ছবি: সংগৃহীত
ষাটের দশক থেকে বিশ্বজুড়ে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে যুদ্ধ কাভার করেছেন বিবিসির ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্স এডিটর জন সিম্পসন। তার মতে, আমার কর্মজীবনে আমি বিশ্বজুড়ে ৪০টিরও বেশি যুদ্ধের প্রতিবেদন করেছি। আমার সাংবাদিকতা জীবন শুরু ১৯৬০-এর দশকে। আমি স্নায়ুযুদ্ধকে চরম পর্যায়ে পৌঁছাতে দেখেছি।
এরপর তা কেবল অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখেছি।
কিন্তু ২০২৫ সালের মতো এতো উদ্বেগজনক বছর আমি আর কখনো দেখিনি। শুধু বেশ কয়েকটি বড় সংঘাতের কারণে নয়, বরং কারণটি হলো সেসব যুদ্ধের মধ্যে একটির রয়েছে ভূরাজনৈতিক প্রভাব—গুরুত্বের দিক থেকে যা অন্য কোনোটির সঙ্গে তুলনা করার মতোই না।
তিনি বলেন, ‘ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভলোদিমির জেলেনস্কি সতর্ক করেছেন।
তার দেশে বর্তমান সংঘাত বিশ্বযুদ্ধে রূপ নিতে পারে। প্রায় ৬০ বছর ধরে সংঘাত পর্যবেক্ষণ করার পর, আমার মনে হচ্ছে তিনি ঠিকই বলছেন।’
রাশিয়া ও ন্যাটোর মধ্যকার উত্তেজনা এখন আর কেবল ইউক্রেনে সীমাবদ্ধ নেই। পশ্চিমা দেশগুলো আশঙ্কা করছে, রাশিয়া সমুদ্রতলের ডেটা কেবল কেটে দিয়ে পশ্চিমা যোগাযোগব্যবস্থা অচল করার চেষ্টা করতে পারে।
ন্যাটোভুক্ত দেশের আকাশসীমার কাছে রুশ ড্রোনের তৎপরতা, সাইবার হামলা এবং পশ্চিমে আশ্রয় নেওয়া ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর গুপ্তহামলার অভিযোগ এই উদ্বেগকে আরো গভীর করছে।
২০১৮ সালে যুক্তরাজ্যের সলসবারিতে সাবেক রুশ গুপ্তচর সের্গেই স্ক্রিপালকে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় করা তদন্তে বলা হয়, হামলার সিদ্ধান্ত রাশিয়ার সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেই এসেছিল। এ ঘটনাই বোঝায়, সংঘাত এখন কতটা গভীরে পৌঁছেছে।
২০২৫ সাল তিনটি ভিন্ন ভিন্ন যুদ্ধের মধ্য দিয়ে গেছে। অবশ্যই ইউক্রেন আছে।
জাতিসংঘ বলেছে সেখানে ১৪ হাজার বেসামরিক লোক মারা গেছে। গাজায় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস ইসরায়েলে আক্রমণ করলে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হয় এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। সেখানে পাল্টা হামলায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু শক্তিশালী প্রতিশোধ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তারপর থেকে গাজার হামাস-পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, ৩০ হাজারের বেশি নারী ও শিশুসহ ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে ৭০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। জাতিসংঘের বিশ্বাসযোগ্য পরিসংখ্যান অনুসারেও এমনটা দেখা গেছে।

২০১৬ সালে তিয়েনআনমেন স্কয়ারে জন সিম্পসন। ছবি: বিবিসি
এদিকে সুদানে দুটি সামরিক গোষ্ঠীর মধ্যে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ চলছে। গত কয়েক বছরে সেখানে ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ লোককে তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। যদি এটি ২০২৫ সালের একমাত্র যুদ্ধ হত, তাহলে হয়তো বহির্বিশ্ব এটি বন্ধ করার জন্য আরো বেশি কিছু করত, কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।
গাজায় যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেওয়ার পর নিজ বিমানে চেপে ইসরায়েলে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমি যুদ্ধ সমাধানে বেশ দক্ষ’। এটি সত্য যে, এখন গাজায় আগের তুলনায় কম মানুষ নিহত হচ্ছে। তবে যুদ্ধবিরতি সত্বেও গাজা যুদ্ধের সুরাহা হওয়ার নিশ্চয়তা মেলে না। মধ্যপ্রাচ্যের ভয়াবহ মানবিক দুর্দশার প্রেক্ষাপটে এটি বলাও অস্বস্তিকর ঠেকে যে, ইউক্রেনের যুদ্ধ থেকে পুরোপুরি ভিন্ন এক মাত্রার।
এডিটর জন সিম্পসন বলেন, স্নায়ুযুদ্ধ বাদ দিলে বিগত বছরগুলোয় আমি যেসব যুদ্ধ নিয়ে রিপোর্ট করেছি সেগুলো নিশ্চিতভাবে নৃশংস ও বিপজ্জনক হলেও যুদ্ধের মাত্রার বিবেচনায় ছোট ছিল। সেগুলো সারা বিশ্বের শান্তির জন্য হুমকস্বরূপ হওয়ার মতো এতোটা গুরুতর ছিল না।
ভিয়েতনাম যুদ্ধ, প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ এবং কসোভোর যুদ্ধের মতো কিছু সংঘাতে কখনো কখনো মনে হয়েছিল পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ দিকে মোড় নিতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। পরাশক্তিগুলো ছোট পরিসরের ও যুগ যুগ ধরে দেখে আসা যুদ্ধের পারমাণবিক যুদ্ধে রূপ নেওয়ার বিপদ নিয়ে শঙ্কিত ছিল।
১৯৯৯ সালে কসোভোর প্রিস্টিনায় রুশ সেনারা আগে পৌঁছে যাওয়ার পর ন্যাটোর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ব্রিটিশ ও ফরাসি বাহিনীকে বিমানঘাঁটি দখলের নির্দেশ দেন। সে সময় ব্রিটিশ জেনারেল স্যার মাইক জ্যাকসন রেডিওতে চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘আপনাদের জন্য আমি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করতে যাচ্ছি না’।
ইউরোপ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রহের ঘাটতি স্পষ্ট হওয়ায়, ২০২৬ সালে সেখানে আরো আধিপত্য বিস্তারে রাশিয়া প্রস্তুত ও আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে। গত মাসের শুরুতে পুতিন বলেন, ইউরোপের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর কোনো পরিকল্পনা রাশিয়ার নেই। তবে তিনি যোগ করেন, ইউরোপ যদি চায় তাহলে রাশিয়া ‘এই মুহূর্তেই’ প্রস্তুত। পরে টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘আপনারা যদি আমাদের সম্মান করেন, আমাদের স্বার্থকে সম্মান করেন, যেমনটি আমরা সবসময় আপনাদের ক্ষেত্রে করার চেষ্টা করেছি—তাহলে কোনো সামরিক অভিযান হবে না।’
কিন্তু ইতিমধ্যেই একটি প্রধান বিশ্বশক্তি রাশিয়া এক স্বাধীন ইউরোপীয় দেশ আক্রমণ করেছে। যার ফলে বিপুল সংখ্যক বেসামরিক এবং সামরিক মৃত্যু হয়েছে। ইউক্রেন তাদের বিরুদ্ধে কমপক্ষে ২০ হাজার শিশু অপহরণের অভিযোগ এনেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে এই ঘটনায় জড়িত থাকার জন্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে, যা রাশিয়া সর্বদা অস্বীকার করে আসছে।
রাশিয়ার দাবি, ন্যাটোর সম্প্রসারণের হুমকি থেকে আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যেই তারা এই আগ্রাসন শুরু করেছে। তবে প্রেসিডেন্ট পুতিনের কাছ থেকে মিলেছে ভিন্ন ইঙ্গিত, তাহলো রাশিয়ার আঞ্চলিক প্রভাববলয় পুনঃপ্রতিষ্ঠার ইচ্ছা।
ভিন্ন আমেরিকা
সবচেয়ে নাটকীয় পরিবর্তনটি এসেছে ওয়াশিংটনে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র আজ বিশ্ব নেতৃত্ব থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে চায়। ট্রাম্প প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে ইউরোপকে ‘সভ্যতাগত বিলুপ্তির ঝুঁকিতে’ থাকা অঞ্চল হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে—যা ক্রেমলিনের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী যে নিরাপত্তা বলয়ে পশ্চিমের দেশগুলো অভ্যস্ত ছিল, তা এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের মুখে। আমেরিকার এই বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাব ভ্লাদিমির পুতিনকে নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে। ইউরোপ এখন বুঝেছে যে, আমেরিকার ওপর চিরকাল নির্ভর করার দিন হয়তো শেষ। অথচ রাশিয়ার অর্থনীতির তুলনায় ১০ গুণ বড় হয়েও ইউরোপ এখনো নিজের আত্মরক্ষায় মানসিকভাবে প্রস্তত নয়।
পুতিন একজন ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তগ্রহণকারী—এমনটাই ধারণা জন সিম্পসনের। তবে ন্যাটোতে যুক্তরাষ্ট্র সক্রিয় থাকায় সরাসরি পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি এখনো সীমিত। আপাতত
চীনের বৈশ্বিক ভূমিকা ও তাইওয়ান
চীনের প্রসঙ্গ এলে দেখা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে প্রেসিডেন্ট শি চিন পিং স্বশাসিত দ্বীপ তাইওয়ানকে নিয়ে প্রকাশ্য হুমকির ভাষা কিছুটা কমিয়েছেন।
তবে এর বিপরীতে দুই বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন সিআইএ পরিচালক উইলিয়াম বার্নস জানিয়েছিলেন, শি চিন পিং পিপলস লিবারেশন আর্মিকে ২০২৭ সালের মধ্যে তাইওয়ানে আক্রমণের জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।
চীন যদি তাইওয়ান দখলের প্রশ্নে কোনো দৃঢ় বা দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে শি চিন পিংয়ের কাছে সেটি দুর্বলতার ইঙ্গিত হিসেবে ধরা পড়তে পারে—যা তিনি মোটেও চাইবেন না। অনেকে মনে করতে পারেন, বর্তমানে চীন এতোটাই শক্তিশালী ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ যে, দেশটির নেতৃত্বকে আর অভ্যন্তরীণ জনমতের দিকে তাকাতে হয় না। কিন্তু বাস্তব চিত্রটা ঠিক তা নয়।
১৯৮৯ সালে দেঙ শাওপিংয়ের শাসনের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান এবং তার পর ঘটে যাওয়া তিয়েনআনমেন স্কয়ারের রক্তক্ষয়ী দমন-পীড়নের পর থেকেই চীনা নেতৃত্ব দেশের ভেতরের প্রতিক্রিয়া ও জনমত অত্যন্ত সতর্কভাবে এবং গভীর নজরে পর্যবেক্ষণ করে আসছে।
আমি নিজে তিয়েনআনমেন স্কয়ারে সেই ঘটনাগুলো প্রত্যক্ষ করেছি। সেখান থেকেই সংবাদ পাঠিয়েছি এবং অনেক সময় স্কয়ারের ভেতরেই অবস্থান করেছি।
১৯৮৯ সালের ৪ জুনের ঘটনা আমরা তখন যতটা সহজ মনে করেছিলাম, বাস্তবে তা ছিল অনেক বেশি জটিল। নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর সেনাবাহিনীর গুলিবর্ষণ সত্যি ঘটেছিল, তবে একই সময়ে বেইজিংসহ চীনের বিভিন্ন শহরে সাধারণ মানুষও রাস্তায় নেমে আসে। শ্রমজীবীরা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাকে কমিউনিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সুযোগ হিসেবে দেখেছিল। তখন বহু পুলিশ স্টেশন ও নিরাপত্তা দপ্তর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।
এই কারণে সেনাবাহিনী শুধু ছাত্র আন্দোলন নয়, সাধারণ মানুষের একটি বড় গণ-অভ্যুত্থানও কঠোরভাবে দমন করেছিল। সেই স্মৃতি আজও চীনা নেতৃত্বকে তাড়া করে বেড়ায়। তাই ফালুন গং, স্বাধীন চার্চ, হংকংয়ের আন্দোলন বা দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, যেকোনো বিরোধিতাই কঠোর হাতে দমন করা হয়।
১৯৮৯ সালের পর চীনের উত্থান আমি কাছ থেকে দেখেছি। একসময় শি জিনপিংয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী বো জিলাইয়ের সঙ্গেও কথা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, নির্বাচিত না হওয়া সরকার সব সময় ভেতরে ভেতরে অনিরাপত্তায় ভোগে। পরে দুর্নীতির দায়ে ২০১৩ সালে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। চীন আরো শক্তিশালী হবে এবং তাইওয়ান দখলের কৌশল স্পষ্ট করবে, যা শি জিনপিংয়ের বড় লক্ষ্য।
ইউক্রেন যুদ্ধ তখন মীমাংসিত হলেও তা পুতিনের পক্ষে যেতে পারে এবং ভবিষ্যতে তিনি নতুন ভূখণ্ড দখলের চেষ্টা করতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপ থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে পারে, আর ইউরোপের ভবিষ্যৎ চিত্র হবে উদ্বেগজনক। সম্ভাব্য সংঘাত হয়তো সরাসরি পারমাণবিক যুদ্ধ নয়, বরং কূটনীতি ও সামরিক কৌশলের জটিল লড়াই—যেখানে স্বৈরতন্ত্র আরও শক্তিশালী হতে পারে এবং পশ্চিমা জোট দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়বে। সব মিলিয়ে ২০২৬ সাল বিশ্ব রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে যাচ্ছে।
উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা
২০২৬ সাল যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তা স্পষ্ট। ইউক্রেনকে হয়তো শান্তিচুক্তিতে যেতে বাধ্য করা হবে এবং এতে বড় ভূখণ্ড ছাড়তে হতে পারে। ভবিষ্যতে পুতিন আবার আগ্রাসী হবেন কি না, তা ঠেকানোর বাস্তব নিরাপত্তা ব্যবস্থা আছে কি না, এটাই এখন ইউরোপ ও ইউক্রেনের বড় প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্র যদি সহায়তা কমায়, তবে ইউরোপের ওপর চাপ অনেক বেড়ে যাবে। পুতিন ঝুঁকি নিতে পছন্দ করেন, আর ন্যাটোতে যুক্তরাষ্ট্র থাকলেও পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনকই রয়ে গেছে।
বিবিসির নিবন্ধ থেকে অনূদিত ও সংক্ষেপিত
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



