ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রশাসনিক জড়তা ও বিনিয়োগ স্থবিরতার মধ্য দিয়ে দেশের অর্থনীতি কয়েক বছর ধরেই এক ধরনের ‘স্থবির স্রোতে’ আটকে আছে। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন করে আশা জেগেছিল—রাজনৈতিক অচলাবস্থা কেটে যাবে, অর্থনীতি গতি পাবে, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ফিরবে, কর্মসংস্থান বাড়বে। কিন্তু বাস্তবে সেই পরিবর্তন আসেনি। অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য এখনো চাপে, শিল্পকারখানা চলছে কম সক্ষমতায়, আর সাধারণ মানুষের জীবনে মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত।
এই বাস্তবতার মধ্যেই সামনে জাতীয় নির্বাচন। আর সেই নির্বাচনকে ঘিরেই নতুন করে আশার আলো দেখতে শুরু করেছেন ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও অর্থনীতিবিদরা। তাঁদের ধারণা—একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এলে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা দূর হবে, নীতিনির্ধারণে ধারাবাহিকতা আসবে এবং অর্থনীতিতে আবার গতি ফিরবে।
অপেক্ষার অর্থনীতি
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অর্থনীতি মূলত ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ বা অপেক্ষা-নির্ভর অবস্থায় রয়েছে। বড় বিনিয়োগকারীরা নতুন প্রকল্পে যেতে চান না, ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে সতর্ক, আর বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সিদ্ধান্ত ঝুলিয়ে রেখেছেন। সবাই জানতে চায়—আগামী দিনে রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগ স্বভাবতই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। পাঁচ থেকে সাত বছরের রিটার্নের হিসাব করা উদ্যোক্তারা অস্থায়ী সরকারের ওপর ভর করে সিদ্ধান্ত নিতে চান না। তাঁরা এমন একটি সরকার চান, যাদের মেয়াদ আছে, নীতিগত ধারাবাহিকতা আছে এবং যাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করা নিরাপদ।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক খাতসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার শুরু করলেও এগুলোর গতি ছিল ধীর। তবে এই সময়ে বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঠেকানো গেছে, রেমিট্যান্স ও রপ্তানি বেড়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ একটি সহনীয় পর্যায়ে রাখা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু তিনি সতর্ক করে বলেন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রাজস্ব আয় বাড়েনি। মূল্যস্ফীতিও এখনো উচ্চ পর্যায়ে।
রেমিট্যান্স: অর্থনীতির অক্সিজেন
এই কঠিন সময়েও দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে উঠেছে প্রবাসী আয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স ৩২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। সদ্য সমাপ্ত বছরে এসেছে ৩২.৮২ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২২ শতাংশ বেশি।
এই অর্থই মূলত ডলারের বাজারে চাপ কমিয়েছে, আমদানি ব্যয় মেটাতে সহায়তা করেছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনে রিজার্ভ বাড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে রিজার্ভ একপর্যায়ে ৩৪ বিলিয়ন ডলার ছুঁয়েছিল, আকু বিল পরিশোধের পর তা নেমে বর্তমানে ৩২.৪৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
ডলারের বাজারে আগের মতো বিশৃঙ্খলা নেই। ব্যাংক রেট ও কার্ব মার্কেটের ব্যবধান কমেছে। এলসি খোলার খরচ কমায় আমদানিকারকেরা কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছেন। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই স্বস্তির পেছনে একটি নেতিবাচক দিকও আছে—বিনিয়োগ ও শিল্পের চাহিদা কম থাকায় আমদানিও কমেছে, ফলে ডলারের ওপর চাপও কম।
পুঁজিবাজার ও ব্যাংকিং খাতের ইঙ্গিত
দীর্ঘদিনের মন্দার পর পুঁজিবাজারেও কিছুটা প্রাণ ফিরতে শুরু করেছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সূচক ও লেনদেন বাড়ছে, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও আবার সক্রিয় হচ্ছেন। অনেকেই মনে করছেন, নির্বাচন শেষে বাজার সংস্কার ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় গতি আসবে।
অন্যদিকে ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট পুরোপুরি কাটেনি, তবে বড় ধসের আশঙ্কা আপাতত নেই। তবে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি মাত্র ৬.২৩ শতাংশে নেমে আসা স্পষ্ট করে দেয়—ব্যবসায়ীরা এখনো ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত নন।
পিএমআই বলছে ধীরগতির সম্প্রসারণ
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) দাঁড়িয়েছে ৫৪.২। এটি অর্থনীতিতে সম্প্রসারণ নির্দেশ করে, যদিও গতি খুব বেশি নয়। কৃষি, উৎপাদন ও সেবা খাত ইতিবাচক থাকলেও নির্মাণ খাত সংকোচনের দিকে, যা বড় বিনিয়োগ স্থবিরতার ইঙ্গিত দেয়।
তবে ভবিষ্যৎ ব্যবসা সূচকে সব খাতেই ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই আশাবাদের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ আসন্ন নির্বাচন।
কেন নির্বাচিত সরকার গুরুত্বপূর্ণ
ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মতে, রাজনৈতিক সরকার এলে তিনটি বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
প্রথমত, পাঁচ থেকে দশ বছরের নীতিগত পরিকল্পনা নেওয়া সম্ভব হবে।
দ্বিতীয়ত, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমে প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আসবে।
তৃতীয়ত, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে আগ্রহী হবেন।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, জাতীয় নির্বাচনই এখন সবচেয়ে বড় আশার জায়গা। স্থিতিশীলতা ফিরলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও ভোগ বাড়বে।
তবে চ্যালেঞ্জ পাহাড়সম
এই আশার মাঝেও বাস্তবতা কঠিন। রপ্তানি টানা পাঁচ মাস কমছে। ডিসেম্বরেই কমেছে ১৪ শতাংশের বেশি। মূল্যস্ফীতি এখনো ৮ শতাংশের ওপরে। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়ায় উৎপাদন খরচও বাড়ছে।
বিনিয়োগ না বাড়ায় শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কা রয়েছে। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি নিষ্পত্তি কমে যাওয়ায় নতুন কারখানা ও সম্প্রসারণ কার্যত থেমে আছে।
আস্থাই শেষ কথা
সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতি এখন এক ধরনের ‘টানটান অপেক্ষায়’। রেমিট্যান্স ও রিজার্ভ বড় ধাক্কা সামাল দিচ্ছে, পুঁজিবাজার কিছুটা নড়াচড়া শুরু করেছে, পিএমআই সূচক সম্প্রসারণ দেখাচ্ছে। কিন্তু এই সবকিছুই টেকসই হবে কি না, তা নির্ভর করছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর।
নতুন সরকার যদি দ্রুত আইন-শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে পারে, ব্যবসাবান্ধব নীতি নেয় এবং ব্যাংক ও রাজস্ব ব্যবস্থায় সংস্কার আনে, তাহলে এই আশার আলো বাস্তব অর্থনৈতিক গতি পেতে পারে। না হলে নির্বাচন-পরবর্তী প্রত্যাশাও খুব দ্রুত হতাশায় রূপ নিতে পারে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



