ছবি: সংগৃহীত
দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর যশোরের বেনাপোলকে কেন্দ্র করে আবারও চাঞ্চল্যকর এক ঘটনার অভিযোগ উঠেছে। সরকারি কাস্টমস গোডাউন থেকে চুরিকৃত পণ্য পাচারের সময় বেনাপোল কাস্টম হাউসের এক সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা বিজিবির হাতে আটক হলেও পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি ঘিরে স্থানীয় ব্যবসায়ী, সচেতন মহল ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, বেনাপোল কাস্টম হাউসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) আরিফুর রহমান চৌধুরী সরকারি কাস্টমস গোডাউন থেকে চোরাই পণ্য সরিয়ে নেওয়ার সময় বিজিবির হাতে আটক হন। গত ৪ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার রাত প্রায় ৯টার দিকে বেনাপোল দিঘীরপাড় এলাকায় ফায়ার সার্ভিসের সামনে একটি প্রাইভেটকার থেকে বিপুল পরিমাণ শাড়ি, থ্রি-পিস ও বিভিন্ন ধরনের কসমেটিকস পণ্য জব্দ করা হয়। এ সময় গাড়িটিতে থাকা কাস্টমস কর্মকর্তা আরিফুর রহমানকেও আটক করা হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা দাবি করেছেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ঢাকা মেট্রো-ট-৭৫৬৪ নম্বরের একটি প্রাইভেটকারে এসব পণ্য বহন করা হচ্ছিল। বিজিবি সদস্যরা সন্দেহের ভিত্তিতে গাড়িটি থামিয়ে তল্লাশি চালালে কয়েক বস্তা পণ্য উদ্ধার করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব পণ্য বেনাপোল কাস্টমসের সরকারি গোডাউন থেকে চুরি করে বাইরে পাচার করা হচ্ছিল।
তবে পণ্য আটক করা হলেও সংশ্লিষ্ট কাস্টমস কর্মকর্তাকে পরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়রা দাবি করছেন, কাস্টমসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুরোধ বা হস্তক্ষেপের কারণে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, “রাষ্ট্রের সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব যাদের ওপর, যদি তারাই সেই সম্পদের অপব্যবহার বা পাচারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন, তাহলে সাধারণ মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রক্ষকই যদি ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, তাহলে আইন ও নৈতিকতার প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে।”
কাস্টমস সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বেনাপোল ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়ে যাত্রীদের অতিরিক্ত ব্যাগেজ সুবিধার আওতায় অনেক সময় বিভিন্ন ধরনের পণ্য দেশে প্রবেশ করে। এসব পণ্যের একটি অংশ নিয়ম অনুযায়ী জব্দ করা হয় এবং ‘ডিএম স্লিপ’ ইস্যু করে তা কাস্টমসের সরকারি গোডাউনে জমা রাখা হয়। পরবর্তীতে এসব বাজেয়াপ্ত পণ্য সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হয় এবং সেই অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হয়।
কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, গত প্রায় তিন মাস ধরে বেনাপোল কাস্টমস গোডাউনে জমা থাকা এসব বাজেয়াপ্ত পণ্যের কোনো নিলাম অনুষ্ঠিত হয়নি। এতে করে গোডাউনে বিপুল পরিমাণ পণ্য জমে রয়েছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি অসাধু চক্র সেখানে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় সূত্র ও কাস্টমস সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের অভিযোগ, গোডাউন সাইডে কর্মরত কিছু বহিরাগত কর্মী দীর্ঘদিন ধরে সেখানে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। তাদের মধ্যে রহিম ও জিসান নামের দুজনের নাম বারবার উঠে আসছে। অভিযোগ রয়েছে, তারা গোডাউন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে সরকারি পণ্য চুরি করে বাইরে বিক্রির সঙ্গে জড়িত।
অনুসন্ধানে জানা যায়, রহিম ও জিসান নামে ওই দুই ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে বেনাপোল কাস্টমস গোডাউন এলাকায় কাজ করে আসছেন। ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট থেকে বাজেয়াপ্ত পণ্য কাস্টমস হাউসের গোডাউনে পাঠানোর কাজেও তারা জড়িত। অভিযোগ রয়েছে, এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তারা একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন, যার মাধ্যমে বিভিন্ন যানবাহন ব্যবহার করে পথে মাঝেই কিছু পণ্য নামিয়ে ফেলা হয় এবং পরে তা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজারে বিক্রি করা হয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, খাতা-কলমে গোডাউনের হিসাব ঠিক থাকলেও বাস্তবে অনেক পণ্যের কোনো হদিস পাওয়া যায় না। গোডাউনে থাকা পণ্যের প্রকৃত তালিকা যাচাই করলে বিপুল পরিমাণ পণ্য গায়েব হওয়ার বিষয়টি সামনে আসতে পারে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে এনজিও কর্মী হিসেবে পরিচিত রহিম বলেন, “আরিফ স্যার ছুটিতে যাবেন বলে আমাকে একটি গাড়ি ঠিক করে দিতে বলেছিলেন। আমি তখন প্রাইভেটকার চালক কামাল ভাইয়ের গাড়ি ঠিক করে দিই। পরে শুনলাম দিঘীরপাড় এলাকায় বিজিবি গাড়িটি আটক করেছে। তখন স্যার আমাকে ফোন দিলে আমি ঘটনাস্থলে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি গাড়ি ও কয়েক বস্তা মালামাল আটক করে রাখা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “পরে কাস্টমসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের পর স্যার ছাড়া পান। এরপর আমি তাকে মোটরসাইকেলে করে কাস্টম হাউসে পৌঁছে দিই।”
এদিকে প্রাইভেটকার চালক কামাল জানান, তিনি রহিমের অনুরোধে গাড়িটি ভাড়া দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, “রহিম আমাকে বলেছিল একজন কাস্টমস অফিসারকে নিয়ে যেতে হবে। আমি সেই অনুযায়ী তাকে নিয়ে যাচ্ছিলাম। পথে দিঘীরপাড় এলাকায় বিজিবি গাড়িটি থামিয়ে তল্লাশি চালায় এবং মালামাল নামিয়ে রাখে। এমন পরিস্থিতি হবে তা আমি জানতাম না।”
এ ঘটনায় স্থানীয় দুর্নীতি দমন প্রতিরোধ কমিটির শার্শা উপজেলা কমিটির সভাপতি আক্তারুজ্জামান লিটু গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “বেনাপোল ইমিগ্রেশন দিয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে চোরাচালান ও অবৈধ পণ্য আটক করে কাস্টমসের গোডাউনে জমা রাখা হয়। সেই পণ্য যদি আবার কর্মকর্তাদের মাধ্যমে চুরি হয়ে যায়, তাহলে এটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং উদ্বেগজনক ঘটনা।”
তিনি আরও বলেন, “এর আগেও কাস্টমসের ভল্ট থেকে স্বর্ণ ও ডলার চুরির ঘটনা ঘটেছে। তখনও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠেছিল। অতীতে কাস্টমস গোডাউন থেকে পণ্য চুরির একটি সিন্ডিকেট ছিল বলে আমরা শুনেছি। এখন আবার একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসছে, যা খুবই উদ্বেগজনক।”
তিনি দ্রুত একটি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়ে বলেন, “কাস্টমস কমিশনারসহ সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে এই ঘটনার তদন্ত হওয়া উচিত। একই সঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও প্রশাসনের অন্যান্য সংস্থাকে দিয়ে অভিযান চালিয়ে বহিরাগত কর্মী রহিম ও জিসানসহ এই চক্রের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।”
এদিকে অভিযুক্ত সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা আরিফুর রহমান চৌধুরীর বক্তব্য জানতে তার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনাটি নিয়ে বেনাপোল বন্দরের ব্যবসায়ী মহল ও স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। তারা মনে করছেন, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দর হিসেবে পরিচিত বেনাপোলে এ ধরনের অভিযোগ কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতাকেই সামনে আনে না, বরং সরকারি রাজস্ব ব্যবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
সচেতন মহলের মতে, যদি সরকারি গোডাউন থেকে পণ্য চুরি হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর। এ ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা জরুরি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



