ছবি: সংগৃহীত
সড়কপথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে পরিবহন ব্যবস্থায় ভারসাম্য আনা, পণ্য পরিবহন ব্যয় হ্রাস করা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংযোগ শক্তিশালী করার লক্ষ্য নিয়ে রেলকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত বহুমুখী পরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে সরকার। এ লক্ষ্যে একটি বিস্তৃত রোডম্যাপ প্রণয়নের কাজ প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে এই কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, দেশের পরিবহন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, টেকসই এবং আধুনিক করতে রেল, নৌ ও সড়ক—এই তিন খাতকে একীভূত করার কৌশল নেওয়া হয়েছে। এতে রেলপথের আধুনিকায়ন, বিদ্যুতায়ন ও ডবল লাইন সম্প্রসারণের পাশাপাশি নৌপথের নাব্যতা বৃদ্ধি, নদীবন্দর আধুনিকীকরণ এবং জাতীয় মহাসড়কের উন্নয়নকে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়নের প্রস্তাব রয়েছে।
এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো দেশের সড়কপথের ওপর চাপ কমানো, পণ্য পরিবহনে রেলের অংশীদারি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা এবং বন্দর, শিল্পাঞ্চল ও অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর মধ্যে দ্রুত, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। বর্তমানে দেশে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের প্রায় ৮০ শতাংশই সড়কপথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কগুলোতে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, অবকাঠামো দ্রুত ক্ষয় হচ্ছে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা, ব্যয় বৃদ্ধি এবং পরিবেশগত নানা সীমাবদ্ধতাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে পরিবহন ব্যবস্থায় ভারসাম্য আনতে রেল ও নৌপথের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
রেল খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার
প্রস্তাবিত রোডম্যাপে রেল খাতকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ স্বল্প ব্যয়ে অধিক পণ্য ও যাত্রী পরিবহন, তুলনামূলক বেশি নিরাপত্তা এবং পরিবেশবান্ধব হওয়ার কারণে রেলকে ভবিষ্যতের টেকসই পরিবহন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বর্তমানে দেশে মোট রেলপথের দৈর্ঘ্য প্রায় তিন হাজার ৯৩ কিলোমিটার। দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৪৯টি জেলা রেল নেটওয়ার্কের আওতায় রয়েছে। ঢাকা–চট্টগ্রাম–কক্সবাজার–মাতারবাড়ী, চিলাহাটি–ঈশ্বরদী–খুলনা–মোংলা, ঢাকা–সিলেট–শাহবাজপুরসহ মোট ১০টি প্রধান করিডরে ট্রেন চলাচল করছে।
তবে রেল অবকাঠামোর বড় অংশই পুরোনো হওয়ায় পরিচালনায় নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের মোট ২৯৪টি লোকোমোটিভ রয়েছে। এর মধ্যে ১৬২টি মিটার গেজ এবং ১৩২টি ব্রড গেজ। যাত্রীবাহী কোচ রয়েছে এক হাজার ৮৩৮টি। এর উল্লেখযোগ্য অংশ ইতোমধ্যে অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল অতিক্রম করেছে।
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৬৯ শতাংশ মিটার গেজ এবং ২৭ শতাংশ ব্রড গেজ লোকোমোটিভ পুরোনো হয়ে গেছে। ফলে ট্রেন পরিচালনায় বিলম্ব, যান্ত্রিক ত্রুটি এবং সময়ানুবর্তিতার সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে নতুন লোকোমোটিভ, যাত্রীবাহী কোচ ও পণ্যবাহী ওয়াগন সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ রেল করিডরগুলোতে ডুয়াল গেজ ডবল লাইন নির্মাণ, পুরোনো রেললাইন ও সেতু সংস্কার এবং আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
বিদ্যুত্চালিত ট্রেন চালুর পরিকল্পনা
রেল আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে বিদ্যুতায়নকেও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী দেশের ব্যস্ততম রেলপথগুলোর মধ্যে ঢাকা–চট্টগ্রাম রুটে বিদ্যুত্চালিত ট্রেন চালু করা হবে।
এ ছাড়া ঢাকা–নারায়ণগঞ্জ এবং ঢাকা–জয়দেবপুর রুটেও বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর প্রস্তাব রয়েছে। এর মাধ্যমে রাজধানী ও আশপাশের অঞ্চলে দ্রুতগতির কমিউটার ট্রেন চালু করা সম্ভব হবে, যা নগরীর যানজট কমাতেও সহায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নৌপথ উন্নয়নে বড় উদ্যোগ
রেল খাতের পাশাপাশি নৌপরিবহন খাতেও বড় ধরনের উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নদীবেষ্টিত দেশ হওয়া সত্ত্বেও দেশের নৌপথের পূর্ণ সম্ভাবনা এখনও কাজে লাগানো যায়নি।
বর্তমানে বর্ষাকালে দেশের নৌপথের দৈর্ঘ্য প্রায় সাত হাজার ৮০০ কিলোমিটার হলেও শুষ্ক মৌসুমে তা কমে প্রায় ছয় হাজার ১০০ কিলোমিটারে নেমে আসে। নাব্যতা সংকটের কারণে অনেক নৌপথ কার্যত অচল হয়ে পড়ে।
এই সমস্যা সমাধানে কৌশলগত ড্রেজিং, নদীশাসন এবং নদীতীর সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ভবিষ্যতে দেশের নাব্য নৌপথের দৈর্ঘ্য ১০ হাজার কিলোমিটারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
পণ্য পরিবহন জোরদার করতে তিনটি বড় অভ্যন্তরীণ নৌকেন্দ্র গড়ে তোলার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। এর একটি হবে আশুগঞ্জ নদীবন্দরকে কেন্দ্র করে, যা হবিগঞ্জ ও নরসিংদীর সম্প্রসারিত শিল্পাঞ্চলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে।
দ্বিতীয় নৌকেন্দ্র গড়ে তোলা হবে পানগাঁও ইনল্যান্ড কনটেইনার টার্মিনালকে ঘিরে। এর মাধ্যমে ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের যানজট অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তৃতীয় কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে যশোরের নওয়াপাড়া নদীবন্দর এলাকায়।
এ ছাড়া পানগাঁও, আশুগঞ্জ, নগরবাড়ী ও চাঁদপুরসহ গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দরগুলোতে কাস্টমসসহ প্রয়োজনীয় সেবা চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। এসব নদীবন্দরকে সড়ক ও রেল যোগাযোগের সঙ্গে আরও শক্তভাবে যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
সমুদ্রবন্দর উন্নয়ন
পরিবহন নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করতে সমুদ্রবন্দর উন্নয়নকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও বে টার্মিনাল প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে মোংলা ও পায়রা বন্দরকে পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে, যাতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আরও দ্রুত ও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যায়।
সড়ক খাতেও সংস্কার
সড়ক খাতেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অধীনে তিন হাজার ৯৯০ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক, চার হাজার ৮৯৮ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং ১৩ হাজার ৫৮৮ কিলোমিটার জেলা সড়ক রয়েছে।
এর মধ্যে ৮৫১ কিলোমিটার চার লেন মহাসড়ক এবং ১৩৮ কিলোমিটার সার্ভিস লেনসহ ছয় লেন মহাসড়ক রয়েছে।
পরিকল্পনায় জাতীয় মহাসড়কের মানোন্নয়ন, নতুন এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ, সার্ভিস লেন সম্প্রসারণ এবং এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ জোরদারের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি সড়ক নিরাপত্তা বাড়াতে চালকদের প্রশিক্ষণ, যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা এবং ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নীতিনির্ধারকদের কাছে উপস্থাপন
পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের প্রধান কবির আহমেদ বলেন, সড়ক, রেল ও নৌ—এই তিন খাতের সমন্বয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিবহন কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে প্রতিটি মন্ত্রণালয় একই লক্ষ্য সামনে রেখে কাজ করতে পারবে এবং দেশের সামগ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন জানান, বর্তমানে পণ্য পরিবহনে রেলের অংশীদারি ৫ শতাংশেরও কম। তবে নতুন লোকোমোটিভ, কোচ ও ওয়াগন সংগ্রহ এবং কনটেইনার ট্রেন পরিচালনা বাড়ানোর মাধ্যমে এই অংশীদারি ধীরে ধীরে বাড়ানো হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ভবিষ্যতে পণ্য পরিবহনে রেলের অংশীদারি অন্তত ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের ছয় মাসের পরামর্শ ও পর্যালোচনা শেষে এই রোডম্যাপের সুপারিশগুলোর সারসংক্ষেপ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। খুব শিগগিরই এটি সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের কাছে উপস্থাপন করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



