ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের কক্সবাজার উপকূল হয়ে মালয়েশিয়ায় নৌপথে মানবপাচার ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। দালালচক্র শুধু স্বেচ্ছায় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের নয়, বরং সাধারণ মানুষকেও অপহরণ করে জোরপূর্বক পাচারের চেষ্টা করছে। পাচারের শিকার হচ্ছেন নারী ও শিশুরাও। সামুদ্রিক দুর্ঘটনা, ঝড়-ঝঞ্ঝা, অনাহার কিংবা পাচারকারীদের নির্যাতনে প্রতিনিয়তই মৃত্যুর ঝুঁকি নিচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। সাম্প্রতিক সময়ে বিজিবি, র্যাব, পুলিশ ও কোস্টগার্ড বেশ কয়েক দফায় অভিযান চালিয়ে শত শত ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করেছে, তবু পাচারকারীদের কার্যক্রম থেমে নেই।
প্রতিবছর শীত মৌসুমে কক্সবাজার উপকূল, বিশেষ করে উখিয়া ও টেকনাফ অঞ্চল, এবং রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে মানবপাচারকারীদের তৎপরতা বেড়ে যায়। সাধারণত নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত সমুদ্র অপেক্ষাকৃত শান্ত থাকে, ফলে এই সময়কে লক্ষ্য করে দালালচক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু এ বছর শীত শুরুর আগেই দালালরা নড়েচড়ে বসেছে।
টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকায় পাচারকারীরা গোপন আস্তানা গড়ে তুলেছে। সেখানেই নারী-পুরুষ, শিশু ও তরুণদের জড়ো করে রাখা হয়। পরে সুবিধাজনক সময়ে তাদের ছোট নৌকায় করে সমুদ্রে নিয়ে গিয়ে বড় ট্রলারে তুলে দেওয়া হয়। গত দুই সপ্তাহে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী চারটি পৃথক অভিযানে এসব আস্তানা থেকে অন্তত ১৮৭ জনকে উদ্ধার করেছে এবং ১৬ জন দালালকে গ্রেপ্তার করেছে।
বাংলাদেশ থেকে নৌপথে মালয়েশিয়ায় মানবপাচার শুরু হয় ২০০৮ সালে। প্রথমদিকে সীমিত আকারে চললেও অল্প সময়েই এর বিস্তৃতি ঘটে কক্সবাজারের সীমান্তবর্তী উপজেলা ও রোহিঙ্গা শিবিরে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনারের (ইউএনএইচসিআর) তথ্যমতে, ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ নৌপথে পাচারের শিকার হয়েছেন। অনাহার, পানিশূন্যতা ও অমানবিক নির্যাতনে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৩ শতাধিক মানুষ।
শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দা আব্দুল হামিদ দালালদের হাতে কীভাবে আটকা পড়েছিলেন তা জানিয়েছেন। এক বন্ধুর কৌশলে তিনি পাচারকারীদের হাতে বিক্রি হয়ে যান। তাকে জানানো হয়েছিল, মালয়েশিয়া যেতে কোনো খরচ লাগবে না। কিন্তু পরে বুঝতে পারেন, দালালচক্র তাকে আটকে রেখে মালয়েশিয়াগামী ট্রলারে তুলেছে। সাগরে যাত্রাকালে তাকে নির্যাতন করে পরিবারের কাছ থেকে ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা আদায় করা হয়।
হামিদের মা খাদিজা আকতার বলেন, "ছেলেকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। পরে জানতে পারি, সে ট্রলারে মালয়েশিয়ার পথে। দালালরা টাকা না দিলে তাকে ছাড়বে না বলে জানায়। বাধ্য হয়ে আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার নিয়ে, মেয়েদের গয়না বিক্রি করে টাকা জোগাড় করি। তখনই ছেলেকে মুক্তি দেওয়া হয়।"
ভুক্তভোগীদের বর্ণনা অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়া পৌঁছাতে একজন পাচারপ্রত্যাশীকে আট ধাপে হাতবদল হতে হয়।
-
প্রথম ধাপ "তথ্যদাতা", যে স্থানীয়দের টার্গেট করে।
-
এরপর "রোড মাস্টার", যে ভুক্তভোগীকে পাহাড়ি জমাদারের কাছে পৌঁছে দেয়।
-
তারপর "জমাদার", যে নৌ-ট্রিপের মাধ্যমে ট্রলারে তোলে।
-
সাগরে পৌঁছে "ট্রলার পার্টি" তাদের আন্তর্জাতিক পাচারচক্রের হাতে হস্তান্তর করে।
বাংলাদেশ অংশে মাথাপিছু লেনদেন হয় ৩০ হাজার টাকার মতো, কিন্তু থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ায় গিয়ে সেটি দাঁড়ায় লাখ টাকায়। সর্বশেষ ধাপে ভুক্তভোগীর পরিবারকে সাড়ে তিন লাখ টাকা বা তার বেশি দিতে বাধ্য করা হয়। টাকা না পেলে নির্যাতন চলে দিনের পর দিন, এমনকি মৃত্যুও ঘটে।
প্রথমদিকে স্থানীয় তরুণরা পাচারের মূল শিকার হলেও বর্তমানে পাচারকারীদের বড় লক্ষ্য রোহিঙ্গারা। উখিয়া ও টেকনাফের শরণার্থী শিবিরে অন্তত ৫০টির বেশি দালালচক্র সক্রিয় রয়েছে। এরা সাধারণ রোহিঙ্গাদের মতো ক্যাম্পে চলাফেরা করে, প্রলোভন দেখিয়ে তাদের ক্যাম্পের বাইরে এনে পাচারকারীদের হাতে তুলে দেয়।
অনেক রোহিঙ্গা নারী তাদের স্বামীদের কাছে পৌঁছাতে দালালদের শরণাপন্ন হন। ঝুঁকিপূর্ণ নৌযাত্রায় প্রায়ই ঘটে প্রাণহানির ঘটনা।
বঙ্গোপসাগরে প্রায়ই ঘটছে ট্রলারডুবি। ২০২২ সালের ৪ অক্টোবর টেকনাফ উপকূলে রোহিঙ্গাবাহী একটি ট্রলার ডুবে যায়। তাতে ৩৪ জনকে উদ্ধার করা হলেও চারজনের মৃত্যু ঘটে। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেন্ট মার্টিনের কাছে ডুবে মারা যান চার শিশুসহ ১৯ রোহিঙ্গা। কোস্টগার্ড তখন ৭২ জনকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিল।
টেকনাফের হ্নীলা এলাকার নুরুল আমিন বলেন, "এখন ছেলে-মেয়েদের একা বের করতে ভয় লাগে। স্বেচ্ছায় যারা যাচ্ছে, তাদের কথা আলাদা। কিন্তু অপহরণ করে পাচার করার মতো অপরাধ এখন প্রতিদিন ঘটছে। চক্রগুলো দিন দিন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে।"
টেকনাফ সরকারি কলেজের অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম মনে করেন, "দেশি-বিদেশি একাধিক চক্র একসঙ্গে কাজ করছে। তাদের দমন করা না গেলে মানবপাচারের প্রবণতা আরও বেড়ে যাবে।"
বিজিবি, র্যাব ও পুলিশ মানবপাচার দমন নিয়ে সরব। টেকনাফের ২ বিজিবি অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. আশিকুর রহমান বলেন, "মানবপাচারের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছি। গত সপ্তাহেই একাধিক অভিযান চালিয়ে পাচারের চেষ্টা নস্যাৎ করেছি।"
টেকনাফ থানার ওসি আবু জায়েদ নাজমুন নুর বলেন, "মানবপাচারকারীরা যতই শক্তিশালী হোক, পুলিশ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এ চক্রে যারা জড়িত, তারা কোনোভাবেই রেহাই পাবে না।"
নৌপথে মালয়েশিয়াগামী মানবপাচার বাংলাদেশের জন্য এক ভয়াবহ সংকট। শীত মৌসুম ঘনিয়ে আসায় এই তৎপরতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মানবপাচারকারীরা নারী-শিশু পর্যন্ত ছাড়ছে না। এদের নির্মূল করতে না পারলে আগামী দিনে আরও ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে দেশ।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



