ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান ট্যাক্স ফাঁকিকে শুধু একটি আর্থিক অপরাধ নয়, বরং ১৮ কোটি মানুষের সঙ্গে প্রতারণা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, দেশের প্রত্যেক নাগরিকের উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও কল্যাণের জন্য সরকার যে অর্থ ব্যয় করে, তার মূল উৎস হচ্ছে কর বা ট্যাক্স। তাই ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়া মানে কেবল সরকারকে নয়, দেশের প্রতিটি নাগরিককে ঠকানো।
শনিবার (১০ জানুয়ারি) রাতে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন এনবিআর চেয়ারম্যান। নারায়ণগঞ্জ ট্যাক্সেস বার অ্যাসোসিয়েশনের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন ও ২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষের অভিষেক উপলক্ষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
‘ট্যাক্স জনগণের হক’
মো. আবদুর রহমান খান বলেন, “ট্যাক্স হলো জনগণের হক। এই টাকা সরকারের কোষাগারে জমা হয় ঠিকই, কিন্তু এর প্রকৃত মালিক দেশের ১৮ কোটি মানুষ। সরকার এই টাকা দিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষার মতো খাতে ব্যয় করে। তাই যখন কেউ ট্যাক্স ফাঁকি দেয়, তখন সে আসলে ১৮ কোটি মানুষকে ফাঁকি দেয়।”
তিনি বলেন, একটি দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন অনেকটাই নির্ভর করে সঠিকভাবে কর আদায়ের ওপর। রাষ্ট্রের উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়ন, দরিদ্র মানুষের জন্য সামাজিক সহায়তা, বয়স্ক ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা কিংবা শিক্ষাবৃত্তির মতো কর্মসূচি সবই পরিচালিত হয় করের টাকায়।
ন্যায্য কর ব্যবস্থার দর্শন
এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, একটি আদর্শ সমাজে করব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত, যেখানে যে যত বেশি আয় করবে, সে তত বেশি কর দেবে। আর যে কম আয় করবে, সে কম কর দেবে। এমনকি যারা আয়ই করে না, তারা কর দেওয়ার বদলে সরকারের সহায়তা পাবে।
তিনি বলেন, “আমাদের দেশে ১৮ কোটি মানুষের পরিবার। কিন্তু সবাই তো আয় করে না। কেউ বেশি আয় করবে, কেউ কম আয় করবে। যে বেশি আয় করবে, সে বেশি কর দেবে। যে কম আয় করবে, সে কম কর দেবে। আর যে আয়ই করবে না, সে কর দেবে না—বরং সরকার তাকে সাহায্য করবে। এটিই হলো একটি ন্যায্য করব্যবস্থার ভিত্তি।”
তবে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে এখনো এই ন্যায্য কর দেওয়ার সংস্কৃতি পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অনেকেই ইচ্ছাকৃতভাবে আয় গোপন করেন, ভুয়া হিসাব দেখান কিংবা আইনের ফাঁকফোকর খুঁজে কর ফাঁকি দেন।
ট্যাক্স ফাঁকি একটি নৈতিক অপরাধ
এনবিআর চেয়ারম্যান কর ফাঁকিকে শুধু আইনি অপরাধ নয়, বরং একটি গুরুতর নৈতিক অপরাধ হিসেবেও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “আপনি যদি একজন মানুষকে ঠকান, পরে অনুশোচনা হলে তার কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইতে পারেন। যদি সে মারা যায়, তাহলে তার উত্তরসূরিদের কাছে ক্ষমা চাইতে পারেন। কিন্তু আপনি যদি দেশের ১৮ কোটি মানুষকে ঠকান, তাহলে কাদের কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইবেন? আপনি তো কখনোই সবার কাছে ক্ষমা চাইতে পারবেন না।”
তিনি আরও বলেন, কর ফাঁকি দিয়ে কেউ হয়তো সাময়িকভাবে লাভবান হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা পুরো সমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এতে সরকারের উন্নয়ন ব্যয় কমে যায়, বাজেট ঘাটতি বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আইন মানাই নাগরিকের দায়িত্ব
মো. আবদুর রহমান খান বলেন, কর দেওয়া শুধু আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, এটি একজন সচেতন নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। “আমাদের সবাইকে আইন মেনে চলতে হবে। নিজের আয় অনুযায়ী সঠিকভাবে কর দিতে হবে। তাহলেই একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব হবে,” বলেন তিনি।
তিনি করদাতা ও কর আইনজীবীদের প্রতি আহ্বান জানান, তারা যেন কর ফাঁকি রোধে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন এবং কর ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও ন্যায়সংগত করতে সহযোগিতা করেন।
অনুষ্ঠানে বিশিষ্টজনদের উপস্থিতি
নারায়ণগঞ্জ ট্যাক্সেস বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মালিক সোহেল সারোয়ারের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক আলী জিন্নাহ খানের সঞ্চালনায় আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য একেএম বদিউল আলম, ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী, নারায়ণগঞ্জ কর অঞ্চলের কর কমিশনার রওশন আখতার, নারায়ণগঞ্জ ট্যাক্স লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব অ্যাডভোকেট মো. মাজম আলী খানসহ কর প্রশাসন ও আইন পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
বক্তারা তাদের বক্তব্যে বলেন, দেশের রাজস্ব ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে কর আইনজীবী, কর কর্মকর্তা ও করদাতাদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। ট্যাক্স ফাঁকি কমাতে হলে শুধু কঠোর আইন নয়, সামাজিক সচেতনতা ও নৈতিকতার বিকাশও প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানটি পরিণত হয় কর সংস্কৃতি, নৈতিকতা ও জাতীয় দায়িত্ব নিয়ে এক ধরনের শক্তিশালী বার্তা দেওয়ার মঞ্চে—যেখানে এনবিআর চেয়ারম্যানের বক্তব্য ট্যাক্স ফাঁকি বিষয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে অনেককেই।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



