্তর্ভুক্ত থাকবে। রাফাহ সীমান্ত ক্রসিং খোলা থাকবে, যাতে খাদ্য, ওষুধ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য সহজেই পৌঁছায়।
ট্রাম্পের প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে গাজা অস্থায়ীভাবে একটি অরাজনৈতিক ফিলিস্তিনি কমিটি দ্বারা পরিচালিত হবে। এতে যোগ্য ফিলিস্তিনি প্রতিনিধি এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা থাকবেন। এই কমিটি দৈনন্দিন প্রশাসনিক ও জনসেবা কার্যক্রম দেখভাল করবে। তদারকির দায়িত্ব থাকবে একটি নতুন আন্তর্জাতিক অস্থায়ী প্রতিষ্ঠান “পিস বোর্ড”-এর ওপর। এই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে, আর তার সঙ্গে থাকবেন বিশ্বনেতা ও অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদরা। জানা গেছে, ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারকে সম্ভাব্য সদস্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রস্তাবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গাজা পুনর্গঠন ও উন্নয়নের রূপরেখা। একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হবে, যেখানে বিনিয়োগে আগ্রহী দেশগুলোকে শুল্ক ও বাণিজ্যিক সুবিধা দেওয়া হবে। মধ্যপ্রাচ্যের আধুনিক শহরগুলোর মতো উন্নত নগরায়ণের পরিকল্পনাও করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের একটি প্যানেল এ প্রকল্পে কাজ করবে।
পরিকল্পনায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসনে হামাস বা অন্য কোনো সশস্ত্র সংগঠনের কোনো ভূমিকা থাকবে না। সব সুড়ঙ্গ, অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র ও সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করতে হবে। তবে যারা অস্ত্র সমর্পণ করবে এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে রাজি হবে, তাদের ক্ষমা করে দেওয়া হবে। হামাসের যেসব সদস্য গাজা ছেড়ে যেতে চান, তাদের নিরাপদে অন্য দেশে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।
প্রস্তাবের অন্যতম আলোচিত অংশ হলো ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলিটি ফোর্স (আইএসএফ) গঠন। যুক্তরাষ্ট্র আরব দেশ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে মিলে এই অস্থায়ী বাহিনী গাজায় মোতায়েন করবে। আইএসএফ স্থানীয় ফিলিস্তিনি পুলিশকে প্রশিক্ষণ দেবে এবং দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। ধাপে ধাপে ইসরায়েলি সেনারা তাদের দখল করা এলাকা এই বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করবে।
ট্রাম্প পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য আন্তঃধর্মীয় সংলাপ শুরু করা হবে। এর লক্ষ্য হবে ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটানো এবং বিশ্বাস গড়ে তোলা। এতে ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
যদিও এই পরিকল্পনা সৌদি আরব, জর্ডান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসরসহ কয়েকটি আরব দেশ স্বাগত জানিয়েছে, তবু অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। বিশেষ করে গাজার অস্থায়ী শাসনব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক বাহিনীর ভূমিকা এবং ট্রাম্পের নিজস্ব নেতৃত্বে গড়ে ওঠা পিস বোর্ড নিয়ে সমালোচনা চলছে। ফিলিস্তিনিদের অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এতে তাদের স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন আরও বিলম্বিত হবে।
ট্রাম্পের ২০ দফা শান্তি প্রস্তাব একদিকে গাজায় তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা জাগিয়েছে, অন্যদিকে এর ভেতর লুকিয়ে থাকা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক জটিলতা নিয়েও বিতর্ক তৈরি করেছে। এখন মূল প্রশ্ন হলো—হামাস এই প্রস্তাব গ্রহণ করবে কি না। কারণ হামাস রাজি না হলে শান্তি প্রক্রিয়া শুরু করাই অসম্ভব হয়ে পড়বে। বিশ্বের দৃষ্টি তাই এখন গাজার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের দিকে, যেখানে যুদ্ধের বিভীষিকার মাঝে মানবিকতার এক শেষ আশার আলো খুঁজছে কোটি ফিলিস্তিনি।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



