ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র উত্তেজনা ও নাটকীয়তার অবসান ঘটিয়ে দেশটির বহুল আলোচিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টি। আইওয়াসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্রেটিক পার্টির অপ্রত্যাশিত ও চমকপ্রদ বিজয়ের মধ্য দিয়ে মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হাতবদল হয়েছে।
আলজাজিরার সর্বশেষ প্রতিবেদন ও নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ১০০ আসনবিশিষ্ট সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জাদুকরী সংখ্যা ৫১ ইতোমধ্যে অতিক্রম করেছে ডেমোক্র্যাটরা।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্তমান প্রশাসনের নীতির বিরুদ্ধে এটি ভোটারদের এক ধরনের নীরব প্রতিবাদ কিংবা আস্থার সংকট হিসেবে প্রতিফলিত হয়েছে। অন্যদিকে, প্রতিনিধি পরিষদেও ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা শক্ত অবস্থানে রয়েছেন, যা হোয়াইট হাউসের বর্তমান নীতি ও আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ বা সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে যেকোনো দলের প্রয়োজন হয় ন্যূনতম ৫১টি আসন। সর্বশেষ ভোট গণনার প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থীরা ইতোমধ্যে ঠিক এই সংখ্যক আসনে অর্থাৎ ৫১টিতে সুনিশ্চিত বিজয় অর্জন করেছেন। এর বাইরেও আরও দুটি আসনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বেশ এগিয়ে রয়েছেন।
তুলনামূলকভাবে কোণঠাসা অবস্থায় থাকা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি এখন পর্যন্ত ঝুলিতে পুরেছে মাত্র ৩৯টি আসন। দলটির প্রার্থীরা আরও ছয়টি আসনে সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে থাকলেও একটি আসনের চূড়ান্ত ফলাফল আসার বাকি রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ১টি বা বাকি আসনগুলোর ফলাফল রিপাবলিকানদের সামগ্রিক শোচনীয় অবস্থানকে খুব একটা বদলাতে পারবে না।
কানসাস, টেক্সাস এবং সাউথ ক্যারোলাইনার মতো ঐতিহ্যগতভাবে রক্ষণশীল অঙ্গরাজ্যগুলোতেও ডেমোক্র্যাটদের এই অভাবনীয় সাফল্য মার্কিন রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে টেক্সাসের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় পর ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর এই জয় দলটির মনোবল বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সেখানে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস টালারিকো সরাসরি ট্রাম্প-সমর্থিত হেভিওয়েট প্রার্থী কেন প্যাক্সটনকে পরাজিত করে ইতিহাসের জন্ম দিয়েছেন।
পাশাপাশি, সাউথ ক্যারোলাইনায় অ্যানি অ্যান্ড্রুজ তার প্রতিদ্বন্দ্বী ডারলিন গ্রাহামকে হারিয়ে আসনটি ছিনিয়ে নিয়েছেন এবং ওহাইওতে শেরড ব্রাউনের জয়ও ডেমোক্র্যাটদের জন্য বেশ স্বস্তিদায়ক হয়েছে। তবে এই আনন্দের মাঝেও কিছু ধাক্কা খেয়েছে দলটি; যেমন মিশিগান ও মিনেসোটায় নিজেদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত দুটি আসন ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে তারা।
উচ্চকক্ষের পাশাপাশি মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ বা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে বা দখল করতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রয়োজন হয় ২১৮টি আসন। এই কক্ষের লড়াইয়েও ডেমোক্র্যাটরা এখন পর্যন্ত বেশ ভালোভাবেই এগিয়ে রয়েছেন।
সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের ১০২ জন প্রার্থী ইতোমধ্যে বিজয় নিশ্চিত করেছেন। বিপরীতে, ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির ঝুলিতে গেছে ৬০টি আসন। তবে এখনো ৮৭টি আসনের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের অপেক্ষা রয়েছে। ফলে নিম্নকক্ষের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাবে, তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য বাকি আসনগুলোর পূর্ণাঙ্গ ফলাফল আসার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
এদিকে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন কেবল রাজনৈতিক পালাবদলের জন্যই নয়, বরং রেকর্ড ভাঙা আকাশচুম্বী খরচের জন্যও ইতিহাসে নাম লিখিয়েছে। মার্কিন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মোট রাজনৈতিক ব্যয় ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। প্রার্থীদের প্রচারণায় এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ঢালার বিষয়টি মার্কিন রাজনীতিতে অর্থ ও প্রভাবের দৌড় প্রতিযোগিতাকে আবারও জোরালোভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।
নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশের পর হোয়াইট হাউসে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় কিছুটা নমনীয় সুরের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এবং জনকল্যাণে তিনি বিরোধী দলের ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে একযোগে কাজ করতে আগ্রহী।
তবে একই সঙ্গে নিজের সাংবিধানিক ক্ষমতার কথা মনে করিয়ে দিয়ে ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, ডেমোক্র্যাটরা যদি এমন কোনো নীতি বা আইন পাসের চেষ্টা করেন যা প্রশাসনের স্বার্থের পরিপন্থী, তবে প্রয়োজনে তিনি তার ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পিছপা হবেন না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিনিধি পরিষদের বর্তমান সমীকরণ ট্রাম্প প্রশাসনের বাকি মেয়াদের কার্যক্রমে বড় ধরনের আইনি ও রাজনৈতিক বাধার সৃষ্টি করতে পারে। আগামী দিনে হোয়াইট হাউস এবং কংগ্রেসের এই ক্ষমতা ভাগাভাগির লড়াই মার্কিন অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্র নীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



