ছবি: সংগৃহীত
মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা নির্যাতন ও মানবাধিকার সংকট নিয়ে আজ (মঙ্গলবার, ৩০ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘ সদর দপ্তরে উচ্চপর্যায়ের এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বাংলাদেশ সময় রাত ৮টায় নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের হলে শুরু হবে এ বৈঠক। এতে বিশ্বের অন্তত ৭৫টি দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি অংশ নিচ্ছেন, যার মধ্যে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, কূটনীতিক এবং বিভিন্ন বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা রয়েছেন।
জাতিসংঘ আয়োজিত এই বিশেষ সম্মেলনের মূল লক্ষ্য হলো রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় নতুন করে রাজনৈতিক সমর্থন আদায় করা, আন্তর্জাতিক মনোযোগ ধরে রাখা, সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা এবং মানবাধিকার ইস্যুতে জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংকটের মূল কারণসমূহের কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করা। গত কয়েক বছরে রোহিঙ্গা সমস্যা শুধু বাংলাদেশ নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই জাতিসংঘ এই বৈঠককে একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে দেখছে।
প্রধান উপদেষ্টার উপ প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার জানিয়েছেন, বৈঠকে শুধু পরিস্থিতির সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা হবে না, বরং মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা, আশ্রয়দাতা দেশগুলোর চ্যালেঞ্জ এবং মানবিক সহায়তার কার্যকারিতা নিয়েও আলোচনা হবে। সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার থাকবে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বিষয়ে একটি বাস্তবসম্মত পথ তৈরি করা।
সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে বক্তব্য রাখবেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে রোহিঙ্গা সংকটের বহুমাত্রিক দিক তুলে ধরবেন বলে জানা গেছে। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার অগ্রগতি, রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার সুরক্ষা এবং আশ্রয়দাতা বাংলাদেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক চাপের বিষয়গুলো তার বক্তব্যে গুরুত্ব পাবে।
এ বৈঠকে বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রতিনিধিত্ব করছে। ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি)-এর পক্ষ থেকে অংশ নিচ্ছে তুরস্ক, আর উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি)-এর পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করছে কুয়েত। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আসিয়ান, কমনওয়েলথসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্লক থেকেও উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি উপস্থিত থাকবেন বলে নিশ্চিত করেছে জাতিসংঘ।
সম্মেলনের আগের দিন সোমবার (২৯ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘ ও বিভিন্ন সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে আলাদা বৈঠক করেছেন। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপো গ্রান্ডি, মিয়ানমারবিষয়ক মহাসচিবের বিশেষ দূত জুলি বিশপ এবং ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথেরিন রাসেল ঢাকায় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করে রোহিঙ্গা সংকটের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন। এসব বৈঠকে মানবিক সহায়তার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ মোকাবিলার বিষয়গুলো উঠে আসে।
প্রধান আলোচ্য বিষয়
১. রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের রূপরেখা তৈরি।
২. আশ্রয়দাতা বাংলাদেশে মানবিক সহায়তা বৃদ্ধি ও অর্থায়ন নিশ্চিত করা।
৩. আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে মিয়ানমারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
৪. সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা।
৫. শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবিকা উন্নয়ন কর্মসূচি আরও শক্তিশালী করা।
জাতিসংঘ আশা করছে, এই সম্মেলন থেকে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে নতুন আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি ও সহযোগিতা পাওয়া যাবে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, মিয়ানমারের বর্তমান অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সেনা সরকারের অনীহার কারণে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বারবার থমকে যাচ্ছে। এ কারণে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘস্থায়ী ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়ে গেছে।
আজকের জাতিসংঘ সম্মেলন তাই শুধু রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সংহতি প্রকাশ নয়, বরং সংকট সমাধানে কার্যকর রোডম্যাপ তৈরি করার এক বড় সুযোগ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই মুহূর্তে একমত হতে পারলে রোহিঙ্গা মুসলমানদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন ও মানবাধিকার সুরক্ষার পথ আরও সুগম হতে পারে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



