ছবি: সংগৃহীত
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘নাগরিক হিসেবে আমরা যদি যে যার অবস্থান থেকে রাষ্ট্র এবং সমাজের প্রতি যার যার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করি, আমি আশা করছি, দ্রুততম সময়ের মধ্যে আমরা রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে একটি স্বনির্ভর বাংলাদেশ দেখতে পারব।’
শনিবার সকাল সোয়া ১১টায় রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে রমজানের ২৩তম দিনে সম্মানিত ইমাম, খতিব, মুয়াজ্জিন এবং অন্য ধর্মের ধর্মীয় গুরুদের সম্মানী ভাতা প্রদান কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।
বক্তব্যের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকের ব্যতিক্রমধর্মী এই অনুষ্ঠানে আপনারা এমন কিছু মানুষ একত্র হয়েছেন, যাঁদেরকে কোনো বাধ্যবাধকতা ছাড়াই মানুষ সম্মান করে, জীবনের অনেক কঠিন মুহূর্তে যাঁদের কাছে দুটি ভালো উপদেশের আশা করে। আজকের এই অনুষ্ঠানে রয়েছেন ইসলাম ধর্মের ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ইমাম-খতিব-মুয়াজ্জিন সাহেবরা।
একই সঙ্গে রয়েছেন হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ধর্মের ধর্মীয় নেতৃত্ব—পুরোহিত, সেবায়েত, বিহার অধ্যক্ষ এবং উপাধ্যক্ষরা।
তিনি বলেন, ‘সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যাঁরা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে রয়েছেন, তাঁদের জন্য আর্থিক সহায়তা কিংবা কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে আর্থিক বৈষম্য দূর করে আমরা সবাই মিলে ভালো থাকব। জাতীয় নির্বাচনের আগে আমরা জনগণের কাছে সেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম।’
তারেক রহমান বলেন, ‘জনগণের রায়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর ভোটের কালি নখ থেকে মোচনের আগেই আমরা আমাদের সব প্রতিশ্রুতি ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছি, আলহামদুলিল্লাহ।
তিনি বলেন, ‘অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া নারীদের জন্য আমরা এরই মধ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করেছি। পর্যায়ক্রমে এই কার্ড সারা দেশে সবাই পাবেন। আগামী ১৪ এপ্রিল তথা পহেলা বৈশাখ থেকে চালু হচ্ছে ‘ফার্মার্স কার্ড’ বা ‘কৃষক কার্ড’। আগামী ১৬ মার্চ দিনাজপুর থেকে শুরু হচ্ছে খাল খনন কর্মসূচি।
শনিবার থেকে চালু হলো খতিব, ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং অন্য ধর্মের ধর্মীয় গুরুদের জন্য আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি; সারা দেশে তাঁদের প্রত্যেককে পর্যায়ক্রমে এই সহায়তা দেওয়া হবে।’
দেশের প্রতিটি নাগরিকের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার মাধ্যমে সরকার বাংলাদেশকে এমন একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে চায় উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘যাতে করে আর কোনো ফ্যাসিবাদ কিংবা তাঁবেদার অপশক্তি মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে না পারে। আমি বারবার একটি কথা বলি, নাগরিকদের দুর্বল রেখে রাষ্ট্র কখনো শক্তিশালী হতে পারে না। ধর্ম, বর্ণ-নির্বিশেষে প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষ তথা প্রতিটি নাগরিকের আর্থিক-সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকার রাষ্ট্রীয় সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করবে। তবে নাগরিকদেরও কিন্তু রাষ্ট্র এবং সমাজের প্রতি কিছু দায়দায়িত্ব রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘নাগরিক হিসেবে আমরা যদি যে যার অবস্থান থেকে রাষ্ট্র এবং সমাজের প্রতি যার যার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করি, আমি আশা করি, দ্রুততম সময়ের মধ্যে আমরা রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে একটি স্বনির্ভর বাংলাদেশ দেখতে পারব ইনশাআল্লাহ। দুনিয়ার কল্যাণের পাশাপাশি আখেরাতের কল্যাণের জন্য প্রার্থনার কথা পবিত্র কোরআনুল কারিমে রয়েছে। ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণবিষয়ক নির্দেশনা নিঃসন্দেহে অন্য ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় বিধি-বিধান অনুযায়ীও নির্দেশিত রয়েছে। সুতরাং ধর্মীয় বিধি-বিধানের আলোকেই আপনারা আপনাদের শিক্ষা-দীক্ষা ও যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাকে কিভাবে আরো বেশি করে দেশ এবং জনগণের কল্যাণে কাজে লাগাতে পারেন সেই চিন্তা এবং চেষ্টা অব্যাহত রাখাও জরুরি।’
তিনি বলেন, ‘অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ রাষ্ট্র মানুষের জীবনে হয়তো আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করে; কিন্তু ধৈর্য, সততা, কৃতজ্ঞতাবোধ, শ্রদ্ধা, আনুগত্য, সংহতি, সহনশীলতা, উদারতা, বন্ধুত্ব, বিনয়, দায় কিংবা দয়া—এসব বৈশিষ্ট্য অর্জন ছাড়া একজন ব্যক্তি মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন হয়ে উঠতে পারে না। এ ধরনের মানবিক বৈশিষ্ট্যগুলো অর্জনের জন্য ধর্মীয় সামাজিক নৈতিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত হওয়া জরুরি বলে আমি মনে করি। রাষ্ট্র, সমাজ এবং পরিবেশ-প্রতিবেশ থেকে অর্জিত আচরণ থেকেই মানুষ তার শুদ্ধ জীবন এবং সুস্থ চিন্তার মানসিক নির্দেশনা পায়।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “পবিত্র হাদিসে বলা হয়েছে, ‘যার আমানতদারি নেই, যার কাছে নিরাপত্তা নেই, সে প্রকৃত ঈমানদার নয়। যার ওয়াদা ঠিক নেই, তার কোনো ধর্মই নেই।’ প্রতিহিংসা এবং সহিংসতামুক্ত একটি নিরাপদ সমাজ বিনির্মাণের ক্ষেত্রে ধর্মের এই উদারনৈতিক শিক্ষণীয় বক্তব্যগুলো অতুলনীয়। আমার বিশ্বাস, একটি নৈতিকতাসমৃদ্ধ মানব সমাজ গঠনের জন্য প্রতিটি ধর্মেই এ ধরনের ইতিবাচক বার্তা রয়েছে। সুতরাং একটি ধর্মীয়, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ মানসিকতা তৈরির ক্ষেত্রে আপনাদের মতো ধর্মীয় জ্ঞানসম্পন্ন মানুষদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
তিনি বলেন, “দেশে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মসজিদ রয়েছে। আমরা সারা দেশের এই মসজিদগুলোকে ধর্মীয় সামাজিক এবং নৈতিক শিক্ষা কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে পারি। স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাঁর সরকারের সময় দেশে প্রথমবারের মতো ‘ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমি’ চালু করেছিলেন। ১৯৯৩ সালে বেগম খালেদা জিয়া সরকারের সময় দেশে ‘মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা’ কার্যক্রম চালু হয়েছিল। বর্তমান সরকারও ইমাম-মুয়াজ্জিনদের একটি নির্দিষ্ট হারে সম্মানী ভাতা প্রদানের পাশাপাশি তাঁদের যোগ্যতাকে আরো কিভাবে রাষ্ট্রীয় উন্নয়নে কাজে লাগানো যায় সরকার সেই পরিকল্পনা গ্রহণ করছে।”
তিনি আরো বলেন, ‘খতিব, ইমাম, মুয়াজ্জিনদের সম্মানী ভাতা দেওয়ার যে কর্মসূচি আপনাদের সরকার চালু করেছে, এই কর্মসূচির অধীনে প্রথম পর্যায়ে পাইলটিং স্কিমের আওতায় মোট চার হাজার ৯০৮টি মসজিদ, ৯৯০টি মন্দির এবং ১৪৪টি বৌদ্ধ বিহারের মোট ১৬ হাজার ৯৯২ জন মাসিক সম্মানী পাচ্ছেন। সবাইকে পর্যায়ক্রমে এই কর্মসূচির আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য সরকারের এসব অর্থনৈতিক কর্মসূচি উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে—নাগরিকদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা।’
তারেক রহমান বলেন, ‘আপনারা কেউ মসজিদে কিংবা যার যার ধর্মীয় উপাসনালয়ে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজেদের বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে চাইলে সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নেও সরকার সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। প্রতিটি জেলার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর মিটিংয়ে একজন ইমাম, খতিব বা ধর্মীয় প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা হবে। আমরা আজ সব ধর্মের মানুষ একসঙ্গে বসেছি, এক কাতারে রয়েছি। এটিই আমাদের আবহমানকালের ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশ। কেউ যেন আমাদের মধ্যে বিভেদ বিরোধ সৃষ্টি করতে না পারে। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ কিংবা খ্রিস্টান, বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী কিংবা সংশয়বাদী আমরা সবাই মিলে ভালো থাকব। সবার জন্য গড়ে তুলব একটি নিরাপদ রাষ্ট্র এবং সমাজ।’
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



