ছবি: সংগৃহীত
রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে শিশু আইসিইউ সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রয়োজনীয় সময়ে আইসিইউ শয্যা না পাওয়ায় গত ১০ মার্চ থেকে শনিবার পর্যন্ত মাত্র ১৮ দিনে অন্তত ৫১ শিশু মারা গেছে। এসব শিশুই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আইসিইউতে ভর্তির জন্য অপেক্ষমাণ তালিকায় ছিল। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সময়মতো আইসিইউ সেবা পেলে এই শিশুদের একটি বড় অংশকে বাঁচানো সম্ভব ছিল।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গুরুতর অসুস্থ শিশুদের আইসিইউতে নেওয়ার জন্য চিকিৎসকেরা সুপারিশ করলেও পর্যাপ্ত শয্যা না থাকায় অধিকাংশ শিশুকে সাধারণ ওয়ার্ডেই রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। আইসিইউতে শয্যা না পেয়ে অনেক শিশুর অবস্থা ক্রমেই অবনতি হচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে তারা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার বাসিন্দা তমা বেগমের ১৫ মাস বয়সী সন্তান সাইফান নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে টানা ২১ দিন রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। শিশুটির শ্বাসকষ্ট বাড়তে থাকলে চিকিৎসকেরা তাকে আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু আইসিইউতে কোনো শয্যা খালি না থাকায় তাকে অপেক্ষমাণ তালিকায় রাখা হয়। সাইফানের সিরিয়াল ছিল ২২ নম্বরে। দুই দিন অপেক্ষা করেও আইসিইউতে শয্যা না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েন তার বাবা-মা।
পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে ২৪ মার্চ বিকেল ৪টার দিকে সাইফানের বাবা শিশির ইসলাম ছেলেকে নিয়ে রাজশাহী থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন। রাত ৯টার দিকে ঢাকার একটি হাসপাতালে পৌঁছে তাকে আইসিইউতে ভর্তি করানো হয়। কিন্তু সেখানে ভর্তি হওয়ার মাত্র দুই ঘণ্টা পরই মারা যায় শিশুটি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তমা বেগম বলেন, যদি রাজশাহীতেই আইসিইউতে ভর্তি করানো যেত, তাহলে হয়তো আজ তার সন্তানকে হারাতে হতো না।
এ ধরনের ঘটনা শুধু সাইফানের পরিবারেই সীমাবদ্ধ নয়। গত ১৮ দিনে আইসিইউ শয্যার অপেক্ষায় থাকা অন্তত ৫১ শিশু মারা গেছে। তাদের অধিকাংশই রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সাধারণ ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে। হাসপাতাল সূত্র জানায়, শনিবার সকাল পর্যন্ত অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকা আরও দুই শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যদিও তাদের পরিচয় জানানো হয়নি।
শনিবার বিকেলে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড ও আইসিইউ এলাকা ঘুরে দেখা যায় উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা আর হতাশায় ভরা এক করুণ দৃশ্য। অনেক অভিভাবক আইসিইউর সামনে বসে অপেক্ষা করছেন, কেউ আবার সিরিয়াল না পেয়ে চোখের পানি মুছতে মুছতে ফিরে যাচ্ছেন তাদের সন্তানের কাছে।
চার বছর বয়সী আদিব হাসান হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে ১০ নম্বর ওয়ার্ডে। ঠাণ্ডাজনিত কারণে তার শ্বাসকষ্ট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। চিকিৎসকেরা তাকে আইসিইউতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু আইসিইউতে গিয়ে তার বাবা শাহীন আলম দেখেন, তার আগে আরও ৩১ জন শিশুর নাম অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছে।
পরদিন সকালে একটি শয্যা খালি হলে ফোন করে আদিবকে আইসিইউতে নেওয়ার জন্য বলা হয়। কিন্তু তখন শিশু ওয়ার্ডের এক চিকিৎসক জানান, তার অবস্থা কিছুটা ভালো হয়েছে, তাই আপাতত আইসিইউতে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। কয়েক ঘণ্টা পর আবারও শিশুটির অবস্থার অবনতি ঘটে। তখন তাকে দ্রুত আইসিইউতে পাঠানোর কথা বলা হলেও গিয়ে দেখা যায়, সেই শয্যায় অন্য এক শিশুকে ভর্তি করা হয়েছে। ফলে আদিবের সিরিয়াল গিয়ে দাঁড়ায় ৪১ নম্বরে। অসহায় মা হোসনে আরা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, দুপুরেই যদি ছেলেকে আইসিইউতে নেওয়া হতো, তাহলে হয়তো এখন এ অবস্থা হতো না।
পাবনার চাটমোহর উপজেলার কাঠেংগা গ্রামের আড়াই বছর বয়সী নুসাইবাও আইসিইউ শয্যা না পেয়ে মারা গেছে। সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে সে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি ছিল। চিকিৎসকেরা তাকে আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু তার বাবা সবুজ আলী আইসিইউতে গিয়ে দেখেন, তার আগে আরও ২১টি শিশু অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছে। নুসাইবার সিরিয়াল ছিল ২২ নম্বরে। কিন্তু সিরিয়াল আসার আগেই গত ১২ মার্চ মারা যায় শিশুটি। মৃত্যুর চার দিন পর আইসিইউ থেকে ফোন করে জানানো হয় তার সিরিয়াল এসেছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার চার মাস বয়সী আনাস জ্বর ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১৩ মার্চ হাসপাতালে ভর্তি হয়। কয়েক দিন চিকিৎসার পরও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তাকে আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে গিয়ে তার বাবা শামির উদ্দিন দেখেন, তার আগে অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছে ৩৮ শিশু। দুই দিন অপেক্ষা করেও আইসিইউতে শয্যা না পেয়ে ১৫ মার্চ মারা যায় আনাস। পরে ১৭ মার্চ হাসপাতাল থেকে ফোন করে বলা হয়, শয্যা খালি হয়েছে। তখন শিশুটির মরদেহ ইতোমধ্যে গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়ে গেছে।
রাজশাহী নগরের তেরখাদিয়া এলাকার সাহিদও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তার শিশু সন্তান নাহিদকে আইসিইউতে নেওয়ার জন্য চিকিৎসকেরা পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু টানা তিন দিন চেষ্টা করেও আইসিইউতে শয্যা না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত তার সন্তান মারা যায়।
শনিবার বিকেলে শিশু আইসিইউর সামনে গিয়ে দেখা যায় দীর্ঘ অপেক্ষমাণ তালিকার কারণে অনেক পরিবার চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছে। কুষ্টিয়ার মীরপুর থেকে ১০ মাস বয়সী সাফোয়ানকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন তার পরিবার। শ্বাসকষ্ট ও হাম রোগে আক্রান্ত শিশুটির অবস্থা গুরুতর হওয়ায় চিকিৎসকেরা তাকে আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে তার বাবা দেখেন, তার আগে অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছে আরও ৪১ শিশু। তিনি হতাশ হয়ে বলেন, ঢাকায় নেওয়ার মতো সামর্থ্যও তাদের নেই।
একই অবস্থা সাত মাস বয়সী মোজাহিদের পরিবারেরও। তার বাবা মোস্তাক হোসেন বলেন, শ্বাসকষ্ট নিয়ে ছেলেকে হাসপাতালে আনার পর চিকিৎসকেরা আইসিইউতে নিতে বলেছেন। কিন্তু এসে দেখেন সিরিয়াল ৪২ নম্বরে। এত শিশু আগে থাকলে তার সন্তানের চিকিৎসা কীভাবে হবে—এই দুশ্চিন্তায় তারা ভেঙে পড়েছেন।
হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের একাধিক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আইসিইউ শয্যার অভাবে গত ১৮ দিনে যে অর্ধশত শিশু মারা গেছে, তাদের অন্তত ৭০ শতাংশকে সময়মতো আইসিইউতে ভর্তি করাতে পারলে বাঁচানো সম্ভব হতো।
তারা জানান, মার্চ মাসের ১ তারিখ থেকে ২৮ মার্চ সকাল পর্যন্ত শিশু আইসিইউতে মোট ১০৪ শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মারা গেছে ৩১ জন। প্রতিদিন গড়ে ৩০টির বেশি শিশু আইসিইউ শয্যার অপেক্ষায় থাকে। কিন্তু সীমিত শয্যার কারণে প্রতিদিন মাত্র ১০টি শিশুকে ভর্তি করা সম্ভব হয়।
চিকিৎসকদের মতে, রোগীর চাপ দ্রুত বাড়লেও আইসিইউ শয্যার সংখ্যা বাড়েনি। ফলে অনেক শিশুকেই সাধারণ ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। সেখানে প্রয়োজনীয় নিবিড় পরিচর্যা সম্ভব না হওয়ায় অনেক শিশু শেষ পর্যন্ত মারা যাচ্ছে।
অভিভাবকদের অভিযোগ, দেশের অন্যতম বড় এই সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত আইসিইউ সুবিধা না থাকায় তাদের সন্তানদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। তারা দ্রুত শিশু আইসিইউ শয্যার সংখ্যা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো শিশুকে শুধু শয্যার অভাবে মৃত্যুবরণ করতে না হয়।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



