ছবি: সংগৃহীত
মাসখানেক ধরে সারা দেশে রান্নার গ্যাস এলপিজির বাজারে যে অস্থিরতা চলছে, তা এখন নিত্যদিনের ভোগান্তিতে রূপ নিয়েছে। রাজধানী থেকে জেলা— কোথাও নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার মিলছে না, আবার কোথাও মিলছেই না। সরকার নির্ধারিত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৩০৬ টাকা হলেও বাস্তবে ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত। কোথাও কোথাও এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ঘরে রান্না বন্ধ থাকায় মানুষ বাধ্য হয়ে বাইরের খাবার কিংবা শুকনো খাবারের ওপর নির্ভর করছে।
ঢাকার বাসিন্দা সাংবাদিক আবু সালেহ আকন বৃহস্পতিবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, নানা কৌশল অবলম্বনের পর তিনি ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনেছেন ২ হাজার ১০০ টাকায়। ওই পোস্টের মন্তব্যে আরেক ভুক্তভোগী লিটন আরশাদ লেখেন, তিন দিন ধরে তাঁর বাসায় রান্না বন্ধ। আট মাস বয়সী নাতির জন্য গরম পানিও জোগাড় করা যাচ্ছে না। এই বাস্তবতা শুধু রাজধানীতে সীমাবদ্ধ নয়; গ্রাম-শহর সর্বত্র একই চিত্র।
সংকটের মধ্যে ধর্মঘট
এই ভোগান্তির মধ্যেই গত বৃহস্পতিবার কমিশন বৃদ্ধি ও অন্যান্য দাবিতে এলপিজি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি হঠাৎ করে সারা দেশে এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ ও বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দেয়। ঢাকাসহ গাজীপুর, চট্টগ্রাম, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কার্যত গ্যাসের বাজার অচল হয়ে পড়ে। এতে সংকট আরও তীব্র হয়।
ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বৈঠকে বসতে সম্মত হলে সন্ধ্যায় ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়। ব্যবসায়ী নেতারা জানান, কমিশন বৃদ্ধিসহ কয়েকটি বিষয়ে আশ্বাস পাওয়ায় তারা কর্মসূচি স্থগিত করেছেন। তবে সাধারণ গ্রাহকের প্রশ্ন— ধর্মঘট প্রত্যাহারের পরও কি বাজারে ন্যায্য দামে গ্যাস মিলবে?
দায় চাপাচাপি
সংকটের দায় নিয়ে সরকার, অপারেটর, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের মধ্যে চলছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, পরিবেশক পর্যায়ে সরবরাহ কমে গেছে, আবার বেশি দামে কিনতে বাধ্য হওয়ায় তারা খুচরায় দাম বাড়াচ্ছেন। এলপিজি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির দাবি, দেশে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি সিলিন্ডার থাকলেও রিফিল হচ্ছে মাত্র এক কোটি ২৫ লাখ। বাকি সিলিন্ডার কার্যত অব্যবহৃত পড়ে আছে।
অন্যদিকে এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ (লোয়াব) বলছে, শীতকালে বৈশ্বিক চাহিদা বেড়ে যাওয়ায়, জাহাজ সংকট ও আর্থিক জটিলতার কারণে ডিসেম্বরে আমদানি কমেছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২৮টি কোম্পানি এলপিজি ব্যবসা করলেও মূলত ছয়টি বড় কোম্পানি অধিকাংশ গ্যাস আমদানি করে। বসুন্ধরা ও ওরিয়নের মতো বড় কয়েকটি কোম্পানি বর্তমানে আমদানি বন্ধ রাখায় বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে।
লোয়াব আরও জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান থেকে এলপিজি আমদানি ব্যাহত হচ্ছে, যা সরবরাহ সংকটের আরেকটি বড় কারণ।
সরকারের অবস্থান
জ্বালানি বিভাগ অবশ্য সংকটকে ‘কৃত্রিম’ বলে মনে করছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, বাজারে এলপিজির পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। খুচরা পর্যায়ে সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানো হয়েছে। সরকারের তথ্যমতে, নভেম্বরে এলপিজি আমদানি ছিল ১ লাখ ৫ হাজার টন, ডিসেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার টনে।
সংকট মোকাবিলায় সরকার একসঙ্গে কয়েকটি উদ্যোগ নিয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামানো এবং উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংককে এলসি খোলা ও ঋণ প্রক্রিয়া দ্রুত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি আমদানি সক্ষমতা বাড়াতে কয়েকটি কোম্পানির আবেদনে অনাপত্তি দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. ম তামিম মনে করেন, এলপিজি বাজারে এই সংকট শুধু আমদানি কমার ফল নয়। তিনি বলেন, “বাজার ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা আছে। কিছু গোষ্ঠী সুযোগ বুঝে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়েছে। স্বচ্ছ সরবরাহ ব্যবস্থার অভাব থাকলে এমন পরিস্থিতি বারবার তৈরি হবে।”
ভোক্তা অধিকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম এম শাহীন বলেন, “অপরিহার্য পণ্যের ক্ষেত্রে ধর্মঘট বা সরবরাহ বন্ধ এক ধরনের জিম্মিদশা তৈরি করে। সরকারকে কঠোরভাবে বাজার তদারকি করতে হবে। নইলে গ্রাহক বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
এক সপ্তাহে কাটবে?
লোয়াবের ভাইস প্রেসিডেন্ট হুমায়ুন রশীদ বলেন, সরকারের ঘোষণাগুলো বাস্তবায়িত হলে এক সপ্তাহের মধ্যে সিলিন্ডার সংকট কিছুটা কাটতে পারে। তবে তিনি স্বীকার করেন, ন্যায্য দামে এলপিজি মিলবে কিনা— সে নিশ্চয়তা এখনই দেওয়া যাচ্ছে না। তার মতে, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন সমন্বয় না হলে বাজার স্থিতিশীল হবে না।
অন্যদিকে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, জানুয়ারির জন্য নির্ধারিত ১ হাজার ৩০৬ টাকার বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রির কোনো যুক্তি নেই। কেউ বেশি দামে বিক্রি করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দেশজুড়ে ভোগান্তি অব্যাহত
ঢাকার আগারগাঁও, মিরপুর, শেওড়াপাড়া থেকে শুরু করে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও হবিগঞ্জ— সর্বত্র একই চিত্র। কোথাও দোকান বন্ধ, কোথাও গোপনে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে ইলেকট্রিক চুলা বা লাকড়ির চুলায় রান্না করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ দ্রুত কার্যকর না হলে এই সংকট আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। আর সংকটের সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীদের দাবি আদায়ের প্রবণতা বন্ধ না হলে এলপিজির বাজারে নৈরাজ্য নতুন কোনো বিষয় হয়ে থাকবে না।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



