ছবি: সংগৃহীত
ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর ২০২৫ পঞ্জিকাবর্ষে নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছে। গেল বছরে বন্দরটির মোট রাজস্ব আয় দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪৬০ কোটি ১৮ লাখ টাকা, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সঙ্গে রাজস্ব উদ্বৃত্ত, কর প্রদান এবং সরকারি কোষাগারে জমার পরিমাণেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ২০২১ থেকে ২০২৫—এই পাঁচ বছরে চট্টগ্রাম বন্দরের রাজস্ব আয়ে গড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩ দশমিক ০৮ শতাংশ। একই সময়ে রাজস্ব উদ্বৃত্তের গড় প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১৮ দশমিক ৪২ শতাংশে। আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতি অনুসরণের ফলে এই সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছে বলে দাবি করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (প্রশাসন) মো. ওমর ফারুক। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সেবার মান অক্ষুণ্ন রেখে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার কারণেই বন্দরের রাজস্ব আয় ও উদ্বৃত্ত ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।
বিজ্ঞপ্তির তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরের রাজস্ব ব্যয়ের গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ৫৯ শতাংশ, যা রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এর ফলে প্রতিবছরই উদ্বৃত্ত আয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে গত দুই বছরে ব্যয় প্রবৃদ্ধি এক অঙ্কে সীমিত রাখা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দরের মোট রাজস্ব আয় ছিল ৫ হাজার ৪৬০ কোটি ১৮ লাখ টাকা। একই বছরে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৩১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ফলে ওই বছরে রাজস্ব উদ্বৃত্ত দাঁড়ায় ৩ হাজার ১৪২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০২৪ সালে বন্দরের রাজস্ব আয় ছিল ৫ হাজার ৭৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা এবং ব্যয় ছিল ২ হাজার ১৫৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। সে বছর রাজস্ব উদ্বৃত্ত হয় ২ হাজার ৯২৩ কোটি ১৭ লাখ টাকা।
আরও পেছনের বছরগুলো বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৩ সালে চট্টগ্রাম বন্দরের রাজস্ব উদ্বৃত্ত ছিল ২ হাজার ১৪৩ কোটি ১১ লাখ টাকা, ২০২২ সালে ১ হাজার ৭৩৪ কোটি ২০ লাখ টাকা এবং ২০২১ সালে ১ হাজার ৬৩৩ কোটি ২৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতিবছরই উদ্বৃত্তের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বেড়েছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বন্ধে কঠোর নীতি অনুসরণের ফলে রাজস্ব ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। ২০২৫ সালে আগের বছরের তুলনায় রাজস্ব ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ৬১ শতাংশ, আর ২০২৪ সালে ছিল ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। তবে ২০২৩ সালে ব্যয় প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ১৮ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ছিল ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ। সর্বশেষ দুই বছরে ব্যয় বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে কমিয়ে আনাকে কর্তৃপক্ষ তাদের বড় অর্জন হিসেবে দেখছে।
রাজস্ব আয়ের পাশাপাশি সরকারি কোষাগারে জমার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গত পাঁচ পঞ্জিকাবর্ষে কর, ভ্যাট ও কর-বহির্ভূত রাজস্ব (এনটিআর) হিসেবে মোট ৭ হাজার ৫৮০ কোটি ২০ লাখ টাকা সরকারের কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ জমা দেওয়া হয়েছে কর হিসেবে—৩ হাজার ৫৫৩ কোটি ৮ লাখ টাকা। এছাড়া মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) হিসেবে জমা দেওয়া হয়েছে ৩ হাজার ৪২৭ কোটি ১২ লাখ টাকা এবং কর-বহির্ভূত আয় (এনটিআর) হিসেবে জমা দেওয়া হয়েছে ৬০০ কোটি টাকা।
২০২৫ পঞ্জিকাবর্ষেই কর, ভ্যাট ও কর-বহির্ভূত আয় মিলিয়ে সরকারের কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৮০৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৫ দশমিক ৪১ শতাংশ বেশি। ২০২৪ সালে এই অঙ্ক ছিল ১ হাজার ৭১১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এর আগের বছরগুলোতে ২০২৩ সালে জমা দেওয়া হয় ১ হাজার ৫১৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা, ২০২২ সালে ১ হাজার ৩৫৯ কোটি ৫৯ লাখ টাকা এবং ২০২১ সালে ১ হাজার ১৮৫ কোটি ৪ লাখ টাকা।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, আধুনিক ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে আনার ফলে বন্দরের আর্থিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখা গেলে ভবিষ্যতে রাজস্ব আয় ও সরকারি কোষাগারে অবদানের পরিমাণ আরও বাড়বে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে কর্তৃপক্ষ।
দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম বন্দর অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। রাজস্ব আয় ও উদ্বৃত্তে এই ধারাবাহিক সাফল্য জাতীয় অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)


