ছবি: সংগৃহীত
রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে গত এক বছরে হত্যাকাণ্ডের যে চিত্র সামনে এসেছে, তা গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, এই সময়ে সারা দেশে ৩ হাজার ৭৬৭টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে— এসব হত্যাকাণ্ডের বড় অংশের পেছনে রয়েছে চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা। কোথাও কোথাও পরাজিত বা কোণঠাসা রাজনৈতিক শক্তির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকার অভিযোগও সামনে আসছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব হত্যাকাণ্ডের একটি বড় উদ্দেশ্য হলো আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে অস্থিরতা সৃষ্টি করা এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা।
টার্গেট কিলিংয়ের ধারাবাহিকতা
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে যেসব হত্যাকাণ্ড ঘটছে, তার একটি বড় অংশই ‘টার্গেট কিলিং’। অর্থাৎ পরিকল্পিতভাবে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে হত্যা। এসব ঘটনায় পেশাদার সন্ত্রাসীদের ব্যবহার, আগ্নেয়াস্ত্র প্রয়োগ এবং দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগের কৌশল লক্ষ করা যাচ্ছে।
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ও সুপরিকল্পিত ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ–সংশ্লিষ্ট কিছু নেতা এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনায় জড়িত ছিলেন। তাদের লক্ষ্য ছিল একাধিক রাজনৈতিক নেতা ও সংসদ সদস্য প্রার্থীকে হত্যা করে দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা। তবে হত্যাকারীরা দ্রুত শনাক্ত হওয়ায় সেই পরিকল্পনা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
একজন সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “হাদি হত্যাকাণ্ডটি শুধু একজন ব্যক্তিকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য নয়; এর মাধ্যমে একটি বড় রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা ছিল। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্রুত পদক্ষেপে সেই ষড়যন্ত্র অনেকটাই ভেস্তে যায়।”
সংখ্যার ভয়াবহতা
সূত্র অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে সারা দেশে খুনের সংখ্যা বেড়েছে ৩২৭টি। ২০২৪ সালে যেখানে মোট হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৪৪০টি, সেখানে ২০২৫ সালে তা দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৭৬৭টিতে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে হত্যা মামলা বেড়ে যায়। ওই মাসে ৬২৬টি হত্যা মামলা হয়, যেখানে আগের বছর আগস্টে এই সংখ্যা ছিল ৪৪১টি।
২০২৫ সালের মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানও উদ্বেগজনক। জানুয়ারিতে ২৯৪টি, ফেব্রুয়ারিতে ৩০০টি, মার্চে ৩১৬টি, এপ্রিলে ৩৩৬টি, মে মাসে ৩৪১টি, জুনে ৩৪৪টি, জুলাইয়ে ৩৬২টি, আগস্টে ৩২১টি, সেপ্টেম্বরে ২৯৭টি, অক্টোবরে ৩১৯টি, নভেম্বরে ২৭৯টি এবং ডিসেম্বরে ২৭৬টি হত্যা মামলা দেশের বিভিন্ন থানায় রেকর্ড হয়েছে।
রাজধানী ঢাকায় চিত্র
রাজধানী ঢাকায় মাসে গড়ে ১৯ থেকে ২০টি হত্যাকাণ্ড ঘটছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে জানুয়ারিতে ২০টি, ফেব্রুয়ারিতে ২২টি, মার্চে ১৮টি, এপ্রিলে ২২টি, মে মাসে ২৩টি, জুনে ১৮টি, জুলাইয়ে ১৬টি, আগস্টে ২২টি, সেপ্টেম্বরে ১৯টি, অক্টোবর ও নভেম্বরে ১৮টি করে এবং ডিসেম্বরে ২০টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
ডিএমপি কমিশনার শেখ সাজ্জাত আলী বলেন, “রাজধানীতে বেশির ভাগ হত্যাকাণ্ডের পেছনে পারিবারিক কলহ, পূর্বশত্রুতা, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তার কাজ করে। রাজনৈতিক কারণেও কিছু খুন ঘটে। সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত প্রায় শতভাগ ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়েছে এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “ফ্যাসিবাদী শক্তি ও স্বার্থান্বেষী মহল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে এখনো তৎপর। হাদি হত্যাকাণ্ড ছিল নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্রের অংশ।”
বিভিন্ন অঞ্চলের অবস্থা
গত ডিসেম্বরে সবচেয়ে বেশি খুনের ঘটনা ঘটেছে ঢাকা রেঞ্জে— ৬৭টি। রংপুর মেট্রোপলিটন এলাকায় ওই মাসে কোনো খুনের ঘটনা ঘটেনি। একই সময়ে ডিএমপিতে ২০টি, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটনে দুটি, খুলনা, গাজীপুর ও রাজশাহী মেট্রোপলিটনে চারটি করে এবং অন্যান্য রেঞ্জেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হত্যা মামলা রেকর্ড হয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাদেক হোসেন বলেন, “এই হত্যাকাণ্ডগুলোর পেছনে শুধু রাজনীতি নয়, অর্থনৈতিক অপরাধ ও স্থানীয় ক্ষমতার লড়াই বড় ভূমিকা রাখছে। চাঁদাবাজির অর্থ এখন অনেক জায়গায় রাজনীতির জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।”
গোয়েন্দা বিশ্লেষণ
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, “তেজতুরি বাজারে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আজিজুর রহমান মুছাব্বির হত্যার পেছনে ছিল চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ ও এলাকার আধিপত্য বিস্তার। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে আমরা খুনিদের শনাক্ত করেছি। দ্রুতই তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।”
তিনি আরও বলেন, “হাদি হত্যাকাণ্ডটি ছিল পুরোপুরি রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা। তবে অন্যান্য রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে ব্যক্তিগত ও স্থানীয় দ্বন্দ্বের বিষয়ও জড়িত।”
বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন মনে করেন, “নির্বাচনের আগে টার্গেট কিলিং বাড়লে তার প্রভাব শুধু আইনশৃঙ্খলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপরও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করে। রাজনৈতিক দলগুলোকে এখানে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।”
মানবাধিকার কর্মী নূর খান বলেন, “হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা কমাতে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করলে হবে না। রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও চাঁদাবাজির অর্থনীতি ভাঙতে না পারলে এই সহিংসতা চলতেই থাকবে।”
সামনে চ্যালেঞ্জ
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তারা বাড়তি সতর্কতা নিয়েছে। টার্গেট কিলিং, রাজনৈতিক সহিংসতা ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, অপরাধের অর্থনৈতিক ভিত্তি ভেঙে দেওয়া এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা।
পরিসংখ্যানের এই ভয়াবহ চিত্র স্পষ্ট করে দিচ্ছে— হত্যাকাণ্ড এখন শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং একটি কাঠামোগত সমস্যায় রূপ নিচ্ছে। এই প্রবণতা রোধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



