ছবি: সংগৃহীত
চলতি বছরের শুরু থেকেই বন্ডেড ওয়্যারহাউজ লাইসেন্সধারী রপ্তানিকারকদের জন্য শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে অনলাইনে ‘ইউপি’ (ইউটিলাইজেশন পারমিশন) গ্রহণ বাধ্যতামূলক করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ লক্ষ্যে ‘কাস্টমস বন্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ (সিবিএমএস) ব্যবহার ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকবে না। বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) এনবিআরের জারি করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ায় আজ থেকে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ইউপি আবেদন গ্রহণ ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হলো।
এনবিআর মনে করছে, দেশের রপ্তানিনির্ভর শিল্পখাতের জন্য বন্ড ব্যবস্থাপনা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয়। দীর্ঘদিন ধরে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ইউপি গ্রহণ ও অনুমোদনের কারণে একদিকে যেমন সময়ক্ষেপণ হচ্ছিল, অন্যদিকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্নও উঠছিল। এসব সীমাবদ্ধতা দূর করতে এবং বন্ড ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে গত এক মাস ধরেই অনলাইন ইউপি বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি প্রস্তুতির মধ্যে ছিল বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
এ বিষয়ে গত ১ ডিসেম্বর একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে এনবিআর জানায়, বর্তমানে তাদের অধীন তিনটি কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের মাধ্যমে সিবিএমএস সফটওয়্যারের মোট ২৪টি মডিউল ব্যবহার করে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনলাইনে বিভিন্ন সেবা দেওয়া হচ্ছে। এসব মডিউলের মাধ্যমে লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়ন, কাঁচামাল আমদানি, ব্যবহার হিসাব, রপ্তানি তথ্য, অডিটসহ বন্ড সংশ্লিষ্ট প্রায় সব কার্যক্রম অনলাইনে সম্পন্ন করার সুযোগ রয়েছে।
তবে এতদিন সিবিএমএস ব্যবহার বাধ্যতামূলক না হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান পুরনো অভ্যাস অনুযায়ী ম্যানুয়াল পদ্ধতিতেই ইউপি গ্রহণ করছিল। ফলে অনলাইন ব্যবস্থার ব্যবহার কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি বলে স্বীকার করেছে এনবিআর। এই বাস্তবতায় চলতি বছরের শুরু থেকেই বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যাতে সব বন্ডেড প্রতিষ্ঠান একই প্ল্যাটফর্মে এসে কার্যক্রম পরিচালনা করে।
নতুন বিধান অনুযায়ী, বন্ডেড ওয়্যারহাউজ লাইসেন্সধারী রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি করতে চাইলে শুল্ক রেয়াত ও প্রত্যর্পণ পরিদপ্তর কর্তৃক অনুমোদিত সহগ (কনজাম্পশন কো-এফিসিয়েন্ট) অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট থেকে ইউপি গ্রহণ করতে হবে। এই ইউপি গ্রহণের জন্য এখন থেকে সিবিএমএস সফটওয়্যারের নির্ধারিত মডিউল ব্যবহার করাই একমাত্র অনুমোদিত পদ্ধতি।
এনবিআর জানিয়েছে, সিবিএমএসে ইউপি গ্রহণের মডিউলটি মূলত গত বছরের শুরুতেই চালু করা হয়েছিল। কিন্তু বছরের শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান অনলাইনের পরিবর্তে আগের মতো কাগজপত্রভিত্তিক ম্যানুয়াল প্রক্রিয়ায় ইউপি নিচ্ছিল। এতে করে একদিকে কমিশনারেটগুলোর ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি হচ্ছিল, অন্যদিকে তথ্য সংরক্ষণ ও যাচাইয়ে নানা জটিলতা দেখা দিচ্ছিল।
এই সময়ের মধ্যে ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে পাওয়া মতামত ও বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে সিস্টেমে প্রয়োজনীয় উন্নয়ন ও সংশোধন আনা হয়েছে বলে দাবি করেছে এনবিআর। সফটওয়্যারের ব্যবহার আরও সহজ ও ব্যবহারবান্ধব করতে বিভিন্ন কারিগরি আপডেট দেওয়া হয়েছে, যাতে আবেদন থেকে অনুমোদন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনে নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা যায়।
এনবিআরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অনলাইনে ইউপি গ্রহণ বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে একটি পরিপত্রও জারি করা হয়েছে। ওই পরিপত্রে সিবিএমএস ব্যবহারের পদ্ধতি, সুবিধা এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে কীভাবে অনলাইনে আবেদন ও অনুমোদন সম্পন্ন করতে হবে—সে বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এনবিআর মনে করছে, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে শুল্ক প্রশাসনের সেবা প্রদান প্রক্রিয়ায় গতি আসবে এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বহুলাংশে নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে বন্ডেড প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সেবা গ্রহণ আরও সহজ, সময়সাশ্রয়ী ও ব্যয়সাশ্রয়ী হবে।
এ ছাড়া কাঁচামালের ইনপুট ও আউটপুট সংক্রান্ত সব তথ্য সফটওয়্যারে এন্ট্রি হওয়ায় হিসাব রক্ষণ প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় ও আরও স্বচ্ছ হবে। এর ফলে পরবর্তীতে অডিট, যাচাই কিংবা কোনো অনিয়ম অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের জন্য তথ্য পাওয়া সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে কমিশনারেটে গিয়ে কাগজপত্র জমা দেওয়ার যে জটিলতা ও ভোগান্তি ছিল, অনলাইন ব্যবস্থায় তা অনেকটাই দূর হবে বলেও জানিয়েছে এনবিআর। একই সঙ্গে বন্ড সংক্রান্ত বিভিন্ন ধরনের বিরোধ, ভুল বোঝাবুঝি ও প্রশাসনিক জটিলতার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে বলে প্রত্যাশা সংস্থাটির।
সার্বিকভাবে, অনলাইন ইউপি বাধ্যতামূলক করার এই উদ্যোগকে দেশের বন্ড ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে এনবিআর। রপ্তানিখাতের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা, রাজস্ব সুরক্ষা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



