ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) গত এক দশক ধরে সাতজন কর্মকর্তা ক্যাডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, যদিও ২৯তম বিসিএসে তারা নন-ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত ছিলেন—এমন তথ্য সামনে আসায় প্রশাসনে তীব্র আলোচনা ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। শুল্ক ও আবগারি ক্যাডারে চারজন এবং আয়কর ক্যাডারে তিনজন কর্মকর্তার এই অস্বাভাবিক ক্যাডারভুক্তির বিষয়টি নিয়ে এবার অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ইতোমধ্যে একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, ২৯তম বিসিএসে যেসব কর্মকর্তাকে নন-ক্যাডার হিসেবে সুপারিশ করা হয়েছিল, তাদের মধ্য থেকে সাতজনকে পরে বিশেষ প্রক্রিয়ায় ক্যাডার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তারা বর্তমানে এনবিআরের গুরুত্বপূর্ণ শুল্ক ও আয়কর অনুবিভাগে কর্মরত এবং নিয়মিত পদোন্নতি ও পদায়নও পেয়েছেন।
এই সাত কর্মকর্তার মধ্যে শুল্ক ও আবগারি ক্যাডারে কর্মরত চারজন হলেন—ফরিদা ইয়াসমিন, ফাহমিদা মাহজাবিন, রোখসানা খাতুন ও অপ্সরা বড়ুয়া। অন্যদিকে আয়কর ক্যাডারে রয়েছেন মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম, কামরুন নাহার শম্পা এবং মাকসুদা ইসলাম।
২০১১ সালের আগস্টে ২৯তম বিসিএসের মাধ্যমে শুল্ক ও আবগারি ক্যাডারে মোট ৬৮ জন কর্মকর্তা নিয়োগ পান। এর মধ্যে ৩২ জন ছিলেন মেধাতালিকাভুক্ত এবং ৩৬ জন কোটায় সুপারিশপ্রাপ্ত। তারা সবাই ওই বছরের আগস্টেই চাকরিতে যোগ দেন। তবে আশ্চর্যজনকভাবে নন-ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত চার কর্মকর্তা প্রায় আড়াই বছর পরে চাকরিতে যোগ দেন।
সে সময় ইতোমধ্যে ৩১তম বিসিএসের যোগদান প্রক্রিয়াও শেষ হয়ে গিয়েছিল। তবুও ওই চার কর্মকর্তাকে ২৯তম বিসিএসের ক্যাডার কর্মকর্তা হিসেবে গেজেটভুক্ত করা হয় এবং তাদের জ্যেষ্ঠতাও গেজেটে উল্লেখ করা হয়। ফলে যারা সময়মতো যোগ দিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন, তারা কার্যত এসব কর্মকর্তার নিচে পড়ে যান।
একই ধরনের ঘটনা ঘটে আয়কর ক্যাডারেও। সেখানে ২৯তম বিসিএসে ২৮ জন কর্মকর্তা সুপারিশপ্রাপ্ত হলেও তিনজন কর্মকর্তা প্রায় এক বছর পরে যোগদান করেন এবং গেজেটের মাধ্যমে ক্যাডার কর্মকর্তা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন।
এই অনিয়ম নিয়ে ২০১৩ সালে মোহাম্মদ ফেরদৌস হাসানের মা হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন। শুনানি শেষে আদালত ওই সাত কর্মকর্তার ক্যাডারভুক্ত নিয়োগ বাতিলের নির্দেশ দেন। কিন্তু তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সে রায় কার্যকর করেনি। ফলে তারা বহাল তবিয়তেই এনবিআরে কাজ করে যেতে থাকেন।
গত বছরের ১১ নভেম্বর হাইকোর্টের ওই রিট সংক্রান্ত বিষয়ে এনবিআরকে একটি চিঠিও দেওয়া হয়। কিন্তু প্রায় এক বছর পার হয়ে গেলেও এনবিআর এ বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।
এই চার শুল্ক কর্মকর্তার একজন ফাহমিদা মাহজাবিন গত বছরের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যান। পরে তিনি এনবিআরের কাছে স্বেচ্ছা অবসরের আবেদন করেন, যা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এনবিআর কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় বিষয়টি এবার দুদকের নজরে এসেছে। দুদক সূত্র জানায়, গত ১৪ ডিসেম্বর উপসহকারী পরিচালক মো. মনজুরুল ইসলাম মিন্টুর নেতৃত্বে একটি তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। এই টিম ইতোমধ্যে সাত কর্মকর্তাকে তলব করেছে এবং তাদের বক্তব্য গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
দুদকের কর্মকর্তারা বলছেন, কীভাবে নন-ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও ক্যাডারে অন্তর্ভুক্ত করা হলো, কে বা কারা এতে ভূমিকা রাখলেন এবং রাষ্ট্রের কতটুকু ক্ষতি হয়েছে—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনবিআরের প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে আমরা অবগত। তবে এখনই চূড়ান্তভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। খোঁজখবর নিয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি আদালতের রায় উপেক্ষা করে এই ধরনের নিয়োগ বহাল রাখা হয়, তাহলে তা প্রশাসনের শৃঙ্খলা ও নিয়োগ ব্যবস্থার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এতে বৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও মেধাবীদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয় এবং পুরো ব্যবস্থায় অনাস্থা বাড়ে।
এনবিআরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় এমন বিতর্কিত নিয়োগ রাজস্ব ব্যবস্থাপনাতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন দেখার বিষয়, দুদকের তদন্ত শেষে এই দীর্ঘদিনের বিতর্কের কী পরিণতি হয়।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



