ছবি: সংগৃহীত
মানুষের জীবন কেবল খাওয়া-পরা, উপার্জন আর ব্যক্তিগত স্বপ্নে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের প্রতিটি অবস্থান; পিতা, মাতা, সন্তান, স্বামী, স্ত্রী, শাসক কিংবা সাধারণ নাগরিক স্ব স্ব ক্ষেত্রে এগুলোর সবকিছুই দায়িত্বের এক একটি অধ্যায়। আমরা অনেক সময় ভাবি, দায়িত্ব কেবল ক্ষমতার সঙ্গে আসে; অথচ ইসলাম শেখায়, দায়িত্ব আসে সম্পর্কের সঙ্গে। যে মুহূর্তে কেউ কারও জীবনে প্রভাব বিস্তার করে, সেই মুহূর্ত থেকেই সে আল্লাহর দরবারে জবাবদিহির আওতায় চলে যায়।
এই জবাবদিহির ধারণাকে সবচেয়ে গভীর, সবচেয়ে স্পষ্ট ও হৃদয় কাঁপানো ভাষায় তুলে ধরেছেন মানবতার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক, আল্লাহর রাসূল (সা.)। তিনি আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন যে, কেউ দায়িত্বমুক্ত নয়, কেউই প্রশ্নের বাইরে নয়। ক্ষমতার আসনে বসা শাসক থেকে শুরু করে ঘরের ভেতরের নীরব অভিভাবক; সবাই আল্লাহর সামনে সমানভাবে জিজ্ঞাসিত হবে। এটি মানুষের বিবেক জাগিয়ে দেওয়ার এক ঐশী ঘোষণা-
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عُمَرَ أَنَّهُ سَمِعَ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ كُلُّكُمْ رَاعٍ وَمَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ فَالإِمَامُ رَاعٍ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ وَالرَّجُلُ فِي أَهْلِهِ رَاعٍ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ وَالْمَرْأَةُ فِي بَيْتِ زَوْجِهَا رَاعِيَةٌ وَهِيَ مَسْئُولَةٌ عَنْ رَعِيَّتِهَا وَالْخَادِمُ فِي مَالِ سَيِّدِهِ رَاعٍ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ قَالَ فَسَمِعْتُ هَؤُلاَءِ مِنْ رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم وَأَحْسِبُ النَّبِيَّ قَالَ وَالرَّجُلُ فِي مَالِ أَبِيهِ رَاعٍ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ فَكُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ
আবদুল্লাহ ইবনে‘উমার (রা.) হতে বর্ণিত।
তিনি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছেন, তোমরা প্রত্যেকেই রক্ষক। আর প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হবে। নেতা (ইমাম) একজন রক্ষক, সে তার অধীনস্থদের সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হবে। পুরুষ তার পরিবারের রক্ষক, সে তার পরিবারের লোকজন সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হবে।
স্ত্রী তার স্বামীর ঘরের রক্ষক, তাকে তার রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। ইবনু ‘উমার (রা.) বলেন, আমি এ সকলই আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে শুনেছি। আমার মনে হয় তিনি এ কথাও বলেছেন, ছেলে তার পিতার সম্পত্তির রক্ষক এবং সে জিজ্ঞাসিত হবে তার রক্ষণাবেক্ষণ সম্বন্ধে। অতএব, তোমরা প্রত্যেকেই রক্ষক এবং তোমাদের প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের ব্যাপারে প্রশ্নের সম্মুখীন হবে। (বুখারি, হাদিস : ২৪০৯)
হাদিসের ব্যাখ্যা
এই হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) দায়িত্ববোধের এক সর্বজনীন মানচিত্র এঁকে দিয়েছেন।
এখানে “রক্ষক” (راعي) শব্দটি কেবল পাহারাদার অর্থে নয়; বরং দেখাশোনা, ন্যায়বিচার, কল্যাণ নিশ্চিত করা ও অবহেলা থেকে রক্ষা করার পূর্ণ দায়িত্ব বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে।
হাদিসের শুরুতেই রাসূল (সা.) বলেছেন, “তোমরা প্রত্যেকেই রক্ষক”। অর্থাৎ ইসলাম কোনো মানুষকে দায়িত্বহীন হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। কেউ রাষ্ট্র পরিচালনা করুক বা একটি পরিবার পরিচালনা করুক; প্রত্যেকের ওপর আল্লাহর অর্পিত আমানত রয়েছে।
এরপর পর্যায়ক্রমে তিনি দায়িত্বের স্তরগুলো স্পষ্ট করেছেন। শাসক বা নেতা তার অধীন জনগণের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও কল্যাণ নিশ্চিত করবে। এ ব্যাপারে সে আল্লাহর কাছে প্রশ্নের সম্মুখীন হবে। পরিবারের কর্তা শুধু উপার্জনকারী নন; বরং পরিবারের ঈমান, নৈতিকতা ও অধিকার রক্ষার দায়ও তাঁর ওপর ন্যস্ত। স্ত্রীকে ঘরের রক্ষক হিসেবে উল্লেখ করে ইসলাম নারীর ভূমিকার মর্যাদা ও গুরুত্বকে অত্যন্ত সম্মানজনকভাবে তুলে ধরেছে। সন্তানকেও সম্পদের রক্ষক হিসেবে উল্লেখ করে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে যে, বিশ্বাসযোগ্যতা ও আমানতদারিতা বয়সের সঙ্গে নয়, দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত।
হাদিসের শেষাংশে রাসূল (সা.) আবারও একই কথা পুনরাবৃত্তি করেছেন, “তোমরা প্রত্যেকেই রক্ষক”। এটি পুনরুক্তি নয়; বরং চূড়ান্ত সতর্কবার্তা। যেন কেউ ভুলেও মনে না করে যে, এই প্রশ্ন কেবল অন্যদের জন্য, আমার জন্য নয়।
এই হাদিস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, দুনিয়ায় দায়িত্ব অবহেলা করা যায়, কিন্তু আখিরাতে কোনো দায়িত্বই অস্বীকার করা যাবে না।
লেখক: প্রবন্ধিক ও অনুবাদক
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



