ছবি: সংগৃহীত
দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে কৃষি এবং ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে খেলাপি ঋণের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকিং খাতের মোট ঋণের বিপরীতে খেলাপির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। যদিও একই সময়ে ভোক্তা ঋণের ক্ষেত্রে খেলাপির হার কিছুটা কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের ডিসেম্বর ভিত্তিক খাতভিত্তিক ঋণের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে এই চিত্র স্পষ্টভাবে উঠে আসে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল শেষে ব্যাংক খাতের মোট ঋণের প্রায় ২০ শতাংশ খেলাপি ছিল। কিন্তু এক বছরের ব্যবধানে এই হার বেড়ে ৩১ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেক ব্যবসায়ী, বিশেষ করে ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক ও বড় ব্যবসায়ী গ্রুপের কিছু উদ্যোক্তা বিদেশে অবস্থান করছেন বা ব্যবসা পরিচালনায় অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। এর ফলে অনেক ঋণ আদায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি ঋণের সুদহার বাজারভিত্তিক করা, ডলারের দর ওঠানামা এবং সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাবও খেলাপি ঋণ বাড়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
কৃষি খাতে খেলাপি ঋণের বড় উল্লম্ফন
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট ঋণের খুব সামান্য অংশই কৃষি, মৎস্য ও বনায়ন খাতে বিতরণ করা হয়। ২০২৪ সালের মতো ২০২৫ সালেও এই খাতে মোট ঋণের মাত্র ৪ দশমিক ৪০ শতাংশ রয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংক খাতের মোট ঋণের তুলনায় কৃষি খাতের অংশ তুলনামূলকভাবে খুব কম।
তবে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই সীমিত ঋণের মধ্যেই খেলাপির হার দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫ সালের শেষে কৃষি, মৎস্য ও বনায়ন খাতে বিতরণ করা ঋণের মধ্যে ২৮ দশমিক ২০ শতাংশ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। অথচ এর এক বছর আগে, অর্থাৎ ২০২৪ সালে এই খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল মাত্র ১১ দশমিক ৩০ শতাংশ।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কৃষি খাতে খেলাপি ঋণের হার প্রায় তিনগুণ বেড়ে গেছে। ব্যাংকিং খাতের অন্য কোনো খাতে এত দ্রুত খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি দেখা যায়নি।
ব্যাংকারদের মতে, কৃষি খাতে এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন একটি ব্যাংকের একজন শাখা ব্যবস্থাপক জানান, কৃষিঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়াই খেলাপি বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে কৃষিঋণ বিতরণের সময় সর্বোচ্চ সুদহার ছিল ৮ শতাংশ। কিন্তু আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর শর্ত পূরণের অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের মে মাসে সব ধরনের ঋণের সুদহার বাজারভিত্তিক করা হয়। এরপর ধাপে ধাপে সুদের হার বাড়তে থাকে এবং ঋণ আদায়ের সময় এসে তা ১২ থেকে ১৩ শতাংশে পৌঁছায়।
এই সুদের চাপ কৃষকদের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ কৃষকের আয় অনেকাংশেই নির্ভর করে ফসলের বাজারদরের ওপর, যা সব সময় স্থিতিশীল থাকে না।
উৎপাদন খরচ বাড়লেও কৃষক দাম পান না
ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কৃষি খাতে খেলাপি ঋণ বাড়ার পেছনে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিও বড় ভূমিকা রেখেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সার, বীজ, সেচ, শ্রমিক মজুরি ও পরিবহনসহ কৃষিকাজের প্রায় সব খরচই বেড়েছে। ফলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় আগের তুলনায় অনেক বেশি।
কিন্তু বিপরীতে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য সব সময় পান না। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, দুর্বল সংরক্ষণ ব্যবস্থা, বাজার ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা এবং পণ্যের দামের ওঠানামার কারণে কৃষকরা অনেক সময় লোকসানের মুখে পড়েন।
এই বাস্তবতায় অনেক কৃষকের পক্ষে ব্যাংক ঋণ সময়মতো পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে কৃষিঋণের একটি বড় অংশ খেলাপিতে পরিণত হচ্ছে।
ব্যবসা-বাণিজ্য খাতেও বড় চাপ
খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য খাত। ব্যাংক খাতের মোট ঋণের বড় একটি অংশ এই খাতে বিনিয়োগ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষে ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের ৩৩ দশমিক ৪০ শতাংশ ছিল ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে। এক বছরের ব্যবধানে এই খাতে ঋণের অংশ সামান্য বেড়ে ২০২৫ সালের শেষে ৩৩ দশমিক ৫০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, এই খাতে খেলাপি ঋণের হার খুব দ্রুত বেড়েছে। ২০২৪ সালে ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২৩ দশমিক ৪০ শতাংশ। কিন্তু এক বছরের মধ্যে তা বেড়ে ৪২ দশমিক ৫০ শতাংশে পৌঁছেছে।
অর্থাৎ এই খাতে প্রায় অর্ধেক ঋণই খেলাপিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর অনেক ব্যবসায়ী অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। কিছু বড় আমদানিকারক ব্যবসায়ী দেশ ছেড়ে চলে গেছেন বা তাদের ব্যবসা স্থবির হয়ে পড়েছে। এর ফলে ব্যাংকের কাছে নেওয়া ঋণ সময়মতো পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে ভোগ্যপণ্যের দামের ওঠানামা, আমদানি ব্যয়ের বৃদ্ধি, ডলারের দামের অস্থিরতা এবং উচ্চ সুদহার ব্যবসায়ীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
শিল্প খাতেও খেলাপি বেড়েছে
ব্যাংক খাতের মোট ঋণের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ রয়েছে শিল্প খাতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে শিল্প খাতে মোট ঋণের অংশ ছিল ৪২ দশমিক ৪০ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে তা সামান্য বেড়ে ২০২৫ সালের শেষে ৪৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
তবে এই খাতেও খেলাপি ঋণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালে শিল্প খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২২ দশমিক ৮০ শতাংশ। কিন্তু ২০২৫ সালের শেষে তা বেড়ে ৩০ দশমিক ৮০ শতাংশ হয়েছে।
এ ছাড়া নির্মাণ খাতের খেলাপি ঋণের হার ১৮ দশমিক ৩০ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৬ দশমিক ৭০ শতাংশ হয়েছে। পরিবহন খাতে খেলাপি ঋণ ১৯ দশমিক ৯০ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৩ দশমিক ২০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অন্যান্য খাতে খেলাপি ঋণের হার ৫ দশমিক ৯০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ২০ শতাংশে পৌঁছেছে।
ভোক্তা ঋণে কিছুটা স্বস্তি
অন্যদিকে ভোক্তা ঋণের ক্ষেত্রে খেলাপির হার কিছুটা কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মোট ঋণের ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ ছিল ভোক্তা ঋণ। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩ দশমিক ৩০ শতাংশ।
এক বছরের ব্যবধানে এই খাতে ঋণের পরিমাণ সামান্য কমে প্রায় সাড়ে ৮ শতাংশে নেমেছে। একই সঙ্গে খেলাপির হারও কমে ৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
ব্যাংকারদের মতে, ভোক্তা ঋণ সাধারণত ছোট পরিমাণের হয় এবং এর আদায় প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে কঠোর হওয়ায় এই খাতে খেলাপির হার তুলনামূলক কম থাকে।
ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা
ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোগ্যপণ্যের দামের বড় ধরনের ওঠানামা হয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে অনেক ব্যবসায়ী বেশি দামে পণ্য আমদানি করেছেন। কিন্তু পরে সেই পণ্য একই দামে বিক্রি করতে না পারায় তারা ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ব্যাংক খাতের মোট ঋণের বড় অংশই শিল্প এবং ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে দেওয়া হয়েছে। তাই এসব খাতে খেলাপি ঋণের হার বাড়লে সামগ্রিক খেলাপির পরিমাণও দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব ভবিষ্যতে কীভাবে পড়বে তা এখনই নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খেলাপি ঋণের লাগাম টানতে হলে ব্যাংকিং খাতে শক্ত নজরদারি, ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা, প্রকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং অর্থনীতির উৎপাদনশীল খাতগুলোকে টেকসইভাবে সহায়তা করার বিকল্প নেই। না হলে ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



