ছবি: সংগৃহীত
চলতি শিক্ষাবর্ষ থেকেই দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের একটি সংস্কার কার্যকর হতে যাচ্ছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) প্রাথমিক স্তরের (প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি) শিক্ষার্থীদের জন্য যুগোপযোগী ও শিক্ষার্থী–বান্ধব একটি নতুন মূল্যায়ন কাঠামো প্রণয়ন করেছে। এই কাঠামোর মূল লক্ষ্য হলো মুখস্থনির্ভর পরীক্ষাভিত্তিক শিক্ষা থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষার্থীদের বাস্তব দক্ষতা, চিন্তাশক্তি, ভাষা প্রয়োগ ও দৈনন্দিন শিখন অগ্রগতি মূল্যায়ন করা। আজ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় এই কাঠামোর চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার কথা রয়েছে।
দুই ধারায় মূল্যায়ন
নতুন মানবণ্টনের আওতায় প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হবে দুইটি ধারায়—ধারাবাহিক মূল্যায়ন এবং সামষ্টিক মূল্যায়ন। ধারাবাহিক মূল্যায়নে শিক্ষার্থীর প্রতিদিনের শিখন অগ্রগতি, শ্রেণিকক্ষে অংশগ্রহণ, দলগত কাজ, বাড়ির কাজ, ছোট পরীক্ষা (ক্লাস টেস্ট), ভাষাভিত্তিক দক্ষতা ও ব্যবহারিক কার্যক্রম নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। অপরদিকে সামষ্টিক মূল্যায়নের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময় শেষে শিক্ষার্থীর সামগ্রিক জ্ঞান, দক্ষতা ও অর্জনের মাত্রা যাচাই করা হবে।
এই কাঠামোতে লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষার গুরুত্ব বাড়ানো হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের শুধু বইয়ের মুখস্থ উত্তর নয়, বরং তারা কীভাবে শেখা বিষয়গুলো বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারে, সেটিও মূল্যায়নের আওতায় আসবে।
শ্রেণিভিত্তিক নম্বর বণ্টন
এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, যেসব বিষয়ে শিক্ষার্থীরা পাঠ্যপুস্তক পায়, সেসব বিষয়ে ১০০ নম্বরে মূল্যায়ন হবে। যেসব বিষয়ে শুধু শিক্ষক সহায়িকার মাধ্যমে পাঠদান করা হয় এবং পাঠ্যপুস্তক নেই, সেসব বিষয়ে মূল্যায়ন হবে ৫০ নম্বরে।
১০০ নম্বরের ক্ষেত্রে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে ধারাবাহিক মূল্যায়ন থাকবে ৫০ নম্বর এবং সামষ্টিক মূল্যায়নও ৫০ নম্বর। তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে ধারাবাহিক মূল্যায়ন ৩০ নম্বর এবং সামষ্টিক মূল্যায়ন ৭০ নম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ ছোট শ্রেণিতে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও ক্লাসভিত্তিক কাজের গুরুত্ব বেশি থাকবে, আর বড় শ্রেণিতে ধীরে ধীরে সামষ্টিক মূল্যায়নের ওজন বাড়বে।
মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতায় তৈরি
এনসিটিবি জানিয়েছে, এই নতুন মানবণ্টন ও মূল্যায়ন কাঠামো তৈরিতে মাঠপর্যায়ের শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, পিটিআই ও ইউআরসি ইনস্ট্রাক্টর, সহকারী থানা শিক্ষা কর্মকর্তা, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, এনসিটিবি এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) সদস্যদের সক্রিয়ভাবে যুক্ত করা হয়েছে। শ্রেণিকক্ষের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও দীর্ঘদিনের সমস্যা বিশ্লেষণ করেই এই কাঠামো চূড়ান্ত করা হয়েছে।
এনসিটিবির প্রধান সম্পাদক মুহাম্মদ ফাতিহুল কাদীর বলেন, “আমরা শুধু কাগজে–কলমে নয়, বাস্তবে কীভাবে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন হওয়া উচিত, সেটি মাঠপর্যায়ে যাচাই করে এই কাঠামো তৈরি করেছি। শিক্ষক ও বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে এটি চূড়ান্ত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।”
মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষা
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) আবু নূর মো. শামসুজ্জামান বলেন, “এনসিটিবি একটি খসড়া মূল্যায়ন কাঠামো তৈরি করেছে। আজ মন্ত্রণালয়ের সভায় এটি পর্যালোচনা হবে। গুরুতর কোনো আপত্তি না থাকলে এখানেই চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হতে পারে।”
বিশেষজ্ঞদের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই নতুন কাঠামো প্রাথমিক শিক্ষাকে আরও মানবিক ও কার্যকর করবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, “শিশুদের শেখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হলো প্রাথমিক স্তর। এখানে যদি আমরা শুধু লিখিত পরীক্ষার ওপর নির্ভর করি, তাহলে অনেক শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়ে। ধারাবাহিক মূল্যায়ন ও মৌখিক–ব্যবহারিক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রতিটি শিশুর শক্তি ও দুর্বলতা আলাদা করে চিহ্নিত করা যাবে।”
শিক্ষাবিদ ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, “এই কাঠামো শিক্ষার্থীদের ভয়মুক্ত করে শেখার আনন্দ ফিরিয়ে আনবে। তারা জানবে, শুধু পরীক্ষার খাতায় নয়, ক্লাসের প্রতিদিনের কাজেও তাদের মূল্যায়ন হচ্ছে।”
অভিভাবকদের আশাবাদ
অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু বলেন, “নতুন মানবণ্টনে মুখস্থনির্ভর পরীক্ষার পরিবর্তে প্রকৃত শেখা ও দক্ষতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ধারাবাহিক মূল্যায়নের ফলে শিক্ষক ও অভিভাবক উভয়েই বুঝতে পারবেন শিশু কোথায় পিছিয়ে আছে। মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষার অন্তর্ভুক্তি শিশুদের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে।”
তিনি আরও বলেন, নিয়মিত ক্লাস টেস্ট ও ভাষাভিত্তিক মূল্যায়নের কারণে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে আরও মনোযোগী হবে এবং পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ বাড়বে।
শিক্ষকদের দৃষ্টিতে
ঢাকার মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে আমরা দ্রুত বুঝতে পারব কোন শিক্ষার্থী কোন জায়গায় দুর্বল। তখনই তাকে সহায়তা দেওয়া যাবে। এতে শিখন ঘাটতি কমবে এবং পুরো শ্রেণির শিক্ষার মান উন্নত হবে।”
নোট–গাইড ব্যবসায়ীদের আপত্তি
তবে এই উদ্যোগ নিয়ে কিছু মহলের অসন্তোষও রয়েছে। বিশেষ করে নোট ও গাইড বইয়ের ব্যবসায়ীরা মুখস্থনির্ভর পরীক্ষার গুরুত্ব কমে যাওয়ায় এই পরিবর্তনের বিরোধিতা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই বিরোধিতা মূলত ব্যবসায়িক স্বার্থ থেকেই আসছে, যা শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শেখার পথে বাধা সৃষ্টি করে।
শিক্ষাব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত
সব মিলিয়ে নতুন এই মূল্যায়ন কাঠামো প্রাথমিক শিক্ষায় একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করছে। মুখস্থভিত্তিক পরীক্ষার চাপ কমিয়ে শিশুদের শেখার আনন্দ, সৃজনশীলতা ও বাস্তব জীবনে জ্ঞান প্রয়োগের সক্ষমতা গড়ে তোলাই এখন মূল লক্ষ্য। শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের আশা, সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে এই উদ্যোগ দেশের প্রাথমিক শিক্ষার মানে গুণগত পরিবর্তন আনবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরও দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



