ছবি: সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নতুন করে সামরিক উত্তাপ ছড়িয়ে দিয়ে দক্ষিণ ইরানের কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি স্থানে ভোরে আঘাত হেনেছে মার্কিন বাহিনী। প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বরাতে একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা নিশ্চিত করেছে যে, দেশটির সমুদ্রসীমায় যুক্তরাষ্ট্রের এই আকস্মিক সামরিক অভিযানে দফায় দফায় ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ভোরে দক্ষিণ ইরানের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত কেশম দ্বীপ এবং হরমোজগান প্রদেশের উপকূলীয় গুরুত্বপূর্ণ শহর বন্দর লেঙ্গেহতে এই সুনির্দিষ্ট হামলা চালানো হয়। তুর্কি বার্তাসংস্থা আনাদোলু এবং ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভোরের আলো ফোটার পরপরই এলাকাগুলোতে একের পর এক বিকট শব্দের বিস্ফোরণ ঘটতে শুরু করে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা 'ইরনা' (IRNA) জানিয়েছে, কৌশলগত অবস্থানগত গুরুত্বসম্পন্ন কেশম দ্বীপে অন্তত পাঁচটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, দেশটির আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা 'ফার্স' (FARS) তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, হরমোজগান প্রদেশের বন্দর লেঙ্গেহ সংলগ্ন সাগরের দিক থেকে কয়েক কিলোমিটার দূর পর্যন্ত বিস্ফোরণের ভয়াবহ শব্দ ভেসে এসেছে। তবে এই হামলায় কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কিংবা কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে কি না, সে বিষয়ে প্রাথমিকভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
এই জোড়া সামরিক অভিযানটি এমন একটি রাজনৈতিক সময়ে ঘটেছে যখন ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের সঙ্গে নতুন করে পূর্ণমাত্রার সামরিক সংঘাতের আশঙ্কাকে প্রকাশ্যে নাকচ করার চেষ্টা করছিলেন।
সোমবার (২ নভেম্বর) নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, "ইরানের সঙ্গে আমাদের যে সংঘাত বা যুদ্ধ হয়েছিল, তাতে আমরা ইতিমধ্যেই বিজয়ী হয়েছি।" তিনি আরও যোগ করেন, "গত কয়েক মাস ধরে আমরা কোনো সরাসরি বড় ধরনের যুদ্ধে অংশ নিচ্ছি না, তাই এটাকে কতখানি সংঘাত বলা যায় তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।"
তবে ট্রাম্পের এই বক্তব্য ও দাবির ঠিক বিপরীত চিত্র উঠে এসেছে সংবাদমাধ্যমগুলোর অনুসন্ধানে। মার্কিন প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বরাতে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল নিশ্চিত করেছে যে, দৃশ্যমান বড় কোনো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ না থাকলেও গত কয়েক সপ্তাহ ধরে মার্কিন বাহিনী অত্যন্ত গোপনে এবং নিখুঁতভাবে ইরানের নির্দিষ্ট কিছু কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে ছোট পরিসরে সামরিক অভিযান চালিয়ে আসছে।
মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, দক্ষিণাঞ্চলীয় এসব অভিযানকে সরাসরি কোনো নতুন আক্রমণাত্মক যুদ্ধ না বলে 'প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ' হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তারা দাবি করছেন, বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম মূল সমুদ্রপথ 'হরমুজ প্রণালি' দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে কোনো ধরনের সম্ভাব্য হামলা কিংবা মুক্ত নৌ চলাচলে হুমকি তৈরি করার সক্ষমতা থেকে ইরানকে দূরে রাখাই এই অভিযানের মূল লক্ষ্য।
মূলত ওই সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক নৌযানের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দেওয়ার অজুহাতেই যুক্তরাষ্ট্রের এয়ার-স্ট্রাইক বা ড্রোন অ্যাটাকগুলো পরিচালিত হচ্ছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান চরম উত্তেজনার পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক সময়ের বেশ কিছু সামরিক টানাপোড়েন:
-
ফেব্রুয়ারির সরাসরি সংঘাত: চলতি ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম ইরান ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ব্যাপক মাত্রায় সামরিক হামলা শুরু করে।
-
ইরানের পাল্টা পদক্ষেপ: যৌথ আক্রমণের জবাবে ইরানও পিছু হঠেনি; তারা ইসরায়েলি ভূখণ্ড এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অবস্থিত একাধিক মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টাপাল্টি মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালায়।
-
এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি: পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যস্থতায় পরবর্তীতে এপ্রিলে উভয় দেশের মধ্যে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
-
১৮ জুনের সমঝোতা ও বর্তমান স্থবিরতা: হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরবচ্ছিন্ন চলাচল সুনিশ্চিত করতে গত ১৮ জুন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু প্রণালির নিজস্ব নিরাপত্তাবলয় নিয়ন্ত্রণ ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে দুই দেশের মধ্যকার গভীর মতবিরোধের কারণে চুক্তিটির বাস্তবায়ন বর্তমানে সম্পূর্ণ থমকে গেছে।
যুদ্ধের তীব্রতা ও আকস্মিক বিমান হামলার মধ্যেও উভয় দেশের ব্যাক-চ্যানেল বা গোপন কূটনৈতিক যোগাযোগ এখনো সচল রয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের তিক্ততা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের সাহায্যে পরোক্ষভাবে প্রয়োজনীয় বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রাখা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, বন্ধুপ্রতীম দেশ কাতারের সার্বিক মধ্যস্থতায় এই গোপন কূটনৈতিক প্রক্রিয়া সচল রাখতে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি ইতিপূর্বে দোহা সফর সম্পন্ন করেছেন।
সব মিলিয়ে, দোহায় পর্দার আড়ালে গোপন কূটনৈতিক সংলাপ সচল থাকা সত্ত্বেও ভৌগোলিক সীমান্ত ও সমুদ্রসীমায় ওয়াশিংটনের তাজা বোমাবর্ষণ তেহরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতি এবং দীর্ঘমেয়াদী শান্তিপ প্রক্রিয়াকে আবার এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিল।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



