ছবি: সংগৃহীত
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আমদানি কার্গো কমপ্লেক্সে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর যখন ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব মিলছিল, তখনও কেউ ভাবেনি আগুনের ভেতর লুকিয়ে আছে আরও ভয়ংকর এক অপরাধের ছাপ। পুড়ে যাওয়া কার্গোর ছাই পেরিয়ে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু—বিমানবন্দরের স্ট্রং রুম বা ভল্ট। কারণ, বহুপর্দা নিরাপত্তা বেষ্টিত এই ভল্ট থেকে চুরি হয়েছে সাতটি আগ্নেয়াস্ত্র। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি অত্যাধুনিক এম-৪ কারবাইন রাইফেল ও ব্রাজিলের টরাস পিস্তল।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে গত রোববার (২ নভেম্বর) দুপুরে নিয়মিত পরিদর্শনের সময়। ভল্টের দরজা ভাঙা ও ট্রাংকের লক খোলা অবস্থায় দেখে কর্মকর্তারা চমকে যান। অস্ত্র গণনা করে দেখা যায়, আগে সেখানে থাকা ২১টি অস্ত্রের মধ্যে সাতটি নেই। অবশিষ্ট ১৪টি অস্ত্র উদ্ধার করে তাৎক্ষণিকভাবে বিমানবন্দর থানায় স্থানান্তর করা হয়। এরই মধ্যেই বিমানবন্দরে নেমে আসে চাঞ্চল্য, সন্দেহ, আতঙ্ক ও প্রশ্নের ঝড়—বহুস্তর নিরাপত্তার ভেতর দিয়ে এমন চুরি কীভাবে সম্ভব হলো?
ঘটনার সূত্রপাত ১৮ অক্টোবর বিকেলে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আমদানি কার্গো কমপ্লেক্সে হঠাৎ আগুন লাগে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। প্রায় ১৭ ঘণ্টা ধরে জ্বলতে থাকা এই আগুনে আমদানি করা মূল্যবান পণ্য, ব্যবসায়িক নথি, ও শুল্কপত্রের বিশাল অংশ ছাই হয়ে যায়। ব্যবসায়ীরা দাবি করেছেন, এই অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকায়।
তবে আশ্চর্যের বিষয়, ভয়াবহ ওই আগুনে স্ট্রং রুমে থাকা ভল্ট বা সুরক্ষিত কক্ষটি ছিল প্রায় অক্ষত। আগুনের তাপে কিছুটা ক্ষতি হলেও এর ভেতরের জিনিসপত্র—মূল্যবান দলিল, সোনা, হীরা, অস্ত্র—সবই তখন পর্যন্ত অক্ষত অবস্থায় ছিল। আগুন নেভানোর পর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক), শুল্ক বিভাগ ও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার উপস্থিতিতে স্ট্রং রুমটি সিলগালা করা হয়।
এই স্ট্রং রুমে আমদানি করা মূল্যবান জিনিস, শুল্ক সংক্রান্ত কাগজপত্র, ব্যবসায়িক দলিলপত্র, এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য আমদানি করা আগ্নেয়াস্ত্রও রাখা হয়। নিয়ম অনুযায়ী এই ভল্ট খুলতে হয় একাধিক সংস্থার স্বাক্ষর ও উপস্থিতিতে, যাতে নিরাপত্তা শতভাগ নিশ্চিত থাকে।
অগ্নিকাণ্ডের ছয় দিন পর, ২৪ অক্টোবর, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের নিরাপত্তা বিভাগ, বেবিচক ও একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধি স্ট্রং রুম পরিদর্শনে যান। তারা গিয়ে দেখেন—অগ্নিকাণ্ডের আগেই সিলগালা করা ভল্টের লক খোলা, ট্রাংক ভাঙা। ভিতরে তখনও ছিল ২১টি অস্ত্র, যার মধ্যে তিনটি আগুনে আংশিক পুড়ে গেছে। বাকিগুলো ছিল অক্ষত ও বাক্সবন্দী।
এই অস্ত্রগুলোর মধ্যে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এম-৪ কারবাইন রাইফেল এবং ব্রাজিলের টরাস কোম্পানির তৈরি সেমি-অটোমেটিক পিস্তল। নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানান, এম-৪ কারবাইন হচ্ছে ৫.৫৬ মিলিমিটার ক্যালিবারের গ্যাসচালিত আধুনিক রাইফেল, যা এম-১৬ এ২ রাইফেলের সংক্ষিপ্ত ও হালকা সংস্করণ। এটি সাধারণত সেনাবাহিনী ও পুলিশের সোয়াট ইউনিট ব্যবহার করে।
পরিদর্শন শেষে ভাঙা লক ও ট্রাংক মেরামত করে স্ট্রং রুমটি আবারও সিলগালা করা হয়। কিন্তু দুই সপ্তাহের মাথায় একই জায়গায় দ্বিতীয় দফায় ঘটে চুরির ঘটনা।
২ নভেম্বর, রবিবার। নিয়মিত পরিদর্শনের অংশ হিসেবে একই তিন সংস্থার কর্মকর্তারা আবার যান স্ট্রং রুমে। তখন তারা দেখতে পান—ভল্টের লক আবারও ভাঙা, ট্রাংক খোলা। অস্ত্র গণনা করে দেখা যায়, পূর্বে থাকা ২১টি অস্ত্রের মধ্যে সাতটি নেই।
এবার আর কোনো ঝুঁকি না নিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পক্ষ থেকে দ্রুত থানায় জিডি করা হয়। ২৮ অক্টোবর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সহকারী ব্যবস্থাপক (নিরাপত্তা) মো. জামাল হোসেন বিমানবন্দর থানায় এই সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
এদিকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক দল ঘটনাস্থল থেকে তালা কাটার সরঞ্জামসহ কয়েকটি আলামত সংগ্রহ করেছে। তবে আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ উদ্ধার করা যায়নি—কারণ আগুনে ক্যামেরাগুলো সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে।
বিমানবন্দর থানার উপপরিদর্শক মাইনুল ইসলাম, যিনি প্রথম জিডির তদন্তকারী কর্মকর্তা, বলেন—“আমরা প্রাথমিকভাবে কয়েকজন সন্দেহভাজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তবে সিসিটিভি ফুটেজ না থাকায় এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনো সূত্র পাওয়া যায়নি। তদন্ত চলছে, শিগগিরই বিস্তারিত জানা যাবে।”
ডিএমপির উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মহিদুল ইসলামও নিশ্চিত করেছেন যে, অস্ত্র চুরির বিষয়টি বিমানবন্দর থানায় নথিভুক্ত হয়েছে। তবে কয়টি অস্ত্র নিখোঁজ, তা তিনি নিশ্চিত করতে পারেননি।
বিমানবন্দর নিরাপত্তা সূত্র জানায়, ওই ভল্টে মূলত বাংলাদেশ পুলিশের জন্য আমদানি করা অস্ত্র এবং বৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ীদের পণ্য সংরক্ষিত ছিল। আগুনে বহু নথি পুড়ে যাওয়ায় মোট অস্ত্রের সঠিক হিসাব জানা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে চুরি হওয়া অস্ত্রের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভল্টে সোনা, হীরা, ও মূল্যবান দলিলও ছিল। কিন্তু সেগুলো অক্ষত রয়েছে। অথচ কেবল আগ্নেয়াস্ত্রই চুরি হয়েছে। এতে করে তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, চুরি ছিল লক্ষ্যভিত্তিক—অর্থাৎ পরিকল্পিতভাবে নির্দিষ্ট অস্ত্র চুরি করা হয়েছে।
আরও রহস্যজনক বিষয় হলো, আগুনের পর থেকে স্ট্রং রুমের দায়িত্বে ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। এর পরও দ্বিতীয় দফায় নিরাপত্তা ভেঙে অস্ত্র উধাও হওয়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভয়াবহ দুর্বলতা ও সম্ভাব্য ভেতরের যোগসাজশের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অগ্নিকাণ্ড ও অস্ত্রচুরির ঘটনায় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটি স্ট্রং রুমের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বিমানবন্দর নিরাপত্তা বিভাগের ভূমিকা এবং অগ্নিকাণ্ড-পরবর্তী ভল্ট সিলগালার প্রক্রিয়া—সবকিছু খতিয়ে দেখবে।
এছাড়া কার্গো ভিলেজের আশপাশে ক্ষতিগ্রস্ত সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো এখনো সচল করা হয়নি। তদন্তকারীরা বলছেন, ফুটেজ না থাকায় অপরাধীদের শনাক্ত করা কঠিন হচ্ছে। তবে নতুন করে ক্যামেরা বসানোর কাজ চলছে।
শাহজালাল বিমানবন্দরের ইতিহাসে এটি নিঃসন্দেহে এক নজিরবিহীন নিরাপত্তা ভাঙনের ঘটনা। যেখানে একদিকে হাজার কোটি টাকার আমদানি পণ্য আগুনে পুড়েছে, অন্যদিকে সুরক্ষিত ভল্ট ভেঙে সাতটি প্রাণঘাতী অস্ত্র উধাও হয়ে গেছে। এখন তদন্তকারীরা খুঁজছেন—এটি কি অগ্নিকাণ্ডের আড়ালে সাজানো পরিকল্পিত ডাকাতি, নাকি ভেতরের কারও হাত আছে এই রহস্যে?
যেভাবেই হোক, নিরাপত্তা সর্বোচ্চ থাকা উচিত এমন এক স্থানে এমন ঘটনা ঘটায় দেশের বিমানবন্দর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—আগুনের তাপে পুড়েছে কি শুধু কার্গো, নাকি গলে গেছে নিরাপত্তার আস্থা?
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



